আলোচিত

‘নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনার জন্য থানার ওসিও দায়ী’: সৈয়দ বজলুল করিম

বার্তাবাহক ডেস্ক : নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনায় তিন জনকে আটক করা হয়েছে। তবে ঘটনার একমাস পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও দেখে উদ্যোগী হওয়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

গত ২ সেপ্টেম্বরের ঘটনা হলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্যাতনের ভিডিওটি ভাইরাল হয় গত শনি-রবিবারে। এরপরই বর্বরোচিত ঘটনাটি জানতে পারে পুলিশ. তা-ও বেগমগঞ্জ থানা পুলিশ জানতে পারেনি, কোনো ব্যবস্থাও নেয়নি, নোয়াখালী জেলার এসপির নজরে এলে তিনি দুর্বত্তদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন এবং তারপর তৎপর হয় পুলিশ।

এ পর্যন্ত যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলকা থেকে প্রত্যেককেই গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।

স্থানীয় ঘটনা একমাসেও কেন তারা জানতে পারলেন না- এই প্রশ্নের জবাবে বেগমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হারুন অর রশীদ বলেন, ‘‘আমাদের কেউ জানায়নি। কেউ অভিযোগও করেনি৷ ফলে আমরা জানতে পারিনি। ফেসবুকে ভিডিও ভাইরাল হলে আমরা জানতে পারি।’’

ওসির এই জবাবটি গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করেন পুলিশের সাবেক এআইজি এবং ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক প্রধান সৈয়দ বজলুল করিম। তিন বলেন, ‘‘কেউ জানাবে সেজন্য পুলিশের বসে থাকার সুযোগ নেই। অনেক সময় প্রভাবশালীদের কারণে অসহায় মানুষ মুখ খোলে না। কিন্তু পুলিশের তো তথ্য সংগ্রহের নিজস্ব চেইন থাকে। গ্রামের চৌকিদারও তাদের তথ্য দিতে বাধ্য। আর এখন থানা পর্যায় পর্যন্ত গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করে।’’

তার মতে, ‘‘এর জন্য ওই থানার ওসি দায়ী। হয় তিনি জেনেও ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার জন্য গোপন করেছেন অথবা তিনি থানায় কিছু খেয়ে ঘুমিয়ে কাটান। তার দায়িত্ববোধ বলে কিছু নেই।’’

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার একলাশপুর ইউনিয়নে এক মাস আগে এই মধ্যযুগীয় বর্বরতার ঘটনা ঘটে নির্যাতিতার নিজের ঘরে। দুবৃত্তরা নারীর ঘরে ঢুকে তাকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন করে৷ তিনি তাদের পা ধরে ‘বাবা’ ডেকেও রেহাই পাননি। নির্যাতকরা নির্যাতনের ঘটনা মোবাইল ফোনের ক্যামেরায়ও ধারণ করে উল্লাস প্রকাশ করে।

ওই এলাকার ‘দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ার ও বাদল, কালাম এবং আবদুর রহিমসহ তার সহযোগীরা এই বর্বরোচিত ঘটনা ঘটনায়। স্থানীয় সূত্র জানায়, এলাকার সবাই ঘটনা জানতো। এমনকি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও জানতেন। কিন্তু কেউ তা প্রকাশ করেনি।

নির্যাতিতা জীবনের ভয়ে থানায় অভিযোগ করেননি। ঘটনার একমাস পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হলে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে।

বেগমগঞ্জ থানার ওসি জানান, একমাস নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন করার মতো ঘটনা কেউ জানতে না পারলেও অবশেষে মোট দুটি মামলা হয়েছে। একটি নারী নির্যাতনের এবং আরেকটি পর্নোগ্রাফি আইনে। দুটি মামলাতেই ৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।

নির্যাতিত নারী পারিবারিক সমস্যার কারণে বাবার বাড়িতে এসেছিলেন। সেখানেই ‘দেলোয়ার বাহিনি’ এ ঘটনা ঘটায়। তবে বেগমগঞ্জ থানার ওসি বলছেন নতুন কথা। তার দাবি ঘটনার সঙ্গে নির্যাতিতার স্বামীও জড়িত, ‘‘তার স্বামীই এই ঘটনার ইন্ধনদাতা। তাদের মধ্যে খারাপ সম্পর্কের জেরে এই ঘটনা ঘটেছে।’’ দেলোয়ার বাহিনী সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘তারা স্থানীয় একটি বখাটে গ্রুপ।’’

ঘটনার একমাস পর ভাইরাল হওয়া ভিডিও দেখে পুলিশের নড়েচড়ে বসা এবং শুরুতেই ভুক্তভোগীর পরিবারকে জড়ানোর চেষ্টাকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না মানবাধিকার কর্মীরা। তারা মনে করেন, আসলে এটা অপরাধীদের সাথে পুলিশের যোগাযোগ থাকার কারণেও ঘটনাটি এতদিন চাপা থাকতে পারে। মানবাধিকার কর্মী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক শিপা হাফিজ বলেন, ‘‘২০১৫ সালে শিশু রাজন হত্যার ঘটনায়ও আগে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি৷ ফেসবুকে আসার পর তারা তৎপর হয়। তারা আগে জানলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’’

তার মতে, ‘‘পুলিশ একটি অকার্যকর এবং রাজনৈতিক বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। যাদের ক্ষমতা আছে, প্রভাব আছে তাদের পিছনে ছুটে বেড়াচ্ছে। সাধারণ মানুষের জন্য পুলিশ নয়৷ রাস্তায় ১০টা ধর্ষণ হলেও তারা ফিরে তাকাবে না। আমাদের মন্ত্রীরা, জনপ্রতিনিধিদের কেউ কি এখন পর্যন্ত বলেছেন প্রতিদিন ধর্ষণ হচ্ছে, আমরা লজ্জিত?’’

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক প্রধান সৈয়দ বজলুল করিম বলেন, ‘‘পুলিশ তার দায়িত্ব থেকে অনেকটাই সরে যাচ্ছে। তারা মানুষের জন্য কাজ না করে ক্ষমতার দিকে তাকিয়ে থাকে যার ফল এই ভয়াবহ পরিস্থিতি।’’

 

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close