আলোচিতজাতীয়

প্রধানমন্ত্রীর প্যাকেজ: বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ

বার্তাবাহক ডেস্ক : করোনার কারণে স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতিকে সচল রাখতে একটি প্যাকেজ প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

কোভিড-১৯ ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। এ অবস্থায় প্রায় এক কোটি মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছেন বলে জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। দারিদ্র্যসীমার নীচে চলে যাওয়া মানুষের সংখ্যা ৩০ ভাগ ছাড়িয়েছে।

স্থবির অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং সব মানুষকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনতে রোববার ৭২,৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই প্যাকেজে যে চারটি প্রোগ্রামের কথা বলা আছে, তাতে বড় ও রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোকে বেশি সুবিধা দেয়া হয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা৷ তবে যে জায়গায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত ছিল বলে মনে করেন তারা, তা হল খাদ্য নিরাপত্তা।

শুরুরজন্যভালো, বাস্তবায়নচ্যালেঞ্জ

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত প্যাকেজটি শুরুর জন্য ভালো বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ ও অর্থনীতিবিদ ও ব্র্যাক ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুর।

‘‘(ঘোষণার) সময়ের দিক থেকে যথাযথ। পরিমাণের দিক থেকে সম্মানজনক,” বলেন আহসান এইচ মনসুর। ‘‘এটা শুরুর জন্য ভালো। তবে শেষ কোথায় কেউ জানেনা,” বলেন তিনি।

সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘‘এই প্যাকেজ ঠিক আছে, শক্ত পদক্ষেপ, ইতিবাচক৷ সাময়িকভাবে স্বস্তি দেবে৷ তবে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ আছে।”

তিনি বলেন, ‘‘মূল চ্যালেঞ্জ হল, এটার তাৎক্ষণিক বাস্তবায়ন৷ দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দ্রুত বাস্তবায়ন করা বড় চ্যালেঞ্জ।”

সবচেয়েবড়চ্যালেঞ্জ: অর্থেরবন্টন

প্রধানমন্ত্রী মুদ্রা সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলেছেন। ব্যাংকগুলোকে যে শিল্পঋণ বিতরণের কথা বলা আছে, তার যোগান তাদের নেই বলে জানান আহসান এইচ মনসুর।

‘‘জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত কেউ ব্যাংকগুলোকে পয়সা দেবে না। তাই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোন আয় থাকবে না। সুতরাং বাংলাদেশ ব্যাংকই তাদের অর্থ দেবে,” বলেন তিনি। তবে তিনি মনে করেন, সমস্যা হবে এই অর্থের বন্টন।”

‘‘এই অর্থের সুদে যেহেতু সরকার ভর্তুকি দেবে, তাই এর প্রতি সবার নজর থাকবে,” সতর্ক করেন মনসুর। অনেক ব্যাংকই রাজনৈতিক বিবেচনায় দেয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘এই অর্থ বন্টনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা আনা যাবে না।”

‘‘এক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে। যারা ডিফল্টার আর অনেক রিশিডিউল করেছে তাদের আর দেয়া যাবে না। যারা মামলা করে কোর্টে অর্থ আদায় আটকে রেখেছে, তাদের এই প্যাকেজ দেয়া যাবে না। যারা আসলেই কর দেয়া প্রকৃত ব্যবসায়ী, তাদের দিতে হবে,” বলেন মনসুর।

খাদ্যনিরাপত্তারবিষয়টিসুস্পষ্টনয়

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন মনে করেন, প্রণোদনার ঘোষণায় কৃষিখাতকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি।

‘‘কৃষিখাত সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি। এমনিতেই কৃষিপণ্যের দাম কমে যাচ্ছে৷ খাদ্য উৎপাদন ও যোগান নিশ্চিত না করা হলে, ভবিষ্যতে খারাপ সময় মোকাবেলা করা কঠিন হবে,” বলেন তিনি।

তিনি যোগ করেন, ‘‘সামনে বড় হারভেস্ট হবে। তখন কৃষকরা সঠিক দাম পাবে কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে।”

আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘‘কৃষিক্ষেত্রে যে ফলন আসছে, তাকে রক্ষা করতে হবে।” হাওড় অঞ্চলে বন্যা হয় প্রতিবছর। সেখানে পর্যাপ্ত শ্রমিকও নেই। করোনার কারণে এখন যেসব শ্রমিক কাজ পাচ্ছে না, তাদের হাওড় অঞ্চলে যাবার ব্যবস্থা করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

‘‘সরকারকে আগামী সাত দিনের মধ্যে উদ্যোগ নিতে হবে, কিভাবে তারা হাওড় অঞ্চলে যাবে,” বলেন মনসুর। এছাড়া আসছে সংকটের সময়ে খাদ্যের যোগান কেমন করে হবে তা নিশ্চিত করতে সরকারকে প্রচুর খাদ্য কিনতে হবে বলেও মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘‘ব্যাপক পরিমাণ খাদ্য কিনতে হবে সরকারকে। তিন চার কোটি মানুষকে তিন মাস খাওয়াতে হলে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টন খাদ্য কিনতে হবে। সরকার কখনো এত ব্যাপকভাবে করেনি। মজুদ করতে গেলে সরকার পারবে না। তাই কিনে তা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।”

ক্ষুদ্রওমাঝারিব্যবসাএবংঅনানুষ্ঠানিকখাতকে বাঁচাতেহবে

সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকার বড় ও রপ্তানিমুখী শিল্পখাতকে অনেক গুরত্ব দিয়েছে৷ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোর জন্যেও ২০ হাজার কোটি টাকার ঋণ সুবিধা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন ”সমস্যা হল, ব্যাংকগুলোতে এমনিতেই ছোট ও মাঝারি শিল্পগুলোর ব্যাপারে অনীহা। তারা এত প্রতিষ্ঠানকে ম্যানেজ করা ঝামেলার ব্যাপার মনে করে।”

দেশের শ্রমশক্তির বড় অংশ এই দুই শিল্পের বাইরে অনানুষ্ঠানিক খাতে রয়েছে, যাদের জন্য প্রণোদনায় তেমন কিছু নেই। এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ আহসান এইচ মনসুরের। তিনি বলেন, ‘‘যেসব প্রতিষ্ঠান ভাড়া করা জায়গায় করা, ফ্যাক্টরি, চুল কাটার দোকান, রেস্টুরেন্ট, তারা যদি ভাড়া দিতে না পারে, তাদের যদি উঠিয়ে দেয়া হয়, তাহলে তারা আর ফিরতে পারবে না। তাদের যেন উচ্ছেদ না করা হয়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। বাড়িওয়ালারা যদি অন্তত ৫০ ভাগ ভাড়া কমিয়ে দিতে পারতো, তাহলে কাজ হতো।”

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ৭০ থেকে ৮০ লাখ লোকের জীবিকা জড়িত৷ এসব খাতকে যদি সুরক্ষা না দেয়া হয়, তাহলে তাদের ৭০ থেকে ৮০ ভাগ আর ব্যবসায় ফেরত আসতে পারবে না বলে মনে করেন তিনি।

সামাজিক সুরক্ষার আওতায় জনগণের মাঝে বিনামূল্যে বা কম পয়সায় চালের বিতরণের মত কার্যক্রম কতটা সফল হয় বা হবে সে ব্যাপারে নিশ্চিত নন সালেহ উদ্দিন আহমেদ। তিনি মনে করেন, এর চেয়ে নগদ সহায়তা বেশি কার্যকর হতে পারে, যেন সবাই যার যার মত কিনে খেতে পারে।

সবকিছু বিবেচনায় অন্তত দুই বছরের একটি বিস্তারিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close