আলোচিতগাজীপুর

বিআরটি: দুর্ভোগ কমানোর এই প্রকল্পের নির্মাণ কাজের ধীরগতি বাড়িয়েছে ভোগান্তি

বার্তাবাহক ডেস্ক : চরম ভোগাচ্ছে দুর্ভোগ কমানোর প্রকল্প ‘বিআরটি’। যানজট এড়িয়ে যাত্রী পরিবহনে জয়দেবপুর থেকে রাজধানীর বিমানবন্দর পর্যন্ত বাসের জন্য সাড়ে ২০ কিলোমিটার পৃথক লেনের (বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট-বিআরটি) নির্মাণকাজ চলছে কচ্ছপ গতিতে। অব্যবস্থাপনায় পুরো পথ এখন যানজটের দখলে। গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে টঙ্গী সেতু পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার যেতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা লাগছে। সরেজমিনে এ চিত্র দেখা যায়।

জয়দেবপুর-বিমানবন্দর অংশ নির্মাণে সীমাহীন দুর্ভোগের কারণে বিআরটির বিমানবন্দর থেকে কেরানীগঞ্জ অংশ (সাউথ ফেজ) তৈরির পরিকল্পনা থেকে পিছিয়ে এসেছে সরকার। খণ্ডিত বিআরটিতে কতটা সুফল আসবে, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিআরটির একাংশের প্রকল্প পরিচালক এ এস এম ইলিয়াস শাহ বলেছেন, জয়দেবপুর চৌরাস্তা-বিমানবন্দরের মতো ব্যস্ততম সড়কে কাজ করলে ভোগান্তি হবেই। এ মাসের শেষ নাগাদ রাস্তা চওড়ার কাজ শেষ হলে দুর্ভোগ কমবে বলে তিনি আশ্বাস দেন। ২০১২ সালের প্রকল্প ‘বিআরটি’ চার বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত অগ্রগতি মাত্র ৩৪ দশমিক ৫৪ ভাগ। সময় বেড়েছে দুই দফা। ব্যয় দুই হাজার ৩৯ কোটি থেকে বেড়ে দ্বিগুণের বেশি চার হাজার ২৬৮ কোটি টাকা হয়েছে। এতে সরকার জোগাবে এক হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। বাকি দুই হাজার ৮৪২ কোটি টাকা আসবে বিদেশি ঋণ থেকে।

২০১৬ সালের ডিসেম্বরে বিআরটি চালু হওয়ার কথা থাকলেও কাজই শুরু হয় তার আরও চার মাস পর। তখন বলা হয়েছিল, ২০২০ সালে কাজ শেষ হবে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) দ্বিতীয় সংশোধনী অনুযায়ী ২০২২ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু কাজের যে অগ্রগতি, তাতে দেড় বছরে শেষ হওয়ার আশা ফিকে। প্রকল্পের ফ্লাইওভার ও ১০ লেনের টঙ্গী সেতুর ঠিকাদার জানিয়েছেন, ২০২২ সালের আগস্টের আগে কাজ শেষ হবে না।

প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেল, পুরো নির্মাণ এলাকার রাস্তা ভাঙাচোরা। গাড়ি চলে হেলেদুলে। সড়কের কোথাও বিআরটির উড়াল অংশের পিলার তৈরি শেষ, কোথাও পিলার তৈরি চলছে। সেখানে বিশাল গর্ত খুঁড়ে রাখা হয়েছে। এতে রাস্তা সরু হয়ে চলাচলের পথ কমায় গাড়ি আটকে থাকছে। যেখানে বিআরটি সড়কের মাঝবরাবর হচ্ছে, সেখানেও রাস্তার অবস্থা করুণ। খানাখন্দে গাড়ি আটকা পড়ছে।

রাজধানী ও পার্শ্ববর্তী এলাকার যানজট নিরসনে ২০০৫ সালে প্রণীত কৌশলগত পরিকল্পনায় (এসটিপি) তিনটি মেট্রোরেল ও তিনটি বিআরটি নির্মাণের সুপারিশ করা হয়। ২০১৬ সালে অনুমোদিত সংশোধিত এসটিপিতে (আরএসটিপি) পাঁচটি মেট্রোরেল ও দুটি বিআরটির সুপারিশ রয়েছে। জয়দেবপুর থেকে কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল পর্যন্ত বিআরটি-৩ নির্মাণ করতে বলা হয়। বিআরটি পদ্ধতিতে সড়কের মাঝবরাবর বাসের জন্য পৃথক লেন নির্মাণ করা হয়। যেখানে সড়ক সরু, সেখানে ফ্লাইওভারে বাসের নির্ধারিত লেন করা হয়। বাস যেন কোনো সিগন্যালে না আটকা পড়ে, সে জন্য মোড়ে ওভারপাস করা হয়। এ পদ্ধতিতে ট্রেনের মতো বিনা বাধায় বাস চলতে পারে। যাত্রী ওঠানামায় রাস্তায় থাকবে স্টেশন।

পরিকল্পনায় জয়দেবপুর থেকে চৌরাস্তা, টঙ্গী, উত্তরা, বিমানবন্দর, বনানী, মহাখালী, কাকরাইল, পল্টন, পুরান ঢাকা হয়ে কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল পর্যন্ত ৪১ কিলোমিটার বিআরটি-৩ নির্মাণের সুপারিশ থাকলেও তা হচ্ছে না। জয়দেবপুর থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা হয়ে বিমানবন্দর পর্যন্ত কাজ চলছে। এ অংশ নির্মাণে দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্ভোগের কারণে বাকি অংশ নিয়ে আগ্রহী নয় সরকার। সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, গাজীপুরে যে দুর্ভোগ হচ্ছে, তা টেনে ঢাকা শহরের অভ্যন্তরে আনতে চান না। রাজধানীতে মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হচ্ছে। বিআরটির দরকার নেই। বিশ্বব্যাংক অর্থায়নে আগ্রহী হলেও প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি চৌরাস্তা থেকে টঙ্গী আসতে দেখা গেল, চৌরাস্তা মোড়ের চারপাশজুড়ে কাজ চলছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বসেছে বিআরটির বিশাল উচ্চতার পিলার। এখানে একটি ফ্লাইওভার হবে। বিআরটির বাস বিনা বাধায় ঢাকা থেকে জয়দেবপুর শহরের দিকে যাবে এ ফ্লাইওভার ব্যবহার করে। ময়মনসিংহ মহাসড়কগামী সাধারণ গাড়িও ফ্লাইওভার ব্যবহার করতে পারবে।

চৌরাস্তা পার হতেই আমাদের গাড়ি আটকে যায় যানজটে। এখানে রাস্তার মাঝে এবং বাঁ পাশে পিলার উঠেছে। এরপর ঢাকাগামী পথে জায়গা রয়েছে সামান্যই। এই সরু পথে গাড়ি চলে থেমে থেমে। সামনে ভোগড়া মোড়েও বিআরটির উড়াল অংশের কাজ চলছে। এর জন্য খোঁড়া গর্তের ধুলায় পুরো এলাকা ধূসর। দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্য নিজামুল হক জানালেন, অবস্থা খুবই খারাপ। সারাদিনই যানজট লেগে থাকে। সায়েদাবাদ-গাজীপুর রুটের বাস ‘বলাকা’র চালক মো. রাসেল বললেন, এমন ভাঙাচোরা পথের কারণে জীবন শেষ। বাসেরও অকালমৃত্যু অনিবার্য।

ভোগড়া পেরিয়ে কিছু অংশে বিআরটি লেন রাস্তার মাঝবরাবর হবে। সেখানে রাস্তার দু’পাশে কংক্রিটের ঢালাই সড়ক হচ্ছে। একই চিত্র জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। সেখানেও রাস্তা চওড়া করার কাজ চলছে। এতে মূল রাস্তা সরু হয়ে গেছে। এরশাদনগর, চেরাগ আলী, মৎস্য অফিস এলাকায় রাস্তা চওড়া করতে দু’পাশ খুঁড়ে রাখা হয়েছে। দু’পাশ মিলিয়ে চার লেন সড়ক থাকলেও তাতে বাজার ও বারোয়ারি গাড়ির পার্কিংয়ে চলার পথ নেই। দেড় ঘণ্টায় আসি টঙ্গীতে। এখানে বাটার কারখানার সামনে থেকে তুরাগ সেতুর ওপর ১০ লেনের সেতুর কাজ চলছে। রাস্তার দু’পাশে সেতুর জন্য পিলার বানাতে বিশাল গর্ত খোঁড়া হয়েছে। এক ঘণ্টা লাগে তুরাগ পার হয়ে ঢাকায় ঢুকতে; কিন্তু নিস্তার নেই। আবদুল্লাহপুর মোড়ে এসে মিলবে সেতু ও বিআরটির উড়াল অংশের ফ্লাইওভার। প্রায় ৩০০ ফুট চওড়া রাস্তার ৮০ ভাগ চলে গেছে নির্মাণকাজে। বাকি পথে বাস, গাড়ি, রিকশা সব একসঙ্গে চলছে ধুঁকে ধুঁকে। আবদুল্লাহপুরের পর উত্তরায় ফ্লাইওভারের পিলার বসানো শেষ। চলছে ভায়াডাক্টের গার্ডার ও স্লাব বসানোর কাজ। মাঝে একটু বিরতি দিয়ে আবার বিমানবন্দর এলাকায় একই কাজ চলছে। বিমানবন্দর মোড়ে শেষ হবে বিআরটি। এখান থেকে বিশেষ আর্টিকুলেটেড বাস ঘুরে আবার গাজীপুরের দিকে যাবে।

চারটি প্যাকেজে বিআরটির কাজ চলছে। বাসের জন্য ১৭ কিলোমিটার পৃথক লেন হবে রাস্তার মাঝবরাবর। বিআরটি আইন, ২০১৬ অনুযায়ী এ লেনে প্রবেশ ও অন্য কোনো গাড়ি চালানো দণ্ডনীয় অপরাধ। লেনের কাজ বাস্তবায়ন করছে সওজ। ৮৫৫ কোটি টাকার এ কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চীনের গেজহুবা। বাকি তিন কিলোমিটার হবে ছয়টি পৃথক ফ্লাইওভারে। ফ্লাইওভার ও সেতু নির্মাণ করছে সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ)। ৯৩৫ কোটি টাকার এ কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চীনের জিয়াংশু।

সড়ক পরিবহন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সড়ক অংশে কাজের অগ্রগতি মাত্র ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ। ফ্লাইওভারের কাজ শেষ হয়েছে ৫৫ দশমিক ১২ শতাংশ। টঙ্গীতে ১৭৫ মিটার সেতুর কাজ হয়েছে ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ। চৌরাস্তা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশে উচ্চ ক্ষমতার ড্রেন নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে ৯০ শতাংশ। জয়দেবপুরে বাস ডিপো নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। স্থানীয় এলাকাকে যুক্ত করতে ৫৬ কিলোমিটার সংযোগ সড়কের রাস্তা পুরো কাজ শেষ করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি)। ৫০টি বিশেষ বাস কেনার কাজ এখনও শুরু হয়নি। এসব বাসেই ঘণ্টায় ২০ হাজার যাত্রী পরিবহনের পরিকল্পনা রয়েছে। সাড়ে ২০ কিলোমিটার পথে থাকবে ২৫টি স্টেশন। পিক আওয়ারে প্রতি মিনিটে বাস চলবে।

নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ার কারণ হিসেবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো চিঠিতে বলছে, প্রকল্প এলাকা কাজের উপযোগী ছিল না। রাস্তার নিচের ভূগর্ভস্থ পরিষেবা লাইন নকশা অনুযায়ী ছিল না। তা স্থানান্তরে বাড়তি সময় লেগেছে। রাস্তার পাশে ড্রেন না থাকায় জলাবদ্ধতায় বিলম্ব হয়েছে। করোনা মহামারি কাজ ছয় মাস পিছিয়ে দিয়েছে। এ প্রকল্পে বারবার বদল হয়েছেন পরিচালক।

প্রকল্প পরিচালক ইলিয়াস শাহ বলেছেন, এখন কাজে গতি এসেছে। আশা করছি, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হবে। আগামী মাস থেকে নির্মাণ দুর্ভোগও কমবে।

এত ভোগান্তি সয়ে পাওয়া খণ্ডিত বিআরটি কতটা উপকারে আসবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাত্রীরা বিমানবন্দরে নামার পর তারা ঢাকায় আসবেন কী করে। লোকাল বাস ধরতে হলে সেই দুর্ভোগ তো থেকেই যাবে।

তবে সড়ক পরিবহন কর্মকর্তারা বলছেন, বিমানবন্দর থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হচ্ছে, তাতে আসতে পারবেন যাত্রীরা। কিন্তু বেসরকারি অর্থায়নে নির্মিত পথে চলতে টোল দিতে হবে। বাসের জন্য নেই পৃথক লেন।

গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামছুল হক বলেছেন, যানজট এড়িয়ে গণপরিবহনে চলার ভালো উপায় হলো বিআরটি। এ প্রকল্পে এত সময় লাগছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়। ঢাকায় একের পর এক অপরিকল্পিত ফ্লাইওভার নির্মাণ করে বিআরটির জায়গা নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। খণ্ডিত বিআরটি কতটা সুফল দেবে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

 

সূত্র: সমকাল

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close