আলোচিতসারাদেশ

ওসি মামার প্রশ্রয়ে ভাগ্নে গড়ে তুলেন মোটরসাইকেল চোরচক্রের সিন্ডিকেট!

বার্তাবাহক ডেস্ক : মামা জসীম উদ্দিন লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ থানার ওসি। এ প্রভাবে বৃহত্তর নোয়াখালীতে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন ভাগ্নে ইয়াসিন আরাফাত সাগর। মামার প্রশ্রয়ে এক সময় জড়িয়ে পড়েন মোটরসাইকেল চোরচক্রের সিন্ডিকেটে। তিন বছরে ওসির ভাগ্নে তিন শতাধিক চোরাই মোটরসাইকেল ক্রয়-বিক্রয় করেছেন। বিষয়টি ‘ওপেন সিক্রেট’ হলেও এ নিয়ে মামা ওসির ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি এতদিন। ধীরে ধীরে বৃহত্তর নোয়াখালীতে চোরাই মোটরসাইকেল ক্রয়-বিক্রয়ে ওসির ভাগ্নে হয়ে ওঠেন একচ্ছত্র অধিপতি।

ঢাকার একাধিক চোর সিন্ডিকেটের কাছ থেকে আরাফাত মোটরসাইকেল ক্রয় করতেন। তার পর বৃহত্তর নোয়াখালীর বিভিন্ন এলাকায় এসব চোরাই মোটরসাইকেল বিক্রি করতেন। ওসির প্রভাবে দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলেও শেষ পর্যন্ত ঢাকা মহানগরের মিরপুর মডেল থানাপুলিশের হাতে পাকড়াও হয়েছেন ভাগ্নে ইয়াসিন আরাফাত সাগর। গত ১৫ অক্টোবর চাটখিল থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এদিকে ভাগ্নেকে গ্রেপ্তারের খবর মুহূর্তে ওসি জসীম উদ্দিনের কাছে পৌঁছে। ভাগ্নেকে রক্ষায় নিজেই চাটখিলে ছুটে আসেন। অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের নানা প্রলোভনও দেখান। অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশ কর্মকর্তারা ভাগ্নেকে ছাড়তে রাজি না হওয়ায় তিনি বিভিন্ন জায়গায় তদবিরও শুরু করেন। তবে ওসির ফাঁদে পা না দিয়ে ভাগ্নে আরাফাতকে ঢাকায় নিয়ে আসেন অভিযানিক দলের সদস্যরা। পুলিশের মিরপুর বিভাগের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা এসব তথ্য জানিয়েছেন।

মিরপুর থানাপুলিশ সূত্র জানায়, শুধু আরাফাত নয়, তার অন্যতম সহযোগী ঢাকায় মোটরসাইকেল চোর সিন্ডিকেটের অন্যতম দুই হোতা শাহ আলম ও মো. জসীম ওরফে সোহাগকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা দুজনে সম্পর্কে ভায়রা ভাই। গত ১৫ অক্টোবর মিরপুর থেকে জসীমকে এবং ১৭ অক্টোবর ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে শাহ আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের মিরপুর জোনের সহকারী কমিশনার এমএম মঈনুল ইসলাম বলেন, মোটরসাইকেল চোর সিন্ডিকেটের তিনজনকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে চুরির সঙ্গে জড়িত বলে তারা স্বীকার করেছেন। চোর সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

মিরপুর মডেল থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মেজবাহ উদ্দিন বলেন, চক্রের সদস্যরা জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, মোটরসাইকেল চুরির পর এগুলো নোয়াখালী অঞ্চলে পাঠিয়ে দিতেন চক্রের সদস্যরা। গ্রেপ্তার শাহ আলম ও জসীম ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। তারা দুজন পেশাদার চোর। আরাফাত তাদের কাছ থেকে চোরাই মোটরসাইকেল কিনে বিক্রয় করতেন।

পুলিশের মিরপুর বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ঢাকায় মোটরসাইকেল চুরির পর চোরচক্রের সদস্যরা আরাফাতের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। দরদাম ঠিক হওয়ার পর চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের একটি ব্রিজ থেকে সেই মোটরসাইকেল গ্রহণ করতেন আরাফাত সাগর। তার পর এসব মোটরসাইকেল বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করতেন।

একাধিক চোরচক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে আরাফাতের নাম বেরিয়ে আসে। অনেক দিন ধরেই তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছিল। গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তার ওপর নজর রাখছিল। প্রযুক্তিগত তদন্তে অবস্থান শনাক্তের পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর আরাফাতের মামা ওসি জসীম উদ্দিন তাকে ছাড়াতে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেন।

অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করে চন্দ্রগঞ্জ থানার ওসি জসীম উদ্দিন বলেন, আরাফাত মোটরসাইকেল কিনেছে বলে শুনেছি আমি। সে কোনো অপরাধ করলে এর বিচার হবে। আমি এখানে কোনো প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করিনি। এ ধরনের নজির আমার নেই। আমি পুলিশের চাকরি করি। আমি আরেক পুলিশকে এ বিষয়ে কিছু বলতে পারি না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওসির জসীম উদ্দিনের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর চাটখিল থানা এলাকায়। চন্দ্রগঞ্জ থানা লক্ষ্মীপুর জেলার অন্তর্গত হলেও ভৌগোলিকভাবে চাটখিল এবং চন্দ্রগঞ্জ থানা পাশাপাশি। এ কারণে সহজেই ওসির প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন আরাফাত সাগর।

রিকশাচালক সেজে চুরি করতেন দুই ভায়রা ভাই পুলিশ জানায়, ঢাকার বিভিন্ন বাসাবাড়ির গেটের তালা ভেঙে মোটরসাইকেল চুরি করে দুই ভায়রা ভাই শাহ আলম ও জসীম। তারা রিকশাচালক সেজে বিভিন্ন এলাকায় গভীর রাতে ঘুরে বেড়ায়। সুযোগ পেলেই তারা তালা ভেঙে মোটরসাইকেল চুরি করে সটকে পড়েন। রাতের মধ্যেই সেই মোটরসাইকেল বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলে পাঠিয়ে দেন। তাদের বিরুদ্ধে ঢাকার বিভিন্ন থানায় ১০-১২টি করে মোটরসাইকেল চুরির মামলা রয়েছে। তারা বিভিন্ন সময় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারও হয়েছেন। জসীম এর আগে তিনবার এবং শাহ আলম একবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

মিরপুর মডেল থানার এসআই খোকন মিয়া বলেন, শাহ আলম ও জসীম এর আগেও বিভিন্ন সময় মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। তার পর তারা জামিনে বেরিয়ে আবার চুরি শুরু করেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, শাহ আলম ও জসীমের মধ্যে আত্মীয়তা হওয়ার আগে থেকেই তারা চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি হওয়ার পর তারা এক সঙ্গেই চুরিতে জড়িয়ে পড়েন। তাদের শ্বশুরবাড়ি টাঙ্গাইল জেলায়।

 

সূত্র: আমাদের সময়

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close