আলোচিত

বাংলাদেশের জঙ্গিরা কি দমে গেছে?

আলোচিত বার্তা : বাংলাদেশে হোলি আর্টিজানে হামলার পর জঙ্গিবিরোধী অভিযান নতুনমাত্রা পায়। ওই ঘটনার পর অন্তত: ২০টি বড় আকারের জঙ্গিবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়। কিন্তু তাতে কি বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা শেষ হয়ে গেছে?

২০১৬ সালে গুলশানে হোলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে জঙ্গি হামলায় বিদেশি নাগরিক ও দুই পুলিশ সদস্যসহ ২৩ জন নিহত হন। এছাড়া হামলায় জড়িত জঙ্গিরাও উদ্ধার অভিযানের মুখে নিহত হয় তখন। আর হলি আর্টিজান জঙ্গিমুক্ত করতে ওই সময় পরিচালিত হয় ‘অপারেশন থান্ডার বোল্ট’।

ঐ মাসেই ঢাকার কল্যাণপুরে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে ৯ জঙ্গি নিহত হন। কল্যাণপুরের তাজ মঞ্জিলের জঙ্গি আস্তানায় ২৬ জুলাই ‘অপারেশন স্ট্রম ২৬’ নামে অভিযান চালায় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। ২০১৬ সালের ২৭ আগস্ট সিটিটিসি ও পুলিশ সদর দফতর যৌথভাবে নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার জঙ্গি আস্তানায় চালায় অপারেশন হিট স্ট্রং-২৭। এতে গুলশান ও শোলাকিয়া হামলার মাস্টারমাইন্ড তামিম চৌধুরীসহ তিন জঙ্গি নিহত হন। এরপর সিলেট , রাজশাহী চট্টগ্রাম ও সিলেটে আরো অন্তত: ২০টি বড় ধরনের অভিযান পরিচালিত হয়। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী এসব অভিযানে মোট ৭৭ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৭ জন শিশুও রয়েছে। আর আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন ১০ জঙ্গি।

হোলি আর্টিজানে হামলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে নব্য জেএমবি নামে নতুন এক জঙ্গি গোষ্ঠীর আত্মপ্রকাশ ঘটে৷।এই গোষ্ঠীটি জামাআতুল মুজাহেদিন বাংলাদেশ(জেএমবি)-এর নতুন রূপ। জেএমবি ২০০৬ সালে সারাদেশের ৬ জেলায় একযোগে বোমা হামলাসহ আরো অনেক জঙ্গি হামলার ও হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত।

হোলি আর্টিজান হামলা থেকেই বাংলাদেশে জঙ্গিদের আত্মঘাতি হামলার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। আর এই আত্মঘাতি হামলা হয়েছে ঢাকার এয়াপোর্ট রোড এলাকার পুলিশ বক্সে, আশকোনায় র‌্যাবের নির্মানাধীন স্থাপনায়। সিলেটের দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ি এলাকার আতিয়া মহলে গত বছরের ২৬-২৮ মার্চ সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডোরা ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’ পরিচালনা করেন। এতে এক নারীসহ চার জঙ্গি আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিহত হন। আর অভিযান চলাকালে বাইরে থেকে জঙ্গিদের হামলায় একজন র‌্যাব ও পুলিশ কর্মকতা নিহত হন। এসব জঙ্গি আস্তানা থেকে সুইসাইড ভেস্টসহ বিপুল বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়।

হোলি আর্টিজানের পরও বাংলাদেশে লেখক প্রকাশক, ব্লগার ও ভিন্ন চিন্তার মানুষের ওপর জঙ্গিদের পরিকল্পিত হামলা ও হত্যা বন্ধ হয়নি। এসব হামলা ও হত্যায় জেএমবি ছাড়াও আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামে আরেকটি জঙ্গি গ্রুপ জড়িত।

দেশে ধারাবাহিক জঙ্গিবিরোধী অভিযানে আটক দুই হাজারেরও বেশি জঙ্গি সদস্য এখন কারাগারে আটক আছেন। আর হলি আর্টিজান হামলার মাস্টারামাইন্ড নব্য জেএমবির তামিম চৌধুরীসহ আরো অনেক শীর্ষ জঙ্গি অভিযানে নিহত হওয়ার পরও বাংলাদেশ এখনো বড় ধরনের জঙ্গি ঝুঁকিতে আছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ ইন্সটিউট অব পিস এন্ড সিকিউরিটি স্ট্যাডিজ-এর প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) এ এন এম মুনীরুজ্জামান বলেন, ‘‘আমরা জঙ্গিদের সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি। জঙ্গিবিরোধী অভিযানের মাধ্যমে তাদের আপাতত কোনঠাসা করা গেছে৷ ফলে হোলি আর্টিজানের পর বা গত এক বছরে আমরা দেখেছি জঙ্গিরা বড় কোনো ধরণের অপারেশন চালাতে পারেনি৷ তবে তাদের তৎপরতা কমেনি।

তারা অভ্যন্তরীনভাবে সক্রিয় রয়েছে৷ এটার বড় প্রমাণ হচ্ছে যে পুলিশ প্রায়ই দেশের বিভিন্ন জেলার জঙ্গি আস্তানার খোঁজ পাচ্ছে। জঙ্গিদের অস্ত্র ও গোলবারুদ পাওয়া যাচ্ছে। বছর খানেক আগে তারা ১৫ আগষ্টে আওয়ামী লীগের র‌্যালিতে ও ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে হামলার পরিকল্পনা করেছিল৷ যা শেষ মূহুর্তে পুলিশ ব্যর্থ করে দেয়।”

এই নিরপত্তা বিশ্লেষক বলেন, ‘‘বাংলাদেশর অনেক জঙ্গি দেশের বাইরে সক্রিয় আছে। তারা এখন নতুন করে দেশে জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের তৎপরতা চালাচ্ছে।”

জানা গেছে, সিরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শতাধিক জঙ্গি তৎপর রয়েছেন। তারা আফগানিস্তানেও নতুনভাবে জায়গা করে নিচ্ছেন।

বাংলাদেশের জঙ্গিরা অনলাইনেও তৎপর আছেন৷ তারা শুধু কৌশল পরিবর্তন করেছেন। তারা এখন অনলাইনে তথ্যপ্রযুক্তির নতুন কৌশল কাজে লাগাচ্ছেন।

তথ্যপ্রযুক্তি এবং সাইবার সিকিউরিটি এক্সপার্ট তানভির হাসান জোহা বলেন, ‘‘তারা এখন এক্রিপ্টেড টেলিগ্রাম, ডার্কওয়েব ব্যবহার করছে। তাদের কিছু নিজস্ব অ্যাপসও আছে৷ এর মাধ্যমে তারা তাদের যোগাযোগ রক্ষা করছে এবং সমর্থক বাড়াচ্ছে৷ যা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সাধারণভাবে চিহ্নিত করতে পারছেনা। আর ১৫-৩০ বছরের বাংলাদেশি নাগরিকরা এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হচ্ছে। তারা সবচেয়ে বেশি তৎপর চট্টগ্রাম ও সিলেটে৷ আমরা তাদের মালয়েশিয়া এবং তুরস্কে যোগাযোগের প্রমাণ পেয়েছি।”

তিনি বলেন, ‘‘আমরা আমাদের পর্যবেক্ষণে দেখছি অনলাইন ব্যবহার করে বাংলাদেশের জঙ্গিরা বাইরের জঙ্গিদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে। তারা সমর্থক খোঁজে ফেসবুকের মাধ্যমে। সেখান থেকে যারা পরীক্ষিত তাদেরকে তারা টেলিগ্রাম অ্যাপস-এ নিয়ে আসে। এরপর যারা অপারেশনে থাকতে চায় তাদেরকে তারা প্রটেককেটেড টেক্সট ডটকম নামে একটি প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসে৷ এটা ওপেন নয়।”

হোলি আর্টিজানের পর জঙ্গিবাদ দমনে সামাজিক প্রক্রিয়ার কথাও বলা হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদে কাজ করার কথা বলা হয় তখন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও অপরাধ বিজ্ঞানের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান বলেন, ‘‘বাংলাদেশে যেটা হয়েছে তা হল সামরিক সমাধান৷ জঙ্গি তৈরি হয়েছে এবং তাদের গুলি করে নির্মূলের চেষ্টা হয়েছে। এতে হলি আর্টিাজানের পর যে নিরপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছিল তা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হয়েছে৷।কিন্তু জঙ্গিবাদের কারণ ধরে তা দূর করার চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়নি।”

তিনি বলেন, ‘‘জঙ্গিবাদ একটা বৈশ্বিক সমস্যা৷ এটার প্রচার ও প্রসারে বিশ্বব্যাপী জঙ্গিরা কাজ করছে৷ আমাদের প্রয়োজন জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সামজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাজ করা। আর সবার আগে তাই আমাদের শিক্ষায় এটা নিয়ে পরিকল্পনা করে এগোতে হবে। কোনধরনের শিক্ষা বা ‘আদর্শ’ যদি জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করে তাতো আর শুধু জঙ্গিবিরোধী অভিযান দিয়ে শেষ করা যাবে না। হোলি আর্টিজানে অভিযান চালাতে হয়৷ কিন্তু সমাজে দরকার সচেতনতা।”

আর এ এন এম মুনীরুজ্জামান বলেন, ‘‘জঙ্গিবাদ একটা দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা৷ তাই একটি দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় কৌশলপত্রের ওপর ভিত্তি করে এর সামাধান খুঁজতে হবে। এই কৌশলে পুলিশের অভিযানের ভূমিকা থাকবে কম৷ এখানে স্টেকহোল্ডার, সমাজ, মিডিয়া, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গোয়েন্দা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনি সবকিছু নিয়ে কাজ করতে হবে। একটি কৌশলপ্রত্র প্রনয়ন করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এটা না করে শুধু পুলিশি অভিযান চালিয়ে এটা দমন করা যাবেনা।”

 

সূত্র:ডয়চে ভেলে

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close