আলোচিতস্বাস্থ্য

গাজীপুরে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম: শনাক্ত ১৬১ জনের মধ্যে ৫৭ জনই স্বাস্থ্য বিভাগের!

বার্তাবাহক ডেস্ক : গাজীপুরে প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে কভিড-১৯ করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা। ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণের (পিপিই) সংকটের মধ্যেই এখন পর্যন্ত তাদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। তবে বিপত্তি ঘটছে লক্ষণ গোপন করে হাসপাতালে যাওয়া রোগীদের নিয়ে। অনেকে তথ্য গোপন করে হাসপাতালে যাওয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের। এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারি বেশ কয়েকটি হাসপাতাল তাদের সেবা কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। আর সরকারি হাসপাতালগুলো চালু থাকলেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা। ফলে অন্যান্য রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসাপ্রাপ্তির সুযোগ সংকুচিত হয়ে এসেছে। সব মিলিয়ে গাজীপুরে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখন ভেঙে পড়ার উপক্রম।

আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত গাজীপুরে মোট ১৬১ জনের মধ্যে করোনাভাইরাস পজেটিভ (আক্রান্ত) শনাক্ত হয়েছে। তবে গাজীপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত মোট ১৬০ জনের মধ্যে করোনাভাইরাস শনাক্তের তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ১৬০ জনের মধ্যে একজন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, ৯ জন চিকিৎসক ও ১২ জন নার্সসহ জেলা স্বাস্থ্য বিভাগেরই মোট ৫৭ জন করোনাভাইরাস পজেটিভ (আক্রান্ত) শনাক্ত হয়েছে।

গাজীপুর জেলা সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা গেছে, কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাসহ সর্বাধিক হাসপাতালের মোট ৩২ জন করোনাভাইরাস পজেটিভ (আক্রান্ত) শনাক্ত হয়েছে। এরপরই রয়েছে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত ৬ চিকিৎসকসহ হাসপাতালের মোট ১৬ জন এবং জিএমপি’র কাশিমপুর থানার তেঁতুইবাড়ি এলাকায় অবস্থিত শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে স্পেশালাইজড হাসপাতাল এন্ড নার্সিং কলেজের তিনজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ ৫ জন, কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত ২ জন এবং সিভিল সার্জন অফিসের দুই কর্মীসহ জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের মোট ৫৭ জন করোনাভাইরাস পজেটিভ (আক্রান্ত) শনাক্ত।

গত ১৭ মার্চ গাজীপুরের অস্থায়ী কোয়ারেন্টিন ক্যাম্প থেকে উত্তরার কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে পাঠানো ইতালিফেরত এক ব্যক্তির মধ্যে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। তিনি মূলত নরসিংদীর বাসিন্দা। এরপর ২৯ মার্চ গাজীপুর সদরের বারবৈকা এলাকায় আরেকজন শনাক্ত হন। তিনি ইতালিফেরত এক আত্মীয়ের সংস্পর্শে এসেছিলেন। এরপর থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ওই জেলায় নতুন সংক্রমণ পাওয়া যায়নি। ১০ এপ্রিল কাপাসিয়ার দস্যুনারায়ণপুর এলাকায় অবস্থিত ‘ছোঁয়া অ্যাগ্রো প্রোডাক্ট লিমিটেডে’র এক কর্মী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এরপর থেকে প্রতিদিন বেড়েই চলেছে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা।

চিকিৎসকরা বলছেন, পর্যাপ্ত ও মানসম্পন্ন স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী ছাড়াই চিকিৎসকদের সেবা দিতে হচ্ছে। রয়েছে পিপিইর সংকট। একই পিপিই একাধিক চিকিৎসককে ব্যবহার করতে হচ্ছে। সরবরাহ করা হয়নি এন৯৫ বা সমমানের কোনো মাস্ক। অথচ বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষের মতো চিকিৎসকরাও ব্যাপক হারে সংক্রমিত হচ্ছেন নভেল করোনাভাইরাসে। কভিড-১৯ আক্রান্তদের মধ্যে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক, নার্স, অন্য বিভাগের কর্মী ও তাদের স্বজনরা রয়েছেন। আক্রান্ত সবাই আইসোলেশনে রয়েছেন।

কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সূত্রে জানা গেছে, ১৮এপ্রিল (শনিবার) কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাসহ হাসপাতালের মোট ১৯ জন নতুন করে করোনা পজেটিভ (আক্রান্ত) শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৩ জন নার্স, উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (সেকমো) ১ জন, আউটসোর্সিং এর ২ জন এবং হাসপাতালের কর্মরত আরো ১৯ কর্মী রয়েছেন। এর আগে গত ১৬ এপ্রিল (বুধবার) কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নার্স ৩ জন, স্টোর কিপার ১ জন, টেকনিশিয়ান ১ জন, স্বাস্থ্য সহকারী ৬ জন এবং হিসাব রক্ষক ও একজন স্বাস্থ্যকর্মীসহ মোট ১৩ জন করোনা পজেটিভ (আক্রান্ত) শনাক্ত হয়েছে। এনিয়ে কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মোট ৩২ করোনা পজেটিভ (আক্রান্ত) শনাক্ত হয়। কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ১০ জন চিকিৎসক ও ২৬ জন নার্স সহ প্রায় ৭০ জন হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত এর মধ্যে ৩২ জনই করোনা পজেটিভ (আক্রান্ত) শনাক্ত হওয়ার পর আইসোলেশনে রয়েছেন। এছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের আরো ৩২ জন পজেটিভ (আক্রান্ত) শনাক্ত হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক মামুনুর রহমান।

অপদিকে ১৮ এপ্রিল (শনিবার) কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত একজন নার্স নতুন করে (কোভিড-১৯) করোনা পজেটিভ (আক্রান্ত) শনাক্ত হয়েছে। এর আগে ১৭ এপ্রিল কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ১ জন নার্স ও ২ কর্মীর করোনা শনাক্ত হয়েছে। ১৬ এপ্রিল কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত পাঁচ চিকিৎসক ২ নার্সসহ মোট ১১ জন করোনা পজেটিভ (আক্রান্ত) শনাক্ত হয়েছে। এর আগে ১৪ এপ্রিল কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত একজন চিকিৎসক (কোভিড-১৯) করোনা পজেটিভ (আক্রান্ত) শনাক্ত হয়। কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ১৪ জন চিকিৎসক ও ২২ জন নার্স সহ প্রায় ৯০ জন হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত এর মধ্যে ১৬ জনই করোনা পজেটিভ (আক্রান্ত) শনাক্ত হওয়ার পর আইসোলেশনে রয়েছেন। এছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের আরো ২৭ জন পজেটিভ (আক্রান্ত) শনাক্ত হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোঃ শিবলী সাদিক।

এদিকে ১৮ এপ্রিল কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত ২ জনসহ করোনা পজেটিভ (আক্রান্ত) শনাক্ত হয়েছে। এছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আরো ১৩ জন করোনা শনাক্ত হয়েছে।

সত্যতা নিশ্চিত করেছেন কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা প্রবীর কুমার সরকার।

এছাড়াও ১৩ এপ্রিল কাশিমপুর থানার তেঁতুইবাড়ি এলাকায় অবস্থিত শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে স্পেশালাইজড হাসপাতাল এন্ড নার্সিং কলেজের তিনজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং ২ জন নার্স ‘হোম কোয়ারেন্টাইনে’থাকা অবস্থায় (কোভিড-১৯) করোনা পজেটিভ (আক্রান্ত) শনাক্ত হয়েছে। বর্তমানে সকলেই হোম আইসোলেশনে রয়েছে এবং সুস্থ আছেন।

শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে স্পেশালাইজড হাসপাতাল এন্ড নার্সিং কলেজের পরিচালক ডাক্তার রাজীব হাসান বলেন, করোনা পজেটিভ তিন চিকিৎসক ও ২ জন নার্স হোম আইসোলেশনে রয়েছে এবং সুস্থ আছেন। হাসপাতেলের চিকিৎসা কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে।

আরো জানা গেছে, গত ১২ এপ্রিল গাজীপুর সিভিল সার্জন অফিসের এক নিরাপত্তা প্রহরী শরীরে (কোভিড-১৯) করোনা পজেটিভ হয় এবং ১৩ এপ্রিল আরো এক অফিস সহকারীর করোনা পজেটিভ (আক্রান্ত) শনাক্ত হয়। এরপর থেকে সিভিল সার্জনসহ কার্যালয়ের ১৩ জন হোম কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন।

সত্যতা নিশ্চিত করেছেন গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. খায়রুজ্জামান।

এর বাহিরে গাজীপুর সদরে (মহানগরী) স্বাস্থ্য পরিবার ও পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. শাহীন বলেন, গাজীপুর সদর ও মহানগরীতে এ পর্যন্ত মোট ২৩ জন করোনা পজেটিভ (আক্রান্ত) শনাক্ত হয়েছে। সকলেই আইসোলেশনে রয়েছে।

শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক এএসএম ফাতেহ্ আকরাম বলেন, শ্রীপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত মোট ১৪ জন করোনা পজেটিভ (আক্রান্ত) শনাক্ত হয়েছে। শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ৯ জন চিকিৎসক ও ২২ জন নার্সসহ প্রায় ৭০ জন হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত রয়েছে।

এসকল বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য সচিব আসাদুল ইসলাম বলেন, কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণের গাইডলাইন আছে, একইভাবে হাসপাতাল কীভাবে পরিচালিত হবে তারও গাইডলাইন আছে। গাইডলাইনগুলো লক্ষ করলে এ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। আর এ বিষয়গুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি, তারও গাইডলাইন আছে। অর্থাৎ কতজন চিকিৎসক রিজার্ভ থাকবে, কতজন ডিউটি করবে—তা বলা আছে। অবশ্যই সুরক্ষা ব্যবস্থা নিতে হবে, চিকিৎসকরা সম্মুখসারিতে আছেন, তাদের যথাযথ সুরক্ষিত থাকতে হবে। তা না হলে তারা দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।

তবে স্বাস্থ্যকর্মীদের সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে সচিব বলেন, এসব বিষয়ে কমিটি আছে। সুনির্দিষ্ট প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আমরা তদন্ত করছি, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এটাও পড়ুন

Close
Close