অর্থনীতিআলোচিতস্বাস্থ্য

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ১৪ ঠিকাদারকে কালো তালিকাভুক্ত করে নির্দেশনা জারি

বার্তাবাহক ডেস্ক : স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠানের কাজে অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে ১৪ ঠিকাদারের জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে এ ঠিকাদারদের কালো তালিকাভুক্ত করে নির্দেশনা জারি করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

অভিযুক্ত ঠিকাদারদের কালো তালিকাভুক্ত করতে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠায় দুদক। চিঠিতে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি এ ধরনের দুর্নীতি ও প্রতারণামূলক কার্যক্রম ঠেকাতে তাদের কালো তালিকাভুক্ত করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর এ-সংক্রান্ত একটি নির্দেশনামূলক চিঠি পাঠিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

দুদকের তালিকাভুক্ত ওই ১৪ ঠিকাদারের মধ্যে রয়েছে রহমান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ও রূপা ফ্যাশনের স্বত্বাধিকারী ও দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেরানী আবজাল হোসেনের স্ত্রী রুবিনা খানম, মেসার্স অনিক ট্রেডার্সের মালিক আবদুল্লাহ আল মামুন, মেসার্স আহমেদ এন্টারপ্রাইজের মালিক মুন্সী ফররুখ হোসাইন, মেসার্স ম্যানিলা মেডিসিন অ্যান্ড মেসার্স এসকে ট্রেডার্সের মালিক মনজুর আহমেদ, এমএইচ ফার্মার মালিক মোসাদ্দেক হোসেন, মেসার্স অভি ড্রাগসের মালিক মো. জয়নাল আবেদীন, মেসার্স আলবিরা ফার্মেসির মালিক মো. আলমগীর হোসেন, এসএম ট্রেডার্সের মালিক মো. মিন্টু, মেসার্স মার্কেন্টাইল ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক মো. আবদুস সাত্তার সরকার ও মো. আহসান হাবিব, বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল কোংয়ের মালিক মো. জাহের উদ্দিন সরকার, ইউনিভার্সেল ট্রেড করপোরেশনের মালিক মো. আসাদুর রহমান, এএসএলের এমডি ও সিইও আফতাব আহমেদ ও বেয়ার এভিয়েশনের মালিক মো. মোকছেদুল ইসলাম।

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকরণসহ ক্রয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনয়ন এবং দুর্নীতি, প্রতারণা ও চক্রান্তমূলক কার্যক্রম প্রতিরোধের জন্য ১৪টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও তাদের স্বত্বাধিকারীদের কালো তালিকাভুক্ত করা প্রয়োজন বলে অভিমত দিয়েছে দুদক। কমিশনের এ অভিমতের আলোকে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানসহ তাদের স্বত্বাধিকারীদের বিরুদ্ধে সুপারিশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

দুদকের চিঠিতে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ভারী ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রায়ই অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়। দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মেডিকোল কলেজ হাসপাতালগুলোয় একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে কতিপয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও প্রচলিত বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে বিভিন্ন চিকিৎসা যন্ত্র, ভারী যন্ত্রপাতি ইত্যাদি সরবরাহ করে থাকে।

চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মালামালের সরবরাহ না নিয়েও বিল পরিশোধের ঘটনা ঘটেছে। এক্ষেত্রে অসাধু ঠিকাদাররা সিন্ডিকেট গঠন করে এ ধরনের টেন্ডারে অংশ নিয়ে থাকে। সিন্ডিকেটের কারণে প্রতিযোগিতামূলক দর না পাওয়ায় প্রচলিত বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে এসব সামগ্রী ক্রয় করতে হয়। এর ফলে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থের ক্ষতিসাধনসহ আত্মসাতের সুযোগ সৃষ্টি হয়। গত কয়েক বছরে এ ধরনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুদক অনুসন্ধান শেষে কয়েকটি মামলা ও মামলার সঙ্গে জড়িত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করেছে।

দুদকের কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ও আলোচিত কেরানি আবজাল হোসেনের স্ত্রী রুবিনা খানমের রহমান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ও রূপা ফ্যাশন। প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে মেডিকেল সরঞ্জাম ক্রয়সংক্রান্ত এক মামলায় ৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও ৩১ কোটি ৫০ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের কথা বলা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় করা এক মামলায় সাড়ে ৩৭ কোটি টাকা সরকারি তহবিল আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।

পুরানা পল্টনের আবদুস সাত্তার সরকার ও মো. আহসান হাবীবের মালিকানাধীন মেসার্স মার্কেন্টাইল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, তোপখানা রোডের জাহেরউদ্দিন সরকারের মালিকানাধীন বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল ও দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আসাদুর রহমানের মালিকানাধীন ইউনিভার্সেল ট্রেড করপোরেশনের বিরুদ্ধে দুদকের খুলনার সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের মামলায় সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৬ কোটি ৬ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।

জাহেরউদ্দিন সরকারের মালিকানাধীন বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যালের বিরুদ্ধে রংপুর মেডিকেল কলেজের সাড়ে ৪ কোটি টাকা ও চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের নামে যন্ত্রপাতি ক্রয়ের নামে ৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করেছিল দুদক। এছাড়া চট্টগ্রামে দুর্নীতির অভিযোগে মুন্সী ফররুখ হোসাইনের মেসার্স আহমেদ এন্টারপ্রাইজ, বেঙ্গল সাইন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল কোং ও এর স্বত্বাধিকারী মো. জাহের উদ্দিন সরকার এবং এএসএল ও প্রতিষ্ঠানটির এমডি আফতাব আহমেদকেও কালো তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করেছিল দুদক।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কেনাকাটায় অনিয়মের মাধ্যমে ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ঢাকার মিরপুরের আবদুল্লাহ আল মামুনের মালিকানাধীন অনিক ট্রেডার্স ও মুন্সী ফররুখ হোসাইনের মেসার্স আহমেদ এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধেও দুদকের মামলা রয়েছে। এছাড়া বিনা টেন্ডারে সাড়ে ৯ কোটি টাকারও বেশি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে রংপুরের মনজুর আহমেদের মালিকানাধীন মেসার্স ম্যানিলা এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স এসকে ট্রেডার্স, মোসাদ্দেক হোসেনের মালিকানাধীন এমএইচ ফার্মা, জয়নাল আবেদীনের মালিকানাধীন মেসার্স অভি ড্রাগস, আলমগীর হোসেনের মালিকানাধীন মেসার্স আলবিরা ফার্মেসি ও মো. মিন্টুর মালিকানাধীন এসএম ট্রেডার্সকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। ঢাকার মোকছেদুল ইসলামের মালিকানাধীন বেয়ার এভিয়েশনের নামে ৭৫ লাখ টাকা ভ্যাট ফাঁকি ও মিথ্যা ব্যয় দেখিয়ে ৮৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দিনাজপুরে একটি মামলা রয়েছে।

দুদকের স্বাস্থ্যবিষয়ক দুর্নীতি নিয়ে অনুসন্ধানে গঠিত দলের সদস্য ও কমিশনের উপপরিচালক মো. সামসুল আলম এ বিষয়ে বলেন, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করছে দুদক। বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রে বেশকিছু অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। এ অভিযোগে বেশ কয়েকটি মামলাও দায়ের হয়েছে। আরো অভিযোগ অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।

এ-সংক্রান্ত মামলা ও গ্রেপ্তারের বিষয়টিকে আইনি প্রক্রিয়া উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনুসন্ধান ও তদন্ত পর্যায়ে এর চেয়ে বেশিকিছু বলা সম্ভব নয়।

 

 

সূত্র: বণিক বার্তা

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এটাও পড়ুন

Close
Close