আলোচিতবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

সব ওয়াইম্যাক্সের সেবা বন্ধ

বার্তাবাহক ডেস্ক : দ্রুতগতির তারবিহীন ইন্টারনেট সেবা দিতে ২০০৮ সালে ব্রডব্যান্ড ওয়্যারলেস অ্যাকসেস (বিডব্লিউএ) লাইসেন্স পায় বাংলালায়ন ও কিউবি। ২০১৩ সালে এ লাইসেন্সের আওতায় সেবা চালু করে ওলো। কিন্তু উচ্চমূল্যের লাইসেন্স ও প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনসহ নানা কারণে ব্যবসায়িকভাবে সাফল্য পায়নি ওয়াইম্যাক্স প্রযুক্তির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান তিনটি। পরবর্তী সময়ে লং টার্ম ইভোল্যুশন (এলটিই) প্রযুক্তি চালুর অনুমোদন পেলেও বিনিয়োগের অভাবে তা কাজে লাগাতে পারেনি তারা। এ অবস্থায় ওয়াইম্যাক্সের গ্রাহক কমতে কমতে গত মে মাসে দুই হাজারে নেমে আসে। আর এখন এ সেবাই বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠান তিনটিকে বরাদ্দ দেয়া তরঙ্গ ফাইভজিতে ব্যবহার হবে বলে জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।

২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত নিলামের মাধ্যমে বিডব্লিউএ লাইসেন্স পায় বাংলালায়ন ও কিউবি। প্রতিষ্ঠান দুটি ২১৫ কোটি টাকা দরে এ লাইসেন্স নেয়, যেটি ছিল ওয়াইম্যাক্স লাইসেন্সের নিলামের ক্ষেত্রে বিশ্বের সর্বোচ্চ দর। এর আগে সিঙ্গাপুরে প্রতিটি ওয়াইম্যাক্স লাইসেন্সের জন্য দর উঠেছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ডলার। উচ্চমূল্যে লাইসেন্স নেয়ার পর ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে হুমকির মুখে পড়ে দুটি প্রতিষ্ঠানই।

বিশ্বব্যাপী ওয়াইম্যাক্স প্রযুক্তির উন্নয়ন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ২০১২ সালে এলটিই প্রযুক্তি চালুর অনুমোদন দিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে আবেদন করে প্রতিষ্ঠান দুটি। এর পরিপ্রেক্ষিতে পরের বছর সেপ্টেম্বরে বিটিআরসির কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র পায় কিউবি ব্র্যান্ড নামে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান অজের ওয়্যারলেস ব্রডব্যান্ড বাংলাদেশ লিমিটেড। আর একই বছরের অক্টোবরে অনাপত্তিপত্র পেয়েছে বাংলালায়ন কমিউনিকেশনস লিমিটেড। ওই বছরই বিডব্লিউএ লাইসেন্সধারী অন্য প্রতিষ্ঠান ওলোকেও এলটিই প্রযুক্তির সেবাদানের অনুমতি দেয়া হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুরুতেই বড় অংকের অর্থ ব্যয়ে লাইসেন্স নেয়ায় আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে ওয়াইম্যাক্সের লাইসেন্স নেয়া বড় দুই প্রতিষ্ঠান বাংলালায়ন ও কিউবি। পরবর্তী সময়ে গ্রাহকসংখ্যা কমে যাওয়ার পাশাপাশি অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যকার টানাপড়েনেও পড়তে হয় তাদের। গ্রাহক কমে যাওয়ায় সরকারের পাওনা অর্থও নিয়মিত পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। বিপুল অর্থ বকেয়া থাকায় একাধিকবার তাদের চিঠি দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে একাধিক উদ্যোগ নিলেও তাতে প্রত্যাশিত সফলতা আসেনি। ওয়াইফাই সেবাদানে সেলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটার সঙ্গে ২০১৬ সালে চুক্তি করে কিউবি। বছরখানেক আগে রবির সঙ্গে একই ধরনের চুক্তি করে বাংলালায়নও। গত বছরের মাঝামাঝি সমঝোতার মাধ্যমে কিউবির প্রায় ২০ হাজার গ্রাহককে বাংলালায়ন নিজেদের নেটওয়ার্কে নিয়ে আসে। এলটিই নেটওয়ার্কের জন্য বেশকিছু বিটিএস প্রস্তুত করলেও সেবাটি নিয়ে এগোতে পারেনি বাংলালায়ন। বর্তমানে সেবা বন্ধ রয়েছে তাদের।

সম্প্রতি বাংলালায়ন ছেড়ে আসা ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, প্রত্যাশিত বিনিয়োগ না থাকায় এলটিইর সম্প্রসারণ করা যায়নি। এক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিল। এখন সেবা একেবারেই বন্ধ রয়েছে। তবে নেটওয়ার্ক যন্ত্রপাতি চালু রাখার জন্য সীমিত জনবল কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটিতে।

ওয়াইম্যাক্স অপারেটরদের সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ ছিল গ্রাহকদের মধ্যেও। দুর্বল নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা, গ্রাহকসেবা কেন্দ্রের অব্যবস্থাপনাসহ আরো বেশকিছু কারণে তৈরি হয় এ অসন্তোষ। এছাড়া সেলফোন অপারেটরের থ্রিজি ও ফোরজি সেবা চালুর পর তারবিহীন দ্রুতগতির ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ায় ওয়াইম্যাক্স সংযোগ বন্ধ করছেন অনেকেই। ফলে অবশেষে বন্ধই হয়ে গেল সব ওয়াইম্যাক্স সেবা।

ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে থাকা তরঙ্গ ফেরত নিতে এরই মধ্যে জানানো হয়েছে। ফাইভজিতে এ তরঙ্গ ব্যবহার হবে। তবে কভিড পরিস্থিতির কারণে ফাইভজির প্রক্রিয়া কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে। ফাইভজির জন্য যখন প্রয়োজন হবে তখনই তাদের এ তরঙ্গ ফেরত নেয়া হবে।

বিটিআরসি সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের মাঝামাঝি থেকে ধারাবাহিকভাবে গ্রাহক হারাতে শুরু করে ওয়াইম্যাক্স প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলো। ২০১০ সালে কিউবির মোট গ্রাহকসংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ৬৬৬। ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহক ছিল ৮৬ হাজার ৮৩৬ ও ২০১২ সালে ছিল ১ লাখ ২৪ হাজার ৪৯৯। আর বাংলালায়নের গ্রাহকসংখ্যা ছিল ২০১০ সালে ২৮ হাজার ৩০৪, ২০১১ সালে ২ লাখ ৪ হাজার ৭৪ ও ২০১২ সালে ৩ লাখ ২৯ হাজার ৯০৯। ২০১৩ সালের প্রথম ছয় মাসে গ্রাহক বাড়লেও এর পর থেকেই হঠাৎ করে গ্রাহক কমতে শুরু করে ওয়াইম্যাক্স সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর। ওই বছরের জুনে প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় সংযোগসংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৪ হাজার ৮০৮। একই বছরের ডিসেম্বর শেষে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ লাখ ১৫ হাজার ৭৯৫।

ওয়াইম্যাক্স প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট গ্রাহকসংখ্যা এক লাখের নিচে নেমে আসে ২০১৬ সালের অক্টোবরে। পর্যায়ক্রমে এটি কমে গত বছরের নভেম্বরে দাঁড়ায় মাত্র পাঁচ হাজারে। আর চলতি বছরের মার্চে প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রাহকসংখ্যা দুই হাজারে নেমে আসে। সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত জুন থেকে ওয়াইম্যাক্স অপারেটরদের গ্রাহকসংখ্যা প্রকাশ করছে না নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

বিটিআরসির চেয়ারম্যান জহুরুল হক বলেন, ওয়াইম্যাক্স প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবা এখন চালু নেই। তাদের বরাদ্দ দেয়া তরঙ্গ ফাইভজিতে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে তরঙ্গ ফেরত দেয়ার বিষয়টি জানানো হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে কিছু প্রক্রিয়া রয়েছে। সেটি সম্পন্ন করে তরঙ্গ ফেরত নেয়া হবে।

প্রতিষ্ঠান তিনটিকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মোট ১১০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ। এর মধ্যে বাংলালায়ন ও কিউবির প্রত্যেককে ৩৫ মেগাহার্টজ করে তরঙ্গ বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠান দুটির তরঙ্গ রয়েছে ২৩০০ মেগাহার্টজ ও ২৫০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে। আর ওলোকে ২৬০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ৪০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ বরাদ্দ দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্পের মাধ্যমে তরঙ্গমূল্য নির্ধারণে নীতিমালা করেছিল বিটিআরসি। ওই নীতিমালা অনুযায়ী সেলফোন অপারেটর, বিডব্লিউএ ও পাবলিক সুইচড টেলিফোন নেটওয়ার্ক (পিএসটিএন) অপারেটরদের তরঙ্গমূল্য নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে টেলিযোগাযোগ খাতে প্রযুক্তিগত নানা পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেয় কমিশন।

 

 

সূত্র: বণিক বার্তা

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close