অর্থনীতিআলোচিতসারাদেশ

বন্ধকি সম্পত্তি পুত্রের নামে হেবা: কাঠ ব্যবসায়ীর জালিয়াতি ৪ বছর পর জানল ব্যাংক

বার্তাবাহক ডেস্ক : ২০০৯ সালের ৬ জুনে নিজের দুই প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড (ইউসিবিএল) থেকে ২ কোটি টাকা ঋণ নেন চট্টগ্রামের কাঠ ব্যবসায়ী সামশুল আলম। এ ঋণের বিপরীতে নগরীর চান্দগাঁও এলাকায় ৩৪ শতক সম্পত্তি বন্ধক রাখেন তিনি। পরবর্তী সময়ে আরো দুই দফায় তাকে ৩৩ কোটি টাকা ঋণ দেয় ব্যাংক, যার বিপরীতে চান্দগাঁও এলাকায় মোট ৯৪ শতক জমি বন্ধক রাখা হয়। কিন্তু ঋণের এ অর্থ শোধ না করলেও বন্ধকি সম্পত্তির ৩৭ শতক জমি পুত্র মো. মিজানুর রহমানকে হেবা দলিলে রেজিস্ট্রি করে দেন এ ব্যবসায়ী। পিতা-পুত্র মিলে কাজটি সম্পন্ন করেন ২০১৬ সালের আগস্টে। চার বছর পর এসে জালিয়াতির এ তথ্য উদ্ঘাটন করেছে ব্যাংক।

ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, বারবার তাগাদা দিয়েও জমির বিপরীতে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের কাগজ না পেয়ে সন্দেহ জাগে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ভূমি অফিসে যোগাযোগ করে গত ২০ আগস্ট ব্যাংক জানতে পারে যে বন্ধকি জমি ছেলের নামে নামজারি করে খাজনাও পরিশোধ করেছেন এ ব্যবসায়ী। এ ঘটনায় ইউসিবিএলের পক্ষ থেকে একটি মামলা করা হয়েছে। এ মামলায় পাসপোর্ট জব্দ ও শর্তসাপেক্ষে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন সামশুল আলম। কিন্তু গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলেও আরেক অভিযুক্ত তার বড় ছেলে মিজানুর রহমান এখনো পলাতক।

ইউসিবিএলের তথ্য ও সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সামশুল আলম ২৫ বছর ধরে ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। তিনি তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মেসার্স এসএ এন্টারপ্রাইজ (হিসাব নং-০৩০২৭১০০০০০০০৫৭৭) এবং মেসার্স সামশুল স’মিলের (হিসাব নং-০৩০২৭১০০০০০০০৩৯৫) বিপরীতে ঋণ সুবিধা গ্রহণ করা শুরু করেন ২০০৯ সাল থেকে। তখন থেকে কয়েক দফায় ইউসিবিএল থেকে ঋণ গ্রহণ করে সেই ঋণের বিপরীতে সম্পত্তি বন্ধক রাখেন এ ব্যবসায়ী। এ ক্ষেত্রে তার বড় ছেলে মিজানুর রহমান ছিলেন ঋণের জিম্মাদার। পিতার বয়সজনিত কারণে মূলত ছেলে মিজানুর রহমানই ব্যবসা পরিচালনা করছেন। সামশুল আলম ব্যাংক থেকে নেয়া টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে ছেলে নিজেই এ অর্থ পরিশোধ করবেন বলে ব্যাংকের কাছে অঙ্গীকারনামাও দিয়ে রেখেছেন। অথচ ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ না করে উল্টো বন্ধক রাখা জমি ব্যাংকের অগোচরে ছেলে মিজানুর রহমানের নামে হেবা করে দেন সামশুল আলম।

ইউসিবিএলের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা যথাসময়ে পরিশোধ না করে উল্টো ঋণের টাকা আত্মসাৎ করার সব ধরনের চেষ্টাই চালিয়েছেন এ গ্রাহক। ব্যাংক যাতে পাওনা টাকা আদায়ে বন্ধক হিসেবে থাকা জমি আইনগতভাবে বিক্রি করতে না পারে, সেজন্য পিতা-পুত্র মিলে এ জালিয়াতির আশ্রয় নেন। জালিয়াতির বিষয়টি জানার পর গত ১৪ সেপ্টেম্বর সামশুল আলম ও মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে সিআর মামলা (নং-৩৪১/২০২০) দায়ের করে ইউসিবিএল কর্তৃপক্ষ।

ইউসিবিএলের স্পেশাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ডিভিশনের (এসএএমডি) প্রধান মো. শাহ আলম বলেন, ‘প্রতারণার বিষয়টি অবগত হওয়ার পর আমরা দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নিয়েছি। তারা একদিকে অনৈতিক ও বেআইনিভাবে পুত্রের নামে সম্পত্তি হেবা করে রেজিস্ট্রি করে দিয়েছে আমাদের অগোচরে। অন্যদিকে ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ থেকেও বিরত থেকেছে। শুরু থেকেই তাদের উদ্দেশ্য খারাপ ছিল। আমাদের দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার হওয়ার পর সামশুল আলম উচ্চ আদালত থেকে শর্তযুক্ত জামিন পেয়েছেন। তবে ছেলে মিজানুর রহমান এখনো পলাতক। পুলিশ বলছে তাকে এখনো গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। পিতা-পুত্রের দুজনেরই বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আছে।’

সামশুল আলম তার মালিকানাধীন মেসার্স এসএ এন্টারপ্রাইজ এবং মেসার্স সামশুল স’মিলের মাধ্যমে ব্যাংকের সঙ্গে দীর্ঘদিন লেনদেন করে আসছেন। মূলত এ লেনদেনের ধারাবাহিকতায় ব্যাংক থেকে প্রথমে ২ কোটি, পরে আরো দুই দফায় ৩৩ কোটি টাকা ঋণ নেন তিনি। এরপর সময় যত গড়ায় ব্যাংকের পাওনা পরিশোধেও গড়িমসি বাড়তে থাকে। গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এ দুই প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৫৯ কোটি ৪১ লাখ ৪৪ হাজার ২৩১ টাকা।

যোগাযোগ করা হলে মেসার্স এসএ এন্টারপ্রাইজ এবং মেসার্স সামশুল স’মিলের স্বত্বাধিকারী সামশুল আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ছেলের নামে হেবা করে দেয়ার ঘটনাটি কয়েক বছর আগে ঘটেছে। মেনে নিলাম বন্ধক রাখা সম্পত্তি নিয়ে একটা অনিয়ম হয়ে গেছে। কিন্তু ইউসিবিএল কর্তৃপক্ষ আইনগত পদক্ষেপ নেয়ার আগে বিষয়টি সমাধানের ব্যাপারে আমার সঙ্গে বসতে পারত। তারা সেটি করেনি। এর মধ্যে গ্রাহক হিসেবে আমার সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে।

 

সূত্র: বণিক বার্তা

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close