অর্থনীতিআলোচিতগাজীপুরস্বাস্থ্য

‘ড্রাগ লাইসেন্স’ নেই গাজীপুর জেলার ৬৫ শতাংশ ফার্মাসির!

বার্তাবাহক ডেস্ক : গাজীপুর মহানগরসহ জেলার পাঁচটি উপজেলার হাটবাজার ও অলি-গলিতে ফার্মাসি রয়েছে প্রায় সাত হাজার। এর মধ্যে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে নেয়া ড্রাগ লাইসেন্স রয়েছে মাত্র ২ হাজার ৪৩৭টির, শতাংশের হিসেবে যা মাত্র ৩৫ ভাগ। বিপুল পরিমাণ ফার্মাসি এখনো ঔষধ প্রশাসনের নজরদারির বাইরে রয়েছে। এসব ফার্মাসির বিরুদ্ধে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর রোগের ওষুধ সরবরাহ করা হয়। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে সাধারণ মানুষের।

এদিকে ফার্মাসি চালু করার জন্য সনদপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট থাকা বাধ্যতামূলক হলেও তা মানা হচ্ছে না। অল্প শিক্ষিত ও ওষুধ সম্পর্কে সীমিত ধারণাসম্পন্ন লোকবল দিয়েই চলছে এসব ফার্মাসির ব্যবসা।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর গাজীপুর ও কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতি সূত্রে জানা গেছে, জেলার পাঁচ উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজার, পাড়া-মহল্লায় ছয়-সাত হাজার ফার্মাসি রয়েছে। এর মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত ড্রাগ লাইসেন্স নিয়েছে মাত্র ২ হাজার ৪৩৭ ফার্মেসি। অধিকাংশ ফার্মেসিতেই ফার্মাসিস্ট না থাকায় অল্প শিক্ষিত লোকবল দিয়ে চলছে ব্যবসা। এজন্য অনেক সময় চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র না বুঝে ভুল ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে রোগীদের।

গত সোমবার সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, শ্রীপুর উপজেলার মাওনা চৌরাস্তায় প্রায় ৫০টির মতো ফার্মেসি রয়েছে, মাওনা চৌরাস্তার প্রাণকেন্দ্রে ইশিকা মেডিকেল হল, সিটি মেডিকেল হল, কৌশিক মেডিকেল কর্নার, মামুন মেডিসিন কর্নার, রোকেয়া ফার্মেসি, ইকরা মেডিকেল হল, জুয়েল মেডিকেল হল অন্যতম। এগুলোর কোনোটিরই ড্রাগ লাইসেন্স নেই। এমনকি সনদপাপ্ত ফার্মাসিস্টও নেই। এছাড়া শ্রীপুর, কাপাসিয়া, কালিয়াকৈর, কালীগঞ্জ ও গাজীপুর সদর উপজেলা হেড কোয়ার্টারে ড্রাগ লাইসেন্সবিহীন ফার্মাসি রয়েছে শতাধিক। আর এসব ফার্মাসির মূল গ্রাহক নিম্ন আয়ের মানুষ। সনদপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট ও চিকিৎসক না থাকলেও সর্বরোগের ওষুধ বিক্রি চলে এসব ফার্মাসিতে। কখনো কখনো ফার্মাসির মালিক নিজেই চিকিৎসক হয়ে রোগীদের মৌখিক ব্যবস্থাপত্র দেন। ওষুধ বিক্রির পাশাপাশি ছোটখাটো অস্ত্রোপচারও করেন তারা। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর ওষুধ সরবরাহের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসনের নজরদারির অভাবেই দিন দিন বাড়ছে অনুমোদনহীন ফার্মাসির সংখ্যা। মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ১-২ হাজার টাকা জরিমানা করেই দায়িত্ব সারে ঔষধ প্রশাসন।

বৈধ ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঔষধ প্রশাসন নজরদারি বাড়ালে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রেহাই পেতে পারেন গাজীপুর জেলাবাসী।

বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতি, গাজীপুর জেলা শাখা সভাপতি হুসনে আজীম কায়সার জিন্না জানান, গাজীপুর জেলাজুড়ে বৈধ ড্রাগ লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে ২ হাজার ৪৩৭ ফার্মেসি। এর মধ্যে নগরীতে এ সংখ্যা হাজারখানেক হবে। তবে অবৈধ বা অনুমোদনবিহীন ফার্মেসির সংখ্যা প্রায় চার হাজার।

তিনি বলেন, অলিতে-গলিতে ফার্মেসি গড়ে উঠছে আর সেগুলোয় অবাধে অ্যান্টিবায়োটিকসহ জটিল রোগের ওষুধ ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই বিক্রি করা হচ্ছে। আমরা একাধিকবার জেলা ড্রাগ সুপারকে অনুরোধ জানিয়েছি এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে, কিন্তু কোনো ফল পাইনি।

গাজীপুর সিভিল সার্জন মো. খায়রুজ্জামান বলেন, আমাদের দেশে ঘরে ঘরে গ্রাম্য চিকিৎসক, তাদের পরামর্শে একটু জ্বর হলেই ফার্মাসিতে গিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে নেন। আর অর্থলোভে ফার্মেসিও যেকোনো ওষুধ ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই বিক্রি করেন। এতে মারাত্মক হুমকিতে পড়ছে স্বাস্থ্যসেবা। কারণ অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারে সামনে এমন অবস্থা হতে পারে যে, আমাদের শরীরে আর কোনো অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করবে না। তখন সামান্য অসুখই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে।

এ সমস্যার সমাধানের বিষয়ে তিনি বলেন, এজন্য উচিত একটি সঠিক নীতিমালা, যাতে একটি বিশেষ ক্যাটাগরির ফার্মেসি এবং চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া কেউ অ্যান্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ওষুধ বিক্রি করতে না পারে। আর ঔষধ প্রশাসনেরও এক্ষেত্রে নজরদারি বাড়ানো উচিত। তবে সব কিছুর পাশাপাশি জনসচেতনতা সৃষ্টি জরুরি। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশ। এমডিজি, এসডিজি অর্জনে সুস্থ-সবল জনগোষ্ঠী দরকার। তাই অবাধে ওষুধ বিক্রি বন্ধ করে সঠিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে।

গাজীপুর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক মরুময় সরকার বলেন, জেলায় প্রায় ২ হাজার ৪৩৭টি ফার্মাসির ড্রাগ লাইসেন্স আছে। বাকিগুলো লাইসেন্স বিহীন। জরুরি ভিত্তিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অনুমোদনহীন ফার্মাসিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 

সূত্র: বণিক বার্তা

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এটাও পড়ুন

Close
Close