আন্তর্জাতিকআলোচিত

করোনাভাইরাস: মাফিয়া চক্র যেভাবে মহামারির সুযোগ নিচ্ছে

আন্তর্জাতিক বার্তা : ইতালিতে করোনাভাইরাস এর মহামারিতে মৃত্যুর সংখ্যা যখন বাড়ছে, তখন সেখানে সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধী চক্র এই ফাঁকে লাখ লাখ ইউরো হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ খুঁজছে। এই মহামারিতে সংকটে পড়া বহু মানুষ মনে করছেন, মাফিয়ারা তাদের সাহায্যের জন্য যে প্রস্তাব দিচ্ছে, সেটি গ্রহণ করা ছাড়া তাদের আর উপায় নেই।

সিসিলি দ্বীপের একটি দরিদ্র এলাকায় গরিব মানুষদের মধ্যে খাদ্য বিতরণ করছেন এক লোক। তিনি স্থানীয় একটি মাফিয়া গোষ্ঠীর এক সদস্য বা মাফিওসোর ভাই।

“লোকজন আমাকে ফোন করে কান্নাকাটি করে। তারা বলে তারা তাদের বাচ্চাদের খাওয়াতে পারছে না। এক তরুণী তো আমাকে প্রতিদিনই ফোন করে। এই মেয়েটি বলছে তার পাঁচটা ছেলে-মেয়ে এবং সে জানেনা কীভাবে তার বাচ্চাদের খাবার জোগাবে।”

এই লোকটি স্বীকার করতে রাজি নয় যে সে নিজে কোন মাফিয়া চক্রের সদস্য। কিন্তু তার কথা হচ্ছে, কোন মাফিয়া চক্রের সদস্য হওয়ার মানে যদি হয় লোকজনকে সাহায্য করা, তাহলে একজন মাফিওসো হিসেবে সে গর্বিত।

করোনাভাইরাস হয়তো নতুন, কিন্তু দরিদ্র লোকজনের মধ্যে খাবার বিতরণ করা মাফিয়াদের একটি পুরনো কৌশল।

“ওদের লক্ষ্য হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করা এবং তারপর রাষ্ট্রের বিকল্প একটি শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করা”, বলছেন নিকোলা গ্রাটেরি। তিনি ক্যালাব্রিয়ার কাটানযারোর প্রধান কৌঁসুলি এবং একজন মাফিয়া বিরোধী তদন্ত কর্মকর্তা।

গত কয়েক বছর ধরেই ইতালির অর্থনীতির অবস্থা খুবই খারাপ। সেখানে বেকারত্বের হার খুব বেশি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার খুবই ধীরগতির।

করোনাভাইরাস মহামারির ফলে কিছু মানুষের পিঠ যেন একেবারে দেয়ালে ঠেকে গেছে। তারা চরম হতাশাগ্রস্থ, বেপরোয়া। কিন্তু এরকম একটা অবস্থায় মাফিয়াদের কাছ থেকে একেবারে সামান্যতম সাহায্য নেওয়াও কিন্তু খুবই বিপদজনক।

“মাফিয়ারা আসলে আজ পর্যন্ত কোন কিছুই দয়া দেখিয়ে করেনি। তাদের মধ্যে দয়া বা মহানুভবতার ধারণাটাই নেই”, বলছেন এনজা রান্ডো। তিনি কাজ করেন একটি মাফিয়া বিরোধী সংস্থার সঙ্গে।

“তারা শুধু একটা জিনিসই জানে, আর তা হচ্ছে, তুমি যদি আমার পিঠ চুলকে দাও আমি তোমারটা চুলকে দেব।”

মাফিয়ারা শুরুতে তাদের দেয়া সাহায্যের জন্য কোন প্রতিদান চাইবে না। কিন্তু একটা সময় আসবে যখন প্রত্যেককে এই সাহায্যের প্রতিদান দিতে হবে।

পালার্মোর নগর কেন্দ্রের কাছে একটি রেস্টুরেন্টের মালিক মার্সেলো। গত মার্চে লকডাউন জারি হওয়ার পর তাকে সেই রেষ্টুরেন্টটি বন্ধ করে দিতে হয়েছে।

মার্সেলো মনে করছেন যে তাকে এমন একটা সাহায্যের প্রস্তাব দেয়া হবে যেটা তিনি প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন না।

“তারা খুবই সোজাসাপ্টা”, বলছেন তিনি।

“একজন মাফিওসো আপনার দরজায় টোকা দেবে এবং তারপর বলবে তোমার ব্যবসাটা আমরা কিনতে চাই। তক্ষুনি। তখন হয়তো আপনি তার সঙ্গে দর কষাকষি শুরু করবেন। এবং তারপর কেউ একজন অর্ধেক টাকা আপনার অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দেবে। বাকিটা আপনাকে নগদে দেয়া হবে।”

“এই মুহূর্তে আমার ব্যবসার অবস্থা খুবই খারাপ, পুরো ব্যবসাটা আসলে ডুবতে বসেছে। এরকম একটা অবস্থায় কেউ যখন আমার দিকে বাঁচার মতো কিছু একটা ছুঁড়ে দেবে, তখন আপনাকে হয়তো সেটা গ্রহণ করতে হবে অথবা নিজের আদর্শ আঁকড়ে ধরে রেখে ডুবে মরতে হবে।”

গারসপারে মাটোলো সিসিলির একটি মাফিয়া গোষ্ঠীর এক সাবেক সদস্য। তিনি বলছেন, সাহায্যের প্রতিদান পাওয়ার জন্য মাফিয়া একটা সময়ে ঠিকই ফিরে আসবে।

মাটোলো একজন সাবেক মাফিওসো এবং তিনি বেশ কয়েকটি মাফিয়া বিরোধী মামলায় সাক্ষী ছিলেন।

“আমি নিজেই একসময় এভাবে কাজ করেছি। আমি সবসময় ছিলাম বেশ প্রাণবন্ত। আমাকে মনে হতো বেশ উদার মনের এক মানুষ। আমি কখনোই নিজের আসল চেহারা প্রকাশ করিনি। কিন্তু মনে রাখবেন আমি ছিলাম একজন অপরাধী – আমি ২০ জনের বেশি লোককে হত্যা করেছিলাম।”

মাটোলো বিবিসির সঙ্গে কথা বলেছেন একটা গোপন জায়গা থেকে। সেখানে পুলিশ তাকে পাহারা দেয়। তিনি তার সময় কাটান ছবি এঁকে। তার আঁকা অনেক ছবিতে দেখা যায় কীভাবে সমাজের বিভিন্ন স্তরে মাফিয়া তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করছে।

তিনি বলছেন, যখনই তিনি অভাবে পড়া কাউকে সাহায্য করেছেন, লোকটি কে, সেটি তিনি দেখেননি।

“যখন কিনা আপনার ছেলে কাঁদছে খাবার টেবিলে কোন খাবার নেই বলে, যখন কিনা আপনার ব্যবসা প্রায় দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম, তখন আপনি কোন খারাপ লোকের কাছ থেকে সাহায্য নিচ্ছেন কিনা সেটা নিয়ে চিন্তা করার সময় আসলে নেই। তখন আপনার একটাই চিন্তা কীভাবে আমি বাঁচব।”

এরপর যখন স্থানীয় নির্বাচন শুরু হতো, তখন মাটোলো সেইসব লোকের কাছে যেতেন যাদের তিনি সাহায্য করেছিলেন। তিনি বলতেন, আমাকে কি মনে করতে পারো? আমি তোমাকে সাহায্য করেছিলাম যখন তোমার সাহায্যের দরকার ছিল। এখন আমার সাহায্যের দরকার। আমি চাই তুমি তোমার ভোটটা আমার প্রার্থীকে দেবে।

মাটোলো বলছেন মাফিয়াদের কাছে কোন একটা সংকটে খরচ করার মতো অর্থ একেবারে প্রস্তুত থাকে। যখন কাউকে সাহায্য করার ব্যাপার আসে সেই কাজে তারা রাষ্ট্রের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ।

আন্তোনিও এবং তার স্ত্রী ফ্রানসেস্কা দক্ষিণ ইতালির ছোট্ট শহর আপুলিয়ায় একটি মাংসের দোকানের মালিক। লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে তাদের দোকানের অবস্থা বেশ কাহিল।

কয়েকদিন আগে তাদের একজন নিয়মিত খদ্দের দোকানে আসলো এবং তাদেরকে সাহায্য করার জন্য নগদ অর্থ দেয়ার প্রস্তাব করলো।

“আমরা দুজনে দুজনের চোখের দিকে তাকালাম। আমাদের বুক ধুকপুক করছিল। আমরা সাথে সাথে বুঝতে পারলাম কি ঘটতে যাচ্ছে”, বলছিলেন আন্তোনিও।

আন্তোনিও এবং তার স্ত্রী এই প্রস্তাব সাথে সাথে প্রত্যাখ্যান করলেন।

“কিন্তু মাফিয়াদের ব্যবসার একটা প্রধান দিক হচ্ছে টাকা ধার দেয়া। তারা টাকা ধার দেবে । কিন্তু ধার নেয়ার পর ধীরে ধীরে শুরু হবে আপনার যন্ত্রণা। মাফিওসোর চূড়ান্ত লক্ষ্য এই টাকা দিয়ে মুনাফা অর্জন নয়। তারা চায় আপনার ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে এবং তারপর সেই ব্যবসার মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করতে‍।”

মাফিয়াদের চাঁদাবাজির শিকার যারা, তাদের জন্য চালু করা এক হটলাইনে টেলিফোন কলের সংখ্যা ১০০ শতাংশ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে।

‍”সরকার যদি এদের কোন সাহায্য না করে, তাদেরকে কিন্তু মাফিয়াদের কোলে ঠেলে দেয়া হবে”, বলছেন এই হেল্পলাইনের এটিলিও সিমিওন।

গত শতকের গ্রেট ডিপ্রেশনের পর বিশ্ব যখন সবচেয়ে খারাপ এক অর্থনৈতিক মন্দার মুখোমুখি, ইতালির বহু মানুষ তখন চরম অর্থকষ্টে।

“এই মুহূর্তটা মাফিয়াদের জন্য একটা মোক্ষম সময়”, বলছেন এনজা রান্ডো।

আরো অনেক মাফিয়া বিরোধী বিশেষজ্ঞদের মত তিনিও ইতালির সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন যাতে করে লোকজন এবং বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সহজে টাকা ধার করতে পারে।

মাফিয়ারা নগদ অর্থের সাহায্য নিয়ে তাদের কাছে হাজির হওয়ার আগেই যেন তারা সরকারের কাছ থেকে সাহায্য পায়।

ইতালিয়ান সরকার বলছে যে তারা প্রতিটি ব্যবসা, যারা সঙ্কটে আছে তাদেরকে ২৫ হাজার ইউরো করে টাকা ধার দেবে। তবে মার্সেলোর কোনো আগ্রহ নেই সরকারের কাছ থেকে টাকা ধার করার।

“কারণ এই টাকা ফেরত দেওয়া খুব কঠিন হবে। যেসব দোকান নতুন করে খুলবে তাদেরকে সোশ্যাল ডিস্ট্যান্স বা সামাজিক দূরত্বের নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হবে। এর মানে হচ্ছে আগের চেয়ে আমরা অনেক কম কাস্টমার পাব এবং আমাদের বেচা-বিক্রি এবং মুনাফা আগের চেয়ে কম হবে।”

তিনি আরো বলছেন, যে কয়জন রেস্টুরেন্ট মালিককে তিনি জানেন তাদের সবার ভাবনাও একই রকম। এরা সবাই মনে করছেন কোন মাফিয়ার কাছে দ্রুত ব্যবসা বিক্রি করে দেয়াটাই সবচেয়ে ভালো।

“আমার নিজেকে চরম ব্যর্থ বলে মনে হচ্ছে। আমি সব সময় মাফিয়াদের নিন্দা করেছি। কিন্তু এখন আমার মনে হচ্ছে সারাজীবন আমি যা বিশ্বাস করে এসেছি, এখন আমি তার সঙ্গে বেইমানি করতে যাচ্ছি।”

 

সূত্র: বিবিসি

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এটাও পড়ুন

Close
Close