আলোচিত

২০২০ সালের মধ্যে পোড়া ইটের ব্যবহার বন্ধ করার লক্ষ্য নির্ধারণ

আলোচিত বার্তা : নির্মাণকাজে পোড়া ইটের ব্যবহার ২০২০ সালের মধ্যে বন্ধ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন।

শনিবার ‘পোড়ানো ইটের বিকল্প বিষয়ে সহায়ক নীতি-নির্ধারণে করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এ কথা জানান।

গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, ‘ইট তৈরি করতে গিয়ে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের মাটি নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে। এতে কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে এবং উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এতে দেশ ভবিষ্যতে খাদ্যসংকটে পড়বে। আবার ইট পোড়ানো জন্য প্রচুর গাছ কাটা হয়, এতে পরিবেশের ভাসাম্য নষ্ট হয়। সরকার ইমারত নির্মাণ বিধিমালা সংশোধন করেছে। সংশোধিত এ বিধিমালায় পোড়া ইটের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের শর্ত আরোপ করা হয়েছে। নির্মাণকাজে পোড়া ইটের ব্যবহার ২০২০ সালের মধ্যে বন্ধ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিল্ডিং কোডে ইটের বিকল্প হিসেবে স্যান্ড-সিমেন্ট ব্লক ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে।’

মন্ত্রী বলেন, ‘সরকার কৃষিজমি সুরক্ষায় সচেষ্ট রয়েছে। কৃষিজমিতে শিল্পকারখানা করা যাবে না। মিরসরাইয়ে দেশের বৃহত্তম অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে কোনো কৃষিজমি নেয়া বা নষ্ট করা হয়নি। অথচ মিরসরাই এলাকায় অনেক বড় বড় শিল্প মালিকরা কৃষিজমি কিনে শিল্পস্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। সেগুলোতে শিল্পস্থাপনে বাধা দেয়া হচ্ছে। কৃষিজমি সুরক্ষায় সবাইই এগিয়ে আসতে হবে এবং স্যান্ড-সিমেন্ট ব্লকের ব্যবহারকে জনপ্রিয় করে তুলতে কাজ করতে হবে।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একাডেমিক কাউন্সিল মিলনায়তনে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়। কৃষিজমির মাটি দিয়ে পোড়ানো ইটের বিকল্প জনপ্রিয়করণ ও এ বিষয়ে সহায়ক নীতি নির্ধারণে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), গ্রিন আর্কিটেকচার সেল (গ্রেস), স্থাপত্য বিভাগ, বাংলাদেশ প্র্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) দ্য স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড, এইচবিআরআই, জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন এবং অক্সফ্যাম যৌথভাবে এই সেমিনারের আয়োজন করে। অর্থায়ন করে সুইচ এশিয়া প্রোগ্রামের প্রমোটিং সাসটেইনেবল বিল্ডিং প্রকল্পের আওতায় ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন।

সেমিনারে জানানো হয়, বাংলাদেশে মোট ইটভাটার সংখ্যা ছয় হাজার ৭৪০টি; যার প্রায় ৪০ শতাংশ ইটভাটাই অবৈধ ফিক্সড চিমনি কিলন্ প্রযুক্তিতে পরিচালিত এবং নামমাত্র আধুনিক প্রযুক্তি জিগজ্যাগ কিলনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে প্রায় ৬০ শতাংশ ইটভাটা। শুষ্ক মৌসুমে ঢাকা শহরে বায়ুদূষণের জন্য শহরের চারপাশে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ইটভাটা ৫৮ শতাংশ দায়ী।

পোড়া ইটের বিকল্প হিসেবে হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এইচবিআরআই) স্যান্ড-সিমেন্ট ব্লক উদ্ভাবন করেছে। পোড়া ইটের চেয়ে এ ব্লক অধিক সাশ্রয়ী এবং টেকসই বলে সেমিনারে জানানো হয়।

জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর সভাপতিত্ব অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নেন বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম, এইচবিআরআই পরিচালক মোহাম্মদ শামীম আখতার প্রমুখ।

বক্তারা বলেন, অপোড়ানো ইট ব্যবহার করে যারা ভবন নির্মাণ করবে তাদের রাজউক বিশেষ সুবিধা দিতে পারে। সরকারও তাদের বিভিন্ন নীতি সহায়তা দিতে পারে।

জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর বলেন, ২৫ বছরের পুরোনো বিল্ডিং কোডের নির্দেশনা দিয়ে চলছি আমরা। এটা গ্রিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ড। অনেক দেশে এটা পাঁচ বছর পরপর পরিবর্তন করে। আমাদের ১৯৯৩ সালের বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড পরিবর্তন করে নতুনভাবে করতে হবে। কিন্তু ২০১১ সালে উদ্যোগ নেয়া হলেও আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, যেকোনো অট্টালিকা নির্মাণের ক্ষেত্রে এর নির্মাণ উপকরণসমূহের যথার্থতা দিকনির্দেশ করার পাশাপাশি নির্মিত ভবনের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়েরটিও নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এই বিল্ডিং কোডে। গত চার বছর আগে আমাকে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেছিলেন, আগামী বছর থেকে কার্যকর হবে নতুন বিল্ডিং কোড। কিন্তু এখনও বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না।

সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অক্সফাম ইন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর এম বি আখতার, বুয়েটের গ্রিন আর্কিটেকচার সেলের সমন্বয়ক আশিকুর রহমান জোয়ার্দ্দার, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ব্যবসায়ীদের তথ্য সংগ্রহ করে জানতে পেরেছি বাংলাদেশে বার্ষিক ইটের চাহিদা প্রায় এক হজার ৫০০ কোটি। সরকারি কোনো সংস্থা থেকে এর সঠিক কোনো হিসাব পাইনি। আর সুনির্দিষ্ট কোন কোন খাতে কত পরিমাণ ইট ব্যবহার হচ্ছে এর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই।

বলা হয়েছে, এক ফসলি জমিতে ইটভাটা করা যাবে। এটার সুযোগ নিচ্ছেন ইটভাটার মালিকরা। তারা প্রভাবশালীদের সহায়তায় তিন ফসলি জমিতেও ইটভাটা করছেন। আর এ ক্ষেত্রে অনেক সময় সহায়তা করছে স্থানীয় প্রসাশন। তাছাড়া দেশে এক ফসলি জমির পরিমাণ মোট কৃষি জমির ২৮ শতাংশ। এ জায়গাগুলো ইটভাটা তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে।

মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউশনের তথ্য উল্লেখ করে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ইট প্রস্তুতে যদি ছয় ইঞ্চি গভীরতায় কৃষি জমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহার করা হয় তবে ৭০ হাজার ইট প্রস্তুত করতে এক হেক্টর কৃষিজমির প্রয়োজন। এর ফলে মাটির পুষ্টি উপাদান ক্ষয়প্রাপ্তির আর্থিক মূল্য বার্ষিক ২৫ লাখ টাকা। আর ফসলের ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক মূল্য ছয় লাখ টাকা।

এই পরিবেশবিদ বলেন, তাহলে বছররে মোট ইট তৈরিতে আমাদের কত ক্ষতি হচ্ছে তা এ থেকেই আমরা বুঝতে পারি। এর ভয়াবহতা কত তা উপলব্ধি করতে পারি।

জাতিসংঘের খাদ্য বিষয়ক সংস্থা (এফএও) এর তথ্য জানিয়ে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার ৯৬ বিঘা কৃষিজমি অকৃষিখাতে চলে যাচ্ছে, যার ১৭ শতাংশ ইটভাটার কার্যক্রমের জন্য।

সেমিনারে জানানো হয়, বাংলাদেশে বেসরকারিভাবে অপোড়ানো ইট প্রস্তুত শুরু হলেও তা জনপ্রিয় হয়ে উঠেনি। যথাযথ প্রণোদনা ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা না থাকা, সচেতনতা ও গ্রহণযোগ্যতার অভাব, সরকারি নির্মাণ প্রকল্পে আপোড়ানো ইটের ব্যবহার না করা, ইমারত নির্মাণ আইন, বিধিমালা এবং ইটভাটাসংক্রান্ত আইনে অপোড়ানো ইটের উৎপাদন ও ব্যবহারসংক্রান্ত বিধান না থাকা এবং পেশাজীবীদের অনুৎসাহের কারণে প্রতিনিয়ত বাড়ছে লাইসেন্সবিহীন ইটভাটার সংখ্যা।

সেমিনারে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ, গণপূর্ত অধিদপ্তর, রাজউকসহ বিভিন্ন সরকারি-সেবরকারি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এটাও পড়ুন

Close
Close