তথ্য প্রযুক্তিবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

লকডাউনে ইন্টারনেট বিপ্লব

বার্তাবাহক ডেস্ক : নভেল করোনাভাইরাসের প্রকোপে যখন সবকিছু বন্ধ তখন ইন্টারনেট হয়ে উঠেছে মানুষের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। আমরা আমাদের দাপ্তরিক কাজ ও পড়াশোনার জন্য এখন ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল। এমনকি কাউকে দেখতে চাইলেও আমাদের এ প্রযুক্তির শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। আমাদের বিনোদনের প্রাথমিক উৎসও এখন ইন্টারনেট। এ সময়ে ইন্টারনেটে আমরা প্রচুর সময় ব্যয় করছি।

জানুয়ারি থেকে মার্চের শেষ ভাগ পর্যন্ত বড় শহরগুলোতে ইন্টারনেট ট্রাফিক প্রায় এক-চতুর্থাংশ বেড়েছে। নির্দিষ্ট কিছু অনলাইন সেবাদান প্রতিষ্ঠানের চাহিদা আকাশ ছুঁয়েছে। সহকর্মী, পরিবার ও বন্ধুদের সরাসরি মুখোমুখি হওয়ার জায়গা নিয়েছে ভিডিও কল। পুরো ২০১৯ সালের চেয়ে ২০২০ সালের প্রথম দুই মাসে অনেক বেশি মানুষ ভিডিও কনফারেন্সিং সফটওয়্যার জুম ব্যবহার করছে। ঘরে অবস্থানকালে বিনোদনের চাহিদাও অনেক বেড়েছে। রেকর্ডসংখ্যক মানুষ এখন জনপ্রিয় অনলাইন পিসি গেম স্টোর স্টিম ব্যবহার করছে। ফেব্রুয়ারি থেকে এর ব্যবহার বেড়েছে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত। এমনকি অনলাইন মুদি দোকানগুলো তাদের ব্যবসা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গ্রাহককে ভার্চুয়াল লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

ইন্টারনেট কি তবে তার ইতিহাসের সবচেয়ে আকস্মিক উল্লম্ফন দেখছে? এখানে কিছু প্রতিবন্ধকতাও তৈরি হয়েছে। ওয়াইফাইয়ের গতি কমে গেছে, ওয়েবসাইটগুলো চাপ নিতে পারছে না এবং ভিডিও কল কেটে যাচ্ছে। তবে এসব ছোটখাটো দুর্ঘটনা ছাড়া ইন্টারনেট দারুণভাবে তার কাজ করছে।

অবশ্য ইন্টারনেট এ পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে সংগ্রাম করছে বলে মনে করেন ইউনিভার্সিটি অব অ্যাডিলেডের বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ রোগান। পাশাপাশি যত বেশি আমরা ইন্টারনেট ব্যবহার করব, তত বেশি বিভ্রান্তি আমাদের চোখে পড়বে। যদিও আপনি কেবল সংক্ষিপ্ত ও স্থানীয় প্রভাবগুলো দেখতে পাবেন, বিস্তৃত প্রভাবগুলো না।

সামগ্রিক ব্যবহারের পাশাপাশি, আমরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় ইন্টারনেট ব্যবহার করছি। অফিসের কাজ শেষ করে ইন্টারনেট ব্যবহারের যে সূচি তা এখন দুনিয়াজুড়ে বদলে গেছে। এখন দুপুরের খাবারের আগে থেকেই ইন্টারনেটের সর্বোচ্চ ব্যবহার দেখা যাচ্ছে, বলেছেন ক্লাউডফ্লেয়ারের সিইও ম্যাথিউ প্রিন্স। যদিও এটা কেন হচ্ছে, তা পরিষ্কার নয়। হতে পারে ভার্চুয়াল মিটিং অথবা ক্লাসরুমে অনেক সময় দিতে হচ্ছে। ক্লাউডফ্লেয়ার বলছে, ইতালিতে ইন্টারনেটের ব্যবহার ৪০ শতাংশ বেড়েছে। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে, যেখানে আগে থেকেই ইন্টারনেটের বহুল ব্যবহার সেখানে এই পরিবর্তনটি কম। অবশ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন দক্ষিণ কোরিয়া করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে ইতালির চেয়ে বহুগুণ সফল। তাই হয়তো দেশটিতে মহামারীজনিত এই ইন্টারনেট ব্যবহার বৃদ্ধি পায়নি।

ক্লাউডফ্লেয়ারের দেয়া উপাত্তগুলো দেখাচ্ছে কীভাবে মানবিক কার্যকলাপ সিটি সেন্টারকে পেছনে ফেলেছে এবং শহরতলিতে ছড়িয়ে পড়েছে। এ উপাত্ত বলছে, ফেব্রুয়ারি ১৯ থেকে মার্চের ১৮ তারিখের মাঝে দিনের বেলা ইন্টারনেটের ব্যবহার কীভাবে বদলেছে। এর আগে-পরে অনেক মানুষ ঘরে বসে কাজ শুরু করেছে। আরবান হাবগুলো লাল হয়ে গেছে, যার অর্থ ইন্টারনেটের ব্যবহার কমেছে। অন্যদিকে চারপাশে তৈরি হয়েছে সবুজ রঙের বলয়, যা ব্যবহার বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আকস্মিকভাবে চাহিদা বাড়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হচ্ছে। ইন্টারনেট মার্কেটের জন্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কমিশনার থিয়েরি ব্রেটন তদবির করার পর চাপ এড়াতে নেটফ্লিক্স, ইউটিউব, ফেসবুকসহ ভিডিও স্ট্রিমিং কোম্পানিগুলো ভিডিও চিত্রের মান কমিয়ে দিতে সম্মত হয়। মূলত ভিডিও অ্যাকাউন্টগুলো ইন্টারনেট ট্রাফিকের জন্য অর্ধেকের বেশি দায়ী।

ট্রাফিকের কারণে সৃষ্ট চাপের বাইরে আরো দুটি কারণে ইন্টারনেটের ওপর চাপ তৈরি হয়। একটি হচ্ছে স্থানীয় যে ডাটা সেন্টার থেকে আপনি বাসায় সংযোগ নিচ্ছেন তারা সাধারণত দুর্বল হয়ে থাকে। যাদের অনেকেই পুরনো কেবল ব্যবহার করে। অনেক ক্ষেত্রে টিভির জন্য তৈরি করা কেবলগুলো এখানে ব্যবহার করা হয়। যে কারণে ভিডিওগুলো দুর্বল দেখা যায়। পাশাপাশি এর ব্যান্ডউইডথও থাকে অনেক কম। যা কিনা কাজের গতিকে অনেক কমিয়ে দেয়। এছাড়া আশপাশের অনেকেই যখন একসঙ্গে ইন্টারনেট ব্যবহার করে তখন এর ওপর বেশ চাপও তৈরি হয়।

দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে কোম্পানিগুলোকে এখন একাধিক অবস্থান থেকে ট্রাফিক পরিচালনা করতে হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ ড্রপবক্স দিয়ে হাজারো ব্যবহারকারীকে সহজেই সংযুক্ত করা যায়, যখন কিনা তারা একই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস অথবা অফিস বিল্ডিংয়ে থাকে। তখন সব কার্যক্রম একটিমাত্র উচ্চগতির সংযোগ দ্বারা পরিচালনা করা যায়। কিন্তু এখন সেই সব হাজারো ব্যবহারকারী সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং তারা কয়েকশ ভিন্ন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে।

এসব ছোটখাটো সমস্যার পরও ইন্টারনেট দুনিয়াজুড়ে ভালোভাবেই তার কাজ করছে। এজন্য আমরা শিল্প বিপ্লবকে ধন্যবাদ দিতে পারি। দুই দশক আগেও ইন্টারনেটে মানুষের বাণিজ্যিক আগ্রহ ছিল সামান্য। যার অর্থ হচ্ছে এর অবকাঠামো প্রয়োজন অনুযায়ী বদলে গেছে। একটি বড় সংবাদ সবকিছুকে বদলে দিতে পারে। ইন্টারনেটে এখন অনেক ইন্ডাস্ট্রি একসঙ্গে দাঁড়িয়ে গেছে। কমকাস্টের মতো টেলিকম কোম্পানি, কন্টেট তৈরির জন্য নেটফ্লিক্স, রিটেইল জায়ান্ট অ্যামাজন, ভার্চুয়াল স্টোরেজ সরবরাহকারী ড্রপবক্স শক্তিশালী সার্ভার ব্যবহারের মাধ্যমে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। যার ফলে সক্ষমতা, গতি ও পারফরম্যান্স সবকিছুই বেড়েছে। ইন্টারনেটের এ বাণিজ্যিকীকরণ নেটওয়ার্কের একটি শক্তিশালী জাল তৈরি করেছে, যা দারুণভাবে কাজ করছে।

ক্লাউড পরিষেবা দ্বারা পরিচালিত নেটফ্লিক্স ও ড্রপবক্সের মতো কোম্পানিগুলো তাদের কার্যক্রম অনেক দ্রুতগতির করেছে। যখন চাহিদা বাড়ছে তখন বাড়তি সার্ভার ব্যবহার করা হচ্ছে। কভিড-১৯-এর কারণে এটি বিস্তৃত হয়েছে। তবে এর বাইরে কিছু সমস্যাও আছে। ইন্টারনেটের এখনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজে মানুষের স্পর্শের প্রয়োজন হচ্ছে। যেখানে সার্ভার বদলে দেয়া বা ঠিক করার প্রয়োজন হচ্ছে। যা কিনা কেবল ইঞ্জিনিয়ারদের পক্ষে সম্ভব। কিন্তু লকডাউন অবস্থায় এ কাজগুলো করা এখন বেশ কঠিন। এছাড়া সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়লে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও হার্ডওয়্যার পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। চীন হচ্ছে অপটিক্যাল ফাইবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যারের সবচেয়ে বড় উৎপাদক। এখন সাপ্লাই বন্ধ হয়ে গেলে, তা বিশ্বের অনেক জায়গায় ইন্টারনেট সেবাকে বাধাগ্রস্ত করবে। বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলোর জনসাধারণকে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়তে হতে পারে। কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে চিন্তা করলে ইন্টারনেট বর্তমানে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী ও তাত্পর্যময় রূপ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে।

 

সূত্র: টেকনোলজি রিভিউ

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এটাও পড়ুন

Close
Close