আলোচিতগাজীপুরসারাদেশ

কালীগঞ্জের সাইফুল হত্যায় পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদন, রহস্য উদঘাটন করলো পিবিআই

বার্তাবাহক ডেস্ক : কালীগঞ্জর বাসাবাসি এলাকার বালু নদী থেকে দীর্ঘ পাঁচ বছর আগে সবজি বিক্রেতা সাইফুল ইসলামের (৫০) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরবর্তীতে ময়না তদন্তের প্রতিবেদনে জানা যায় তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু কালীগঞ্জ থানা পুলিশ ওই ঘটনায় তদন্ত শেষে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। আদালত ওই প্রতিবেদন আমলে না নিয়ে স্বপ্রনোদিত হয়ে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দেন।

হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ পাঁচ বছর পর অবশেষে শনিবার (অক্টোবর ২৪) ভোর রাতে ঘটনায় জড়িত নজরুল ইসলাম (৩০) নামে এক আসামিকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে সাইফুল হত্যার রহস্য উদঘাটনে সক্ষম হয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর গাজীপুরের সদস্যরা।

শনিবার (অক্টোবর ২৪) বিকেলে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর গাজীপুর কার্যালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

নিহত সাইফুল ইসলাম কালীগঞ্জ থানার নাগরী ইউনিয়নের বাসাবাসি এলাকার রফিজ উদ্দিনের ছেলে। তিনি সবজি বিক্রেতা ছিলেন। গ্রেপ্তার নজরুল ইসলাম একই এলাকার সাইজ উদ্দিনের ছেলে। সে নৌকা চালক।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ও পিবিআই সূত্রে জানা যায়, কালীগঞ্জ থানার নাগরী ইউনিয়নের বাসাবাসি এলাকার রাজউক সাইট অফিসের পাশে ২০১৫ সালের ১৪ আগস্ট বেলা ১১ টার দিকে সাইফুল ইসলামের মরদেহ বালু নদীতে ভাসতে দেখে স্থানীরা উদ্ধার করে পুলিশকে জানায়। পরে পুলিশে মরদেহ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। এ ঘটনায় ওই দিনই নিহতের ছেলে রকিব বাদী হয়ে কালীগঞ্জ থানায় একটি অপমৃত্যূ মামলা করেন। পরবর্তীতে ময়না তদন্তের প্রতিবেদন থেকে জানা যায় সাইফুল ইসলামকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে।

এরপর ২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর কালীগঞ্জ থানার তৎকালীন উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবুল হাসেম বাদি হয়ে অজ্ঞাত আসামীদের বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন (মামলা নং- ০৮ (১২) ১৭)।

”ওই মামলাটি তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ১ জুলাই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কালীগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) বেলাল হোসেন আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। এরপর ২০১৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আদালত ওই প্রতিবেদন আমলে না নিয়ে স্বপ্রনোদিত হয়ে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দেন”।

পিবিআই জানায়, হত্যাকাণ্ডের চার বছর ২০ দিন পর আদালতের নির্দেশে ওই মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর গাজীপুর জেলা শাখায়। পরবর্তীতে মামলা তদন্তের দায়িত্ব পেয়ে পিবিআই’র গাজীপুর জেলা শাখার পুলিশ পরিদর্শক সফিকুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন এবং আসামি গ্রেপ্তারে নিহতদের ব‍্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও আত্মীয়-স্বজনের বিষয়ে তদন্ত শুরু করেন।

”হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ পাঁচ বছর ২ মাস ১০ দিন পর অবশেষে শনিবার (অক্টোবর ২৪) ভোর রাতে ঘটনায় জড়িত নজরুল ইসলাম (৩০) নামে এক আসামিকে বাসাবাসি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেন পিবিআই’র কর্মকর্তা”।

গ্রেপ্তার নজরুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে এবং জড়িত অন্য আসামিদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানায়। পরবর্তীতে তাকে আদালতে পাঠানো হলে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে এবং ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় নজরুল ইসলাম।

পিবিআই আরো জানায়, ”আসামি দায় স্বীকার করে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করতে সক্ষম হলো পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)”।

আদালতে দেওয়া নজরুল ইসলামের জবানবন্দির বরাদ দিয়ে পিবিআই জানায়, ”আসামী নজরুল ইসলাম ঘটনার দিন ২০১৫ সালের ১৩ আগস্ট ভোর অনুমান সাড়ে চারটার দিকে নিহত সাইফুলসহ গ্রামের ৪/৫ জন গ্রেপ্তার নজরুলের ট্রলার নৌকায় করে কাঁচা তরকারী বিক্রির জন্য কাঁচকুড়া বাজারে গিয়ে ভোর অনুমানীক সাড়ে ৬ টার দিকে আবার তার নৌকা যোগে বাসাবাসি গ্রামে ফিরে আসেন”।

”পরবর্তীতে ওই দিন সকাল সাড়ে ৭ টার দিকে বাসাবাসি ঘাট থেকে নিহত সাইফুল তার পরিচিত ২ জন সঙ্গীসহ বাংলা মদ নিয়ে পিকনিকের জন্য ২ হাজার টাকায় সারাদিনের জন্য নজরুলের নৌকাটি ভাড়া করেন। এরপর নৌকা ভাসিয়ে তারা সকলে খালি পেটে মদ খেতে খেতে ইছাপুর বাজারে গিয়ে রুটি, গরুর মাংস কিনে আবার বাসাবাসি ঘাটে আসলে পরিচিত আরো ২ জন তাদের সাথে নৌকায় উঠে। তখন নিহত সাইফুলসহ মোট ৬ জন নৌকাটি বালু নদীতে ভাসিয়ে তারা সকাল ৯ টার দিকে রুটি, মাংস ও মদ খেয়ে ২/৩ ঘন্টা নাচানাচি করে ও সারদী বাজারের দিকে যায়, আবার বাসাবাসি ঘাটের দিকে ফিরে আসে। সবাই মদ খেলেও সাইফুল সবচেয়ে বেশী নেশাগ্রস্ত ছিল। ফেরার সময় নৌকার ছইয়ের উপরে সাইফুলের সাথে অন্যান্যদের ঝগড়া ও কথা কাটাকাটি হয়। সাইফুল নৌকার অন্যান্যদের বিশ্রী ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে। পরে দুপুর সাড়ে ১২ থেকে ১ টায় দিকে সাইফুল ছাড়া সকলে নৌকার ভেতরে এসে সাইফুলকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করে”।

”তখন নজরুল নৌকার পানি সেচার সময় তাদের কথা শুনে এবং সেও হত্যার পরিকল্পনায় অংশ নেয়। কিছু সময় পরে সাইফুল নৌকার ভেতরে আসলে তার কোমরে থাকা গামছা নিয়ে তাদের একজন সাইফুলের গলায় প্যাঁচ দিয়ে ধরে শ্বাস রোধ করে তাকে হত্যা করে”।

নজরুল জবানবন্দিে আরো জানায়, ”সে সময় অন্যরা সাইফুলের হাত-পা ধরে রাখে। একপর্যায়ে সাইফুল শ্বাসরোধ হয়ে মারা গেলে আসামী ৫ জন সকলে মিলে ধরাধরি করে সাইফুলের লাশ বালু নদীতে ফেলে দেয়। নজরুল মৃত সাইফুলের লাশ নদীতে ফেলার সময় লাশের পায়ে ধরে তুলতে সহযোগিতা করে। পলাতক আসামীরা এ ঘটনা সম্পর্কে কাউকে কিছু বলতে নজরুলকে নিষেধ করে ও ভয়ভীতি দেখায়। তারপর সকলে বাসাবাসি ঘাটে এসে নৌকা হতে নেমে যে যার বাড়ীর দিকে চলে যায়। পরে তারা গ্রামের লোকজনকে জানায় সাইফুল নৌকায় অধিক মদ খেয়ে মাতলামি করে নাচানাচি করার সময় পানিতে পরে ডুবে গেছে। পরদিন বেলা ১১ টার দিকে সাইফুলের লাশ পানিতে ভেসে উঠে”।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই’র গাজীপুর জেলা শাখার পরিদর্শক সফিকুল ইসলাম বলেন, ”বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন। হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত অন্যান্য আসামীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে”।

 

 

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close