খেলাধুলা

কারা আসছেন মেসি-রোনালদোর জায়গা দখল করতে

খেলাধুলার বার্তা : চার বছর পর আসে বিশ্বকাপ ফুটবল। ফুটবল বিশ্বে দাপিয়ে বেড়ানো তারকার নিজে দেশের জার্সি গায়ে বিশ্বকাপে আসেন দেশকে শিরোপা উপহার দিতে। তবে তাদের সবাই সফল হন না। অনেকেই ব্যর্থ মনোরথে ফিরে যান। পতন হয় অনেক তারকার। আবার এই বিশ্বকাপের মঞ্চেই তৈরি হয় নতুন তারকা। আগামী দিনে কারা ফুটবল বিশ্বে আলো ছড়াবেন সেটির আভাস পাওয়া যায় বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স দেখেই। একারণেই বলা বিশ্বকাপ তারকা তৈরির মঞ্চ।

২০১৮ বিশ্বকাপও এর ব্যতিক্রম নয়। রাশিয়ার টুর্নামেন্টও যথারীতি তারায় তারায় খচিত৷ যথারীতি সময়ের আগেই সবচেয়ে বড় দুই তারকার পতন৷ লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর৷ আগামীর দুই মহাতারকার পদধ্বনিও পাওয়া যাচ্ছে বিশ্বকাপ থেকে। নেইমার ও কিলিয়ান এমবাপের৷ কিংবদন্তিদের বিদায়ের পথে আঁকা হচ্ছে যেন নতুনের আগমনের সুর।

সমকালীন ফুটবলে সবচেয়ে বড় দুই তারকা মেসি-রোনালদো৷ মহাকালীন ফুটবলেও তাঁদের অবস্থান সুনিশ্চিত৷ কিন্তু আলোচনা যখন হবে সেরাদের সেরা নিয়ে, তখন বিশ্বকাপের প্রসঙ্গ না এসে পারে না৷ ঠিক এখানটাতেই এসে হোঁচট খায় আড্ডা৷ এখানে যে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দী হয়ে যান সমব্যথী সহচর! ক্যারিয়ারে তাঁদের এত প্রাপ্তি, তবু বিশ্বকাপ রয়ে গেল অতৃপ্তির অন্য নাম৷ সাফল্য-পুরষ্কারে এত পূর্ণতা, শূন্যতার হাহাকার থাকলো কেবল এই টুর্নামেন্ট ঘিরে৷ রাশিয়ার আসরের শেষ সুযোগটিও কাজে লাগাতে পারেন না আর্জেন্টিনা ও পর্তুগালের দুই ফুটবল জাদুকর৷

দু’জনের প্রথম বিশ্বকাপ ২০০৬ সালে৷ জার্মানির সেই আসরের সময় রোনাল্ডোর বয়স ছিলো ২১ বছর, মেসির ১৯৷ পর্তুগালের হয়ে সেমিফাইনাল পর্যন্ত উঠেছিলেন প্রথম জন; সেখানে ফ্রান্সের কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ৷ রোনাল্ডো নিজে সেবার ছয় ম্যাচে মাত্র এক গোল করেন ৷ অন্যদিকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে তিন ম্যাচে মেসিরও এক গোল৷ তাঁর দলের পথচলা থেমে যায় আরো আগে; কোয়ার্টার ফাইনালে৷ জার্মানির বিপক্ষে সে ম্যাচে খুদে জাদুকর মাঠেই নামতে পারেননি। বিশ্বকাপের আগে ইনজুরিতে পড়ায় হোসে পেকারমান মেসিকে প্রতিটি ম্যাচের শেষ দিকে বদলি হিসেবে নামাতেন। কিন্তু সেই ম্যাচে দুর্টি পরিবর্তনের পর যখন মেসির নামার অপেক্ষায়, তখনই আহত হয়ে মাঠ ছাড়েন আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক, অনাকাঙ্ক্ষিত একটি বদলির কারণে আর মাঠে নামা হয়নি মেসির। সেই ম্যাচে টাইব্রেকারে জার্মানির কাছে হেরে যায় আর্জেন্টিনা।

পরের চার বছরে ফুটবলবিশ্বে ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের সাম্রাজ্যে পালাবদল ঘটে গেছে৷ ফিফার বর্ষসেরা ও ব্যালন ডি’অর জেতা হয়ে গেছে দু’জনেরই৷ আর তা ক্লাব সাফল্যের সূত্রে৷ জাতীয় দলের গল্পটি একই থেকে গেছে৷২০১০ বিশ্বকাপে পর্তুগাল মুখ থুবড়ে পড়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে; আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে৷ সেবার চার ম্যাচে এক গোল রোনাল্ডোর; পাঁচ ম্যাচে গোলই পাননি মেসি৷সময়ের চক্করে পেরিয়ে যায় আরো চার বছর৷ বিশ্বসেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি তাঁদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারে না কেউ; কিন্তু ২০১৪ বিশ্বকাপেও যে আক্ষেপের গল্প ফুরোয় না! সেবারের কষ্টটা বেশি মেসির৷ সাত ম্যাচে চার গোল করে আর্জেন্টিনাকে নিয়ে ফাইনালে উঠেছিলেন; কিন্তু সেখানে অতিরিক্ত সময়ের শেষ মূহুর্তে জার্মানির মারিও গোটশের গোলে হৃদয় ভাঙে তাঁর৷ তিন ম্যাচে এক গোল করা রোনাল্ডোর পর্তুগাল বিদায় নেয় প্রথম রাউন্ডেই৷

আর এবার তো তাঁদের বিদায় গলাগলি করে৷ শেষ ষোলোর ম্যাচে ফ্রান্সের কাছে আর্জেন্টিনার হারের ঘণ্টা কয়েকের মধ্যেই উরুগুয়ের কাছে হেরে যায় পর্তুগাল৷ সমান চার ম্যাচ খেলে চার গোল রোনালদোর আর মাত্র এক গোল মেসির৷ আর কখনো বিশ্বকাপ জয়ের সুযোগ তারা পাবেন কিনা সেটি নিয়ে জোর গলায় কিছু বলা যাচ্ছে না। কেননা, ২০২২ বিশ্বকাপ আসতে আসতে মেসির বয়স হয়ে যাবে ৩৫ বছর; রোনালদোর ৩৭৷

শুধু মেসি-রোনালদো নয়, রাশিয়ার আসরে বিদায় হয়েছে আরো কত তারকার! স্পেনের আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়েছে স্বাগতিকদের কাছে দ্বিতীয় রাউন্ডের বিব্রতকর হারে৷ সার্জিও রামোস, জেরার্ড পিকে, ইসকো, সার্জিও বুসকেটসরা টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপে ডুবলেন হতাশায়৷ ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন জার্মানির মানুয়েল নয়ার, মেসুত ওজিল, সামি খেদিরা, মারিও গোমেজদের টুর্নামেন্ট তো শেষ হয়ে গেছে প্রথম রাউন্ডেই৷ আর্জেন্টিনার মেসি ছাড়াও হাভিয়ের ম্যাচেরানো, গনজালো হিগুয়েইন, সার্জিও আগুয়েরোদের প্রতিভাবান প্রজন্মের পতন উল্কাপাতের মতো৷ গত বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার ‘গোল্ডেন বুট’ জেতা কলম্বিয়ার হামেস রোদ্রিগেজ, পোল্যান্ডের বরার্ট লেভান্ডোভস্কি, আর নতুন তারকার প্রতিশ্রুতি দেয়া মিশরের মোহাম্মদ সালাহ’রও বিদায় হয়ে গেছে৷সাম্প্রতিক ফর্মের বিবেচনায় মেসি-রোনালদোর সাথেই উচ্চারিত হতো সালাহ’র নাম। কিন্তু তিনিও পারলেন না।

নতুন তারকার মিছিলে নেইমারের নাম শোনা যাচ্ছে বহু বছর ধরে৷ গত ১০ বছর ধরে মেসি-রোনালদোর মাঝেই যেমন ভাগাভাগি হয়েছে বিশ্বসেরা খেলোয়াড়ের পুরষ্কার; এর অর্ধেক সময়জুড়ে তাঁদের উত্তরাধিকারী হিসেবে ভাবা হয়েছে এই ব্রাজিলিয়ানকে৷ গত বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে বাজে ইনজুরিতে শেষ হয়ে যায় নেইমারের টুর্নামেন্ট৷ এবারও ক্লাব প্যারিস সেন্ট জার্মেই’র হয়ে ফেব্রুয়ারিতে ইনজুরিতে পড়লে ফিরে আসে সেই শঙ্কা৷ সেই শঙ্কা দূর করে অবশ্য নেইমার ফিরেছেন; আর বিশ্বকাপে খেলেছেনও দারুণ, যদিও তার দলও বিদায় নিলো কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে।

দুই মৌসুম আগে ধূমকেতুর মতো আচমকা আবির্ভাব কিলিয়ান এমবাপের৷ ক্লাবের আলো ছড়াচ্ছিলেন৷ আর বিশ্বমঞ্চে ফরাসি সৌরভ যে অনেকদিন ছড়াবেন, এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচে দুর্দান্ত খেলে সে ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন৷ ফ্রান্স দলের সতীর্থদের মধ্যে গ্রিয়েজমান এখনো সেভাবে আলো ছড়াতে পারেননি৷ তবে পল পগবা, এনগোলো কান্তে নিজেদের ছাপ রেখে চলেছেন ঠিকই৷ ব্রাজিলের হয়ে পারফরম্যান্স দিয়ে যেমন আলো নিজের দিকে টেনেছেন কুতিনহো৷অবশ্য তাদের তুলনায় বেলজিয়ামের রোমেলু লুকাকু, এডেন হ্যাজার্ড, কেভিন ডে ব্রুইনেরাও জানান দিচ্ছেন নিজেদের সামর্থ্যের৷ যেমনটা ইংল্যান্ডের হ্যারি কেন ছয় গোল করে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে অনেকটা এগিয়ে৷ আলোচনায় আছেন ক্রোয়েশিয়া ও বার্সেলোনার মিড ফিল্ডার লকু মরডিচও।

এছাড়াও টাইব্রেকারে পেনাল্টি বাঁচিয়ে নায়ক বনে গেছেন রাশিয়ার গোলরক্ষক ইগর আকিনফিভ; ইংল্যান্ডের জর্ডান পিকফোর্ড৷ উরুগুয়ের এডিনসন কাভানি জোড়া গোল করে বিদায় করে দিয়েছেন পর্তুগাল ও রোনাল্ডোকে৷ রাশিয়ার ডেনিস চেরিশেভের খেলায় দেখা গেছে বহুদূর যাবার প্রতিশ্রুতি৷ আর নতুন তারকা হিসেবে আবির্ভূত স্বাগতিকদের আরেক মিডফিল্ডার আলেকসান্দার গোলোভিন৷ তবু দু’-একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে সে অর্থে বিশ্বকাপে নতুন তারকার ছড়াছড়ি এবার সেভাবে নেই৷ সেই মেসি-রোনালদোতেই ছিল সবচেয়ে বড় ভরসা; এখনকার বড় তারকা হয়ে টিকে রয়েছেন এমবাপে, লুকাকু, হ্যাজার্ডরা।

ইংরেজি দৈনিক ‘ডেইলি স্টার’-এর ক্রীড়া সম্পাদক মোহাম্মদ আল-আমিন রাশিয়া আছেন বিশ্বকাপ কাভার করার জন্য৷ মেসি-রোনালদোর বিদায়ের জন্য তাঁদের দল ও কৌশলের দায় অনেকটাই দেখেন তিনি, ‘১৮ গজের ভেতর রোনাল্ডো বিশ্বসেরা স্ট্রাইকার; কিন্তু দল হিসেবে পর্তুগাল তত ভালো না৷ যদিও তারা ইউরো জিতেছে৷ তবে পর্তুগাল যেহেতু অত ভালো দল নয়, রোনালদোর একার পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়৷ আর মেসির ব্যাপার হচ্ছে, আর্জেন্টিনা দলের খেলা আবর্তিত হয় তাঁকে ঘিরে৷ এটি প্রতিপক্ষ জানে বলে তাঁকে আটকে রেখেছে৷ ফলে দলের পক্ষেও কিছু করা সম্ভব হয়নি৷’

তিনি মনে করেন এ দুই তারকার জায়গা নেইমার-এমবাপে নেবেন কিনা, সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এখনো আসেনি, ‘এমবাপের বয়স এখন ১৯ বছর৷ তাঁর আরো অনেক দূর যাওয়ার আছে৷ গতি ছাড়াও তাঁর খেলায় আরো অনেক গুণ দেখেছি৷ আর নেইমার হচ্ছেন এন্টারটেইনার৷ এখন মেসি-রোনালদোকে, নেইমার-এমবাপে প্রতিস্থাপন করবেন কিনা, এটি বলার জন্য সময়টা তাড়াতাড়ি হয়ে যায়৷ তবে আমি মনে করি, নেইমারের বিশ্বসেরা খেলোয়াড় হবার সম্ভাবনা রয়েছে।’

যদি হ্যারি কেন, এমবাপে, লুকাকুরা প্রতিভার আলোয় ঝলসে দিতে পারেন বিশ্বকাপের শেষ ধাপগুলো, তাহলে এই বিশ্বকাপ হয়ে রইবে তাঁদের৷ নইলে এটি মেসি-রোনালদোর হাহাকারের৷আলফ্রেদো দি স্তেফানো, জর্জ বেস্টরা বিশ্বকাপ খেলেননি৷ ইয়োহান ক্রুইফ, জিকো, মিশেল প্লাতিনি, ফেরেঙ্ক পুসকাস, মার্কো ফন বাস্তেন, পাওলো মালদিনির মতো খেলোয়াড় বিশ্বকাপ জেতেননি৷ তবু সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের আড্ডায়, চা-কফির মগের ধোঁয়ায় ভেসে বেড়ায় তাঁদের নাম৷মেসি-রোনাল্ডোর নামও থাকবে সেখানে৷ থাকতেই হবে৷ তাঁদের ফুটবলীয় সামর্থ্যে কুর্নিশ করবে মহাকাল৷ শুধু আড্ডায়-আলোচনায় বিশ্বকাপ পর্বটি আসবে যখন, বিষন্নতার এক চোরা দীর্ঘশ্বাস বয়ে যাবে সবার অজান্তেই৷ ক্যারিয়ারের সব প্রাপ্তির পরও এটি যে মেসি-রোনাল্ডোর জন্য সর্বহারার হাহাকার!

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এটাও পড়ুন

Close
Close