আলোচিতস্বাস্থ্য

শীত করোনার ‘মহামারীকে আরো বিপজ্জনক করে তুলবে’

বার্তাবাহক ডেস্ক : উত্তর গোলার্ধের দিকে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা দেখি যে কভিড-১৯-এর সংক্রমণ এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বেড়ে চলেছে। দুটি বিষয় বাড়তি উদ্বেগও তৈরি করছে। এর একটি মৌসুমি ফ্লু, যা কভিড-১৯-এর মতো শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাল সংক্রমণ। ফ্লু শীতকালে অধিক সক্রিয় থাকে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে শরৎ-শীতে তার আগের বসন্ত-গ্রীষ্মের তুলনায় ৪০ গুণ বেশি ফ্লু কেস দেখা গেছে। ঐতিহাসিকভাবে শীতল তাপমাত্রার মাসগুলোয় নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলগুলোতে মৌসুমি ফ্লুর সংক্রমণ দশ গুণ বেশি দেখা যায়।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, কেবল ১৯১৮ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীর সময় কভিড-১৯-এর চেয়ে বেশি মৃত্যুর দেখা পেয়েছিল আমেরিকা। যদিও এ রোগে মৃত্যুর থাবা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রাদুর্ভাব ছিল বৈশ্বিক ইতিহাসের সবচেয়ে মরণঘাতী আঘাতগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্রে এ রোগের সংক্রমণ গ্রীষ্মের চেয়ে শরতের শেষে ও শীতকালে পাঁচ গুণ বেশি হয়েছিল।

এখন কভিড-১৯ মহামারীও যদি শীতের দিকে যেতে যেতে সে প্যাটার্ন অনুসরণ করে এবং সংক্রমণের বিস্ফোরণ হতে শুরু করে—তবে তার ফলাফল হচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্রই কেবল তিন লাখ অতিরিক্ত মৃত্যু দেখতে পারে। দেশটি এখন পর্যন্ত মৃত্যুর দিক থেকে দুই লাখের কোটা ছাড়িয়ে গেছে।

এটা আসলে কতটা সম্ভব? যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটার সেন্টার ফর ইনফেকশাস ডিজিজ রিসার্চ অ্যান্ড পলিসির ডিরেক্টর মাইকেল ওস্টেরহোলম বলেন, আমাদের কাছে এখনো এ ভাইরাস নিয়ে প্রমাণ নেই। সরকারের নীতি বদলাবে কিনা, তা নির্ণয় করা কঠিন। মানুষ নির্দেশনা মেনে চলবে কিনা, সে প্রশ্নও থাকছে। কখন একটি ভ্যাকসিন উপলব্ধ হবে বা তা কার্যকর হবে কিনা, তাও নিশ্চিত নয়।

তার পরও বিজ্ঞানীরা একসঙ্গে চেষ্টা করছেন—শীতে মহামারী কেমন হবে—তার একটি চিত্র তৈরি করতে। তারা এটি করছেন—ল্যাব গবেষণা ও দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকা এপিডেমিওলজিক্যাল পরিসংখ্যান থেকে। বিশেষ করে, তারা এখন নিম্ন তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা ভাইরাসের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সেটিও ভালোভাবে বুঝতে পারছেন। পাশাপাশি ইনডোরে সংক্রমণের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে তাও।

ফলাফলগুলো মোটেই আশাজাগানিয়া নয়। কম্পিউটেশনাল বায়োলজিস্ট রিচার্ড নেহের বলে, শীতল আবহাওয়ার সঙ্গে যুক্ত সব ফ্যাক্টর আমরা দেখেছি, মনে হচ্ছে তারা সম্ভবত ভাইরাসের বিস্তৃতিকে আরো বেশি ত্বরান্বিত করবে।

ভালো সংবাদ হচ্ছে—গবেষণা এটাও বলছে—এমন কিছু পদক্ষেপ আছে, যা শীতের সময় গ্রহণ করে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ভাইরাসের সংক্রমণকে সীমিত রাখতে সক্ষম হবে। কিন্তু যথেষ্ট মানুষ এ পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করবে কিনা এবং তা দ্বিতীয় ঝড়কে সামনে রেখে যথেষ্ট হবে কিনা, সে প্রশ্নের উত্তর বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে।

শীতে ভাইরাসের কী হবে?

শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসের জন্য এটা মোটেই নতুন কিছু নয় যে শীতকালে এটি আরো বেশি মরণঘাতী হয়ে উঠবে। গত ২৫০ বছরে শ্বাসতন্ত্রের সবগুলো মহামারীর ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ঝড় দেখা গেছে প্রথম ঝড়ের ছয় মাস পর। কিন্তু এর মাত্র তিনটির ক্ষেত্রে এটি দেখা গেছে শীতকালে। ১৯১৮ সালের ফ্লু ছিল সেই ব্যতিক্রমগুলোর একটি।

কভিড-১৯ কি সে রকম আরেকটি হতে যাচ্ছে। এটা বলা কঠিন। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, মাসগুলো এগোনোর সাথে সাথে বিস্তৃতির সঙ্গে আবহাওয়া-সম্পর্কিত প্যাটার্ন বোধগম্য হবে। ২০১৯ সালে শীতের শুরুতেই প্রথম এ রোগের দেখা মিলেছিল। এখন এই তিন মাসে, নাতিশীতোষ্ণ ও ক্রান্তীয় আবহাওয়ায় ভাইরাস কীভাবে আচরণ করে তা নিয়ে বিস্তারিত পরিসংখ্যানও রয়েছে।

যদিও তেমন প্যাটার্ন সামনে আসেনি। উত্তর ইতালির বিভিন্ন অংশে সংক্রমণ বিস্তৃতভাবে ছড়িয়েছে মার্চে। যখন তাপমাত্রা ছিল ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবার এটি যুক্তরাষ্ট্রে চূড়া স্পর্শ করেছে, যখন তাপমাত্রা ছিল ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে। আবার কোথাও কোথাও ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে গিয়েও এটিকে সংগঠিত হতে দেখা গেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়া হচ্ছে দক্ষিণ গোলার্ধের সেসব দেশ, যেখানে শীতের সময় ভাইরাসের উত্থান দেখা গেছে। আমেরিকা ছিল উত্তরের দেশগুলোর মধ্যে একটি, যারা গ্রীষ্মে উত্থান দেখেছে। অথচ এ রকম একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে উষ্ণ আবহাওয়ায় ভাইরাসের বিস্তৃতি হ্রাস পায়। উষ্ণ অঞ্চলের আরো কিছু দেশ যেমন ব্রাজিল ও ভারতও মারাত্মক প্রাদুর্ভাবের সাক্ষী হয়েছে।

এটা বিজ্ঞানকে আরো নিশ্চিতভাবে বুঝতে সাহায্য করবে যে মৌসুমি ফ্লু কেন মৌসুমি। পরিবেশবাদী ইঞ্জিনিয়ারিং গবেষক লিনসে মার বলেন, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস জোরালোভাবে শীতকালে আঘাত হানে তখন যখন এটি আঞ্চলিক মারীতে রূপান্তরিত হয়। যা কিনা বছরে বছরে চালিত হয়। তিনি বলেন, আপনি নতুন ভাইরাসগুলোর ওপর মৌসুমের প্রভাব দেখতে পাবেন না।

যদিও কভিড-১৯ তার প্রথম বছরে কিছুটা মৌসুমি রূপ দেখিয়েছে। কিন্তু অন্য বিষয়গুলোও এখনো বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা, মাস্ক পরা ও ভিড়সম্পন্ন ইনডোর অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলার বিষয়গুলো ভূমিকা রেখেছে। এসব অভ্যাস মানতে না পারার ব্যর্থতা ব্যাখ্যা করে, কভিড-১৯-এর সংক্রমণ হার যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে গ্রীষ্মের গরমেও কেন বেড়েছে। অবশ্য পরিবেশবিজ্ঞানী বেঞ্জামিন জাইটচিক বলেন, এর মানে এই নয় যে ভাইরাসের আবহাওয়ার সঙ্গে কোনো সংবেদনশীলতা নেই। এটি হয়তো সেই প্রভাব, যা বিধিনিষেধ ও আচরণের আড়ালে শনাক্ত করা যায় না।

কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে শীত সংক্রমণের বিস্তৃতি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। একটি গবেষণা বলছে, কভিড-১৯-এ প্রতি পাঁচজনে একজনের শাসতন্ত্রের অসুস্থতা আছে। তারা হয়তো আরো বেশি অসুস্থ হবে। পাশাপাশি ফ্লু মৌসুমের সঙ্গে মিলিত হয়ে এটি স্বাস্থ্যসেবা ও কেস সামলানোর সক্ষমতাকে বিপদে ফেলতে পারে। পাশাপাশি কভিড-১৯ ও মৌসুমি ফ্লু—কোন রোগীকে আগে সেবা দিতে হবে, তা নিয়েও ডাক্তাররা বিপদে পড়তে পারেন।

যেসব প্রস্তুতি নিতে হবে

এখন আমরা জানি যে করোনাভাইরাস কীভাবে বিস্তৃত হয়। বাতাসে ভেসে থাকা ভাইরাস কণাও যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে, তা আমরা জানি। কেউ নিঃশ্বাস নেয়ার আগ পর্যন্ত তা ঘরের ভেতর জমা হতে থাকে। কেবল দূরে দূরে অবস্থান করে সংক্রমণ এড়ানো সম্ভব নয়। ২০ কিংবা আরো বেশি ফুট দূরে থাকা ব্যক্তিদের দ্বারাও মানুষ সংক্রমিত হতে পারে। এমনকি তারা যদি মাস্ক পরেও থাকে। আক্রান্ত মানুষ ঘর ছেড়ে চলে গেলেও সেটি হতে পারে। আর্দ্রতা কম থাকা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে। হিউমিডিফায়ার এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখলেও তা পুরোপুরি যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। বরং বাইরে থেকে আরো বাতাস আসতে দিয়ে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।

 

এমআইটি টেকনোলজি থেকে সংক্ষেপে ‘অনূদিত’

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close