আলোচিতসারাদেশ

শ্রীপুরে ফোর মার্ডার: ডাকাতি করতে গিয়ে বাবা ছেলে মিলে অংশ নেয় ধর্ষন ও হত্যায়

বার্তাবাহক ডেস্ক : গাজীপুরের শ্রীপুরে চাঞ্চল্যকর ফোর মার্ডারের ঘটনায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) দুই ধরণের তথ্য দিয়েছে। পিবিআই বলছে, মোবাইল চুরি করতে গিয়ে ধর্ষণ ও চার জনকে হত্যার ঘটনায় একজন জড়িত। অপরদিকে র‌্যাব বলছে, ডাকাতি করতে গিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে।

পিবিআই তাদের দাবী অনুযায়ী রবিবার (২৬ এপ্রিল) রাতে পারভেজ নামের সংশ্লিষ্ট চোরকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। অপরদিকে র‌্যাব হত্যার ঘটনায় জড়িত আরোও পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

পিবিআই বলছে গ্রেপ্তারকৃত পারভেজ সব স্বীকার করেছে এবং র‌্যাবও বলছে গ্রেপ্তারকৃত পাঁচ জনই অপরাধ স্বীকার করে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে। দুই সংস্থাই লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধারের দাবী করেছে। দুটি সংস্থাই গণমাধ্যমে পৃথক প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে এসব তথ্য জানায়।

তবে পিবিআই এর হাতে গ্রেপ্তারকৃত পারভেজ যে ওই ঘটনায় জড়িত তা র‌্যাব তাদের হাতে গ্রেপ্তারকৃতদের বরাত দিয়ে জানায়।

র‌্যাব আরো জানায়, ধুর্ত প্রকৃতির পারভেজ নিজের বাবাসহ অন্যদের বাঁচাতে নিজের কাঁদের ওপর সব দোষ নিয়ে স্বীকারোক্তি প্রদান করেছে।

এদিকে আলোচিত ঘটনায় দায়ের করা চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও শ্রীপুর মডেল থানার দুই পরিদর্শককে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাতে প্রত্যাহার করা হয়েছে। প্রত্যাহারকৃত কর্মকর্তারা হলেন শ্রীপুর মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) খন্দকার সোহেল রানা, পরিদর্শক (অপারেশন) মো: তারিকুজ্জামান এবং চাঞ্চল্যকর মা ও তিন সন্তান হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবু জাফর মোল্লা। তাদের মধ্যে এসআই আবু জাফর মোল্লা মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন।

র‌্যাবের হাতে গ্রেফতারকৃরা হলো -কাজিম দ্দিন (৫০), হানিফ (৩২), বশির (৬), হেলাল (৩০), ও এলাহি মিয়া (৩৫)। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) ও বুধবার (২৯ এপ্রিল) সকাল পর্যন্ত শ্রীপুরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়। উদ্ধার করা হয় লুণ্ঠিত ৩০ হাজার টাকা, একটি অংটিসহ বেশ কিছু আলামতও।

এর আগে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেষ্টিগেশন এই ঘটনায় রবিবার (২৬এপ্রিল) রাতে গ্রেপ্তার করে কাজিমুদ্দিনের ছেলে পারভেজকে (১৭)।

বুধবার (২৯ এপ্রিল) বিকেলে অনলাইনে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে র‌্যাবের লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক ও গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম পাঁচজনকে গ্রেপ্তাররের বিষয়টি জানান।

উল্লেখ্য, গত ২৩ মে মধ্যরাত থেকে ভোর ৫টার মধ্যে শ্রীপুর থানাধীন জৈনা বাজার সংলগ্ন আবদার গ্রামে মালয়েশিয়া প্রবাসী রেজোয়ান হোসেন কাজলের ডুপ্লেক্স বাসায় নৃশংসভাবে খুন করা হয় তার ইন্দোনেশীয় নাগরীক তার স্ত্রী ডিসিষ্ট স্মৃতি ফাতেমা (৩৮), তার বড় মেয়ে সাবরিনা সুলতানা নুরা (১৬), ছোট মেয়ে হাওয়ারিন (১৩) ও প্রতিবন্ধী ছেলে ফাদিলকে (৮)। হত্যার আগে মা ও দুই মেয়েকে ধর্ষনও করে এই দুবৃত্তরা।

কাজল মালয়শিয়া থাকেন দীর্ঘদিন ধরে। তার স্ত্রী ফাতেমা ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক। গত ১৮/১৯ বছর আগে তিনি ফাতেমাকে বিয়ে করে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। কাজল শ্রীপুরে জায়গা কিনে এখানেই বাড়ি করে পরিবারকে রাখেন।

ঘটনার বর্ননা দিয়ে লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম বলেন, এর আগে পিবিআই এর হাতে গ্রেপ্তারকৃত পারভেজ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়। সেখানে সে এ ঘটনায় একাই জড়িত বলে স্বীকার করে। এর পেছনের কারণ উল্লেখ করে লে.কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম বলেন, এরা অত্যন্ত ধুর্ত প্রকৃতির। পারভেজ এর আগেও এক শিশুকে ধর্ষনের পর খুন করে। ওই ঘটনায় সে অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে জামিনে ছাড়া পায়। এবারও সে একই ধরনের ঘটায় জড়ায় তার বাবাসহ অন্যদের নিয়ে। সে জানে অপ্রাপ্ত বয়স্ক বলে এবারও সে ছাড়া পাবে। হয়তো এরকমটা চিন্তা করেই বাবাসহ অন্যদের বাঁচাতে সে নিজের কাধে সব দোষ নেয়।

তিনি আরো জানান, গ্রেপ্তারকৃতরা সবাই মাদকাসক্ত। তারা চুরি,জুয়া ও ছিনতাইয়ের মত অপরাধের সাথেও জড়িত। এরা পেশায় কেউ রিকশা চালক। কেউ বা ছোটখাট কাজ করে। এরা সবাই ভিকটিমের বাসার কাছে আড্ডা দিত। ঘটনার কিছুদিন আগে তারা জানতে পারে ভিকটিম ফাতেমার স্বামী কাজল মালয়শিয়া থেকে ২০/৩০ লাখ টাকা পাঠিয়েছে হুন্ডির মাধ্যমে। তারা সবাই পরিকল্পনা করে সেই টাকা তারা লুট করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৩ এপ্রিল তারা ফাতেমাদের বাসার পেছনে জড়ো হয়। পারভেজ প্রথমে ভেন্টিলেটর দিয়ে ডুপ্লেক্স ওই বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে। অন্যদিকে হানিফ ছাদ দিয়ে প্রবেশ করে চিলেকোঠায়। তারপর তারা বাসার গেট খুলে দিলে পারভেজের বাবাসহ অন্যরা বাসায় ঢুকে পড়ে।

হানিফ ও কাজিমুদ্দিন প্রথমে ফাতেমাকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে। তার কাছ থেকে হুন্ডির পাঠানো ২০/৩০ লাখ টাকা চায়। ফাতেমা এরকম কোন টাকা পাঠানো হয়নি বলে জানায় এবং বাসায় থাকা ৩০ হাজার টাকা তাদের হাতে তুলে দেয়। এসময় তারা দু’জন ফাতেমাকে ধর্ষন ও হত্যা করে। এদিকে অন্য কক্ষগুলোতেও চলে লুটপাট ও ধর্ষন। পারভেজ ও তার বাবা কাজিমুদ্দিনসহ সবাই এক সাথে বড় মেয়ে সাবরিনা সুলতানা নুরা (১৬) ও ছোট মেয়ে হাওয়ারিনকে (১৩) ধর্ষন ও হত্যায় অংশ নেয়। তবে প্রতিবন্ধী ছেলে ফাদিল (৮) কে হত্যা করা নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে তারা। এক গ্রুপ তাকে হত্যা করতে না চাইলেও অন্য অংশ সাক্ষি না রাখার পক্ষে মত দেয়। পরে সবাই বাক প্রতিবন্ধি শিশুটিকেও হত্যা করে।

এ ঘটনায় আরো ৪/৫ জন জড়িত থাকতে পারে উল্লেখ করে পরিচালক লে.কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম জানান, তাদেরকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তিনি তাদের নাম প্রকাশ করতে চাননি।

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close