আলোচিতগাজীপুর

কালীগঞ্জে ৯৩ দিনে ধর্ষণের শিকার ৩ ছাত্রীসহ ৫ জন, আরও ৩ ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা!

বার্তাবাহক ডেস্ক : করোনা পরিস্থিতিতে কালীগঞ্জে একের পর এক বেড়েই চলছে ধর্ষণের মতো ভয়াবহ ঘটনা। একটার চেয়ে ভয়াবহ আরেকটা। একই সঙ্গে বাড়ছে নিষ্ঠুরতা। ধর্ষণের মতো অপরাধ থামানো তো যাচ্ছেইনা বরং বেড়েই চলছে। আর লাগামহীন ভাবে ধর্ষণের ঘটনা আংশকাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।

আর ধর্ষণের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওয়তায় তেমন আনা যাচ্ছেনা বলা চলে। এর কারণ, অনেকেরই আছে ক্ষমতার যোগ, তাই তারা অপ্রতিরোধ্য। পুুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠালেও আইনের ফাঁক গলিয়ে জামিনে বের হয়ে আসে অভিযুক্তরা।

কালীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় গত ৯ অক্টোবর থেকে ১০ জানুয়ারী পর্যন্ত মোট ৯৩ দিনে ৩ স্কুল ছাত্রীসহ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫ জন। এছাড়াও একই সময়ের মধ্যে ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হয়েছে আরো ৩ ছাত্রী।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছে প্রথম শ্রেণীর ১ জন, তৃতীয় শ্রেণীর ২ জন, পঞ্চম শ্রেণীর ১ জন, সপ্তম শ্রেণীর ১ জন ও অষ্টম শ্রেণীর ১ জন। এছাড়াও এক প্রবাসীর স্ত্রী (৪০) এবং এক গৃহবধূ (৫২্) ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

এসকল ঘটনায় থানায় পৃথক ৮ টি মামলা দায়ের হলেও মাত্র একটি মামলার তদন্ত কার্যক্রম শেষ করতে পেরেছে পুলিশ। বাকী ৭ টি মামলার তদন্ত কার্যক্রম এখনো চলমান রয়েছে।

থানা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

জানা যায়, সর্বশেষ অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীকে (১৫) অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগে গত ১০ জানুয়ারী (রোববার) দিবাগত রাতে ওই ছাত্রীর মা বাদী হয়ে কালীগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন {মামলা নাম্বার ৮(১)২১}।

ঘটনা সূত্রে জানা যায়,  অষ্টম শ্রেণির ওই ছাত্রী স্কুল থেকে পরীক্ষার ফল আনার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে দেখা করতে যায় তার এক বন্ধুর সঙ্গে। পরে ওই ছাত্রীকে জোরপূর্বক সিএনজি অটোরিক্সায় তুলে অপহরণ করে তার বন্ধু বদরুল আহাম্মদ খান(২৫) ও অজ্ঞাত আরো কয়েক যুবক। এরপর ওই ছাত্রীকে বিভিন্ন সময় বিভিন্নস্থানে নিয়ে জিম্মি করে জোরপূর্বক একাধিকবার ধর্ষণ করে বদরুল।

ধর্ষক বদরুল।

গত ১০ জানুয়ারী (রোববার) অপহৃত ওই ছাত্রীকে শ্রীপুর থানা এলাকা থেকে উদ্ধার এবং কালীগঞ্জ পৌর এলাকার দেওপাড়া এলাকা থেকে ধর্ষক বদরুলকে(২৫) গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

থানা ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর সকাল ১০টার দিকে আজমতপুর আদর্শ স্কুল এন্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ওই ছাত্রী স্কুল থেকে পরীক্ষার ফলাফল আনার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়। এরপর সে আর বাড়ি ফিরেনি এবং তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও বন্ধ পাওয়া যায়। এ বিষয়ে গত ২১ ডিসেম্বর ওই ছাত্রীর মা বাদী হয়ে কালীগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী (৯২৭) করে। এর ১৯ দিন পর রোববার (১০ জানুয়ারী) রাতে ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ওই ছাত্রী জানায় বদরুলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল মোবাইল ফোনে। এর পরে বিভিন্ন সময় তাদের মধ্যে কথা হতো। গত ১৯ ডিসেম্বর সে বদরুলের সঙ্গে দেখা করতে জাঙ্গালীয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে যায়। পরে বদরুলসহ তার অজ্ঞাত আরো কয়েক বন্ধু মিলে ওই ছাত্রীকে জোরপূর্বক সিএনজি অটোরিক্সা তুলে অপহরণ করে জাঙ্গালীয়া এলাকায় তার এক ভগ্নিপতির বাড়িতে নিয়ে যায়। এরপর থেকে ওই ছাত্রীকে বিভিন্ন সময় বিভিন্নস্থানে নিয়ে জিম্মি করে জোরপূর্বক একাধিকবার ধর্ষণ করে বদরুল।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কালীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শহিদুল ইসলাম মোল্লা বলেছিলেন, ”গত ১০ জানুয়ারী শ্রীপুর থানা এলাকা থেকে অপহৃত ওই ছাত্রীকে উদ্ধার এবং কালীগঞ্জ পৌর এলাকার দেওপাড়া এলাকা থেকে ধর্ষক বদরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন ১১ জানুয়ারী (সোমবার) দুপুরে ধর্ষক বদরুলকে গাজীপুর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মামলার তদন্ত কার্যক্রম ও অনান্য আসামী গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”

দুই, গত ২৯ ডিসেম্বর কালীগঞ্জের খলাপাড়া এলাকায় তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্রীকে (১০) ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগে সুজন শেখ (২৭) নামে এক লম্পটের নামে মামলা দায়ের করে ভুক্তভোগীর বাবা (মামলা নাম্বার ১৯(১২)২০)। ঘটনার পর থেকে লম্পটক সুজন শেখ পলাতক।

সুজন শেখ খলাপাড়া এলাকার আরজু শেখের ছেলে। সে পেশায় একজন অটোরিকশা চালক।

ভুক্তভোগী ওই ছাত্রী একই এলাকার। সে স্থানীয় একটি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী।

ভুক্তভোগী ওই ছাত্রীর স্বজন ও স্থানীয়রা জানায়, ভুক্তভোগী ওই ছাত্রী ২৯ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) দুপুরে গোসল শেষে বাড়ির পাশে পুকুর পাড়ে একটি বাগানে কাপড় নাড়তে যায়। সে সময় সুজন ওই ছাত্রীকে ডেকে তার কাছে নেয়। পরে জোড় পূর্বক তার মুখ চেপে ধরে বাগানে থাকা পরিত্যক্ত একটি ঘরে নিয়ে ওড়না দিয়ে মুখ বেঁধে ধর্ষণের চেষ্টার করে। এক পর্যায়ে মেয়ের ডাক-চিৎকারে তার স্বজনরা গেলে লম্পট সুজন পালিয়ে যায়। পরে ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করে প্রথমে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করা হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কালীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নেছার উদ্দিন বলেন, ”ধর্ষণের চেষ্টার ঘটনায় ভুক্তভোগী ওই ছাত্রীর বাবা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। ঘটনার পর থেকে লম্পটক সুজন শেখ পলাতক। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলছে।”

ধর্ষক জাবের হোসেন।

তিন, এর সপ্তাহ আগে ২০ ডিসেম্বর (রোববার) খলাপাড়া মিল গেইট এলাকায় সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে (১৫) মুদি দোকানে আটকে রেখে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। পরে ২৩ ডিসেম্বর ভোরে অভিযুক্ত জাবের হোসেন (২৫) নামে এক লম্পটকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

গ্রেপ্তার ধর্ষক জাবের হোসেন খলাপাড়া মিল গেইট এলাকার ফরহাদ শিকদারের ছেলে। সে এলাকায় মুদি দোকান পরিচালনা করে।

ধর্ষণের শিকার শিক্ষার্থীর বাড়ি খলাপাড়া মিল গেইট এলাকায়। সম্প্রতি তার বাবা মারা গেছে। তার মা সৌদি আরব প্রবাসী। ভুক্তভোগী খলাপাড়া এলাকার শহীদ ফকির শামসুদ্দিন শ্রমিক উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, ‘ধর্ষণের শিকার ওই শিক্ষার্থীর বাড়ীর পাশে ধর্ষক জাবেরের মুদি দোকান। গত ২০ ডিসেম্বর (রোববার) আনুমানিক রাত ৯ টার দিকে ওই শিক্ষার্থী জাবেরের মুদি দোকান পণ্য কিনতে যায়। পরে তাকে জোর পূর্বক দোকানে আটকে রেখে ধর্ষণ করে জাবের। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীর ডাক চিৎকারে আশপাশের লোকজন আসলে জাবের পালিয়ে যায়। ধর্ষণের ঘটনায় ওই শিক্ষার্থীর চাচা বাদী হয়ে ২২ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) দিবাগত রাতে কালীগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কালীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাদিকুর রহমান বলেন, ‘’ধর্ষণের ঘটনায় ওই শিক্ষার্থীর চাচা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করলে ধর্ষক জাবের হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলছে।”

লম্পট আব্দুল মান্নান।

চার, অপরদিকে ২১ ডিসেম্বর কালীগঞ্জে বক্তারপুর ইউনিয়নের খৈকড়া নিজ তাল্লুক এলাকায় পঞ্চম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীকে (১২) ধর্ষণ চেষ্টা করে তার চাচা লম্পট আব্দুল মান্নান (৩৫)। পরে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর মা বাদী হয়ে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য কাজী রিপন ও স্থানীয়রা বলেন, ‘গত ২১ ডিসেম্বর (সোমবার) বিকেলে ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থীকে তার বাড়িতে একা পেয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে লম্পট মান্নান। পরে শিক্ষার্থীর ডাক চিৎকারে আশপাশের লোকজন চলে আসলে মান্নান পালিয়ে যায়। এ বিষয়ে থানায় অভিযোগ দিলে পরদিন ২২ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) দুপুরে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মান্নান ওই শিক্ষার্থীর বাবার চাচাতো ভাই হয়’।

গ্রেপ্তার আব্দুল মান্নান কালীগঞ্জের বক্তারপুর ইউনিয়নের খৈকড়া নিজ তাল্লুক এলাকার শহীদুল্লার ছেলে।

ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থী একই বাড়ির প্রবাসীর মেয়ে। সে স্থানীয় একটি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর মা বলেন,”ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়েরের পর পুলিশ লম্পট আব্দুল মান্নানকে গ্রেপ্তার করে। এরপর পুলিশ আর কোন যোগাযোগ করেনি।”

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কালীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নজরুল ইসলামের ”মুঠোফোনে একাধিক বার কল করলেও তাকে পাওয়া যায়নি”

ধর্ষক মজিবুর রহমান।

পাঁচ, এর আগে গত ১৪ নভেম্বর (শনিবার) কালীগঞ্জের মোক্তারপুর ইউনিয়নের পোটান এলাকায় তৃতীয় শ্রেণীর এক ছাত্রীকে (১০) চটপটির দোকানে রেখে ধর্ষণ করে মজিবুর রহমান (৪৭) নামে এক লম্পট। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর বাবা বাদী ১৫ নভেম্বর কালীগঞ্জ থানায় ধর্ষণের অভিযোগে মামলা দায়ের করে {মামলা নাম্বার ১০(১১)২০}।

পরে ১৫ নভেম্বর (রোববার) দুুপুরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় মজিবুরকে তার নিজ বাড়ী থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর পরদিন ১৬ নভেম্বর ঘটনার দায় স্বীকার করে গাজীপুরের অতিরিক্ত চিপ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হামিদুল ইসলাম এর আদালতে ধর্ষণের দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় মজিবুর রহমান।

নির্যাতনের শিকার ওই শিশু পোটান সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী।

গ্রেপ্তার মজিবুর রহমান মোক্তারপুর ইউনিয়নের পোটান গ্রামের মৃত আব্দুর রশিদের ছেলে। সে জয়দেবপুর-ইটাখোলা বিশ্ব রোড সংলগ্ন কালীগঞ্জের মোক্তারপুর ইউনিয়নের পোটান এলাকায় পোটান বিলে স্বপ্ন নগর নামে একটি ফুসকা ও চটপটির দোকান পরিচালনা করে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ নভেম্বর (শনিবার) সন্ধ্যা সাড়ে ৫ টার দিকে জয়দেবপুর-ইটাখোলা বিশ্ব রোড সংলগ্ন মোক্তারপুরের পোটান বিলে স্বপ্ন নগর নামে ফুসকা ও চটপটির দোকানে ফুসকা কিনতে যায় নির্যাতনের শিকার ওই শিশু। পরবর্তীতে সে আর বাড়িতে ফিরে আসেনি। এরপর বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করে তাকে না পেয়ে মাইকে ঘোষণা দিয়ে ওই শিশু খুঁজতে থাকে তার পরিবারের সদস্যরা। পরদিন ১৫ নভেম্বর (রোববার) সকাল ৯ টার দিকে মোক্তারপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সিরাজ মিয়া নির্যাতনের শিকার ওই শিশুর বাবাকে ফোন করে জানায় তার মেয়েকে নোয়াপাড়া বাজারে পাওয়া গেছে। এরপর নোয়াপাড়া বাজার থেকে ওই শিশুকে বাড়ি নিয়ে যায় পরিবারের সদস্যরা। সে সময় নির্যাতনের শিকার ওই শিশু পরিবারের সদস্যদের জানায়, সে প্রথমে ফুসকা কিনতে হাসানের দোকানে গেলে হাসান তাকে কলা, ফুসকা ও চটপটি খাওয়ায়। হাসানের দোকানে ফুসকা বানানোর আলু ভর্তা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পরে সে প্রতিবেশী মজিবুর রহমানের স্বপ্ন নগর দোকান থেকে বাড়ির জন্য ফুসকা কিনতে যায়। সে সময় মজিবুর তার দোকানের ভেতরে তাকে আটকে রাখে এবং রাতভর জোড় পূর্বক ধর্ষণ করে। পরে সকাল ৬ টার দিকে তাকে মোটরসাইকেলে নিয়ে নোয়াপাড়া বাজারে নামিয়ে চলে যায় মজিবুর।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কালীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোয়াজ্জেম হোসেন বলেছিলেন, ”মামলার দায়ের পর গত ১৫ নভেম্বর দুুপুরে মজিবুর রহমানকে তার নিজ বাড়ী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে আদালতে পাঠানো হয়।”

আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে তিনি আরো বলেছিলেন, ”গাজীপুরের অতিরিক্ত চিপ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হামিদুল ইসলাম এর আদালতে ধর্ষণের দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে মজিবুর রহমান। পরে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।”

এসআই মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ”মামলার তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।”

ধর্ষক সফিকুল ইসলাম।

ছয়, এছাড়াও গত ৩০ অক্টোবর (শুক্রবার) রাত সাড়ে ৮ টার দিকে কালীগঞ্জের ভাটিরা এলাকায় প্রতিবেশী চাচিকে ধর্ষণ করে সফিকুল ইসলাম (৩৭) নামে এক যুবক। সফিকুল ওই নারীর ভাসুরের ছেলে। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত সফিকুল ইসলাম পলাতক ছিলো।

সফিকুল ইসলাম ভাটিরা এলাকার জুমুর উদ্দিন বেপারীর ছেলে। সে রাজমিস্ত্রীদের সহকারী হিসেবে কাজ করে।

এ ঘটনায় গত ৩১ অক্টোবর (শনিবার) রাতে ভুক্তভোগী গৃহবধূ (৫২) বাদী হয়ে কালীগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন {মামলা নাম্বার ২৮(১০)২০}।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ৩০ অক্টোবর রাতে ওই গৃহবধূর স্বামী বাড়ির বাহিরে ছিলেন। স্বামী বাড়ি ফিরতে দেরি হওয়ায় গৃহবধু ঘরে ঘুমিয়ে পড়েন। রাত আনুমানিক সাড়ে ৮ টার দিকে গৃহবধূর প্রতিবেশী ভাসুরের ছেলে সফিকুল ইসলাম তার ঘরের দরজায় কড়া নাড়ে। ওই সময় স্বামী এসেছে ভেবে দরজা খুলে দেয় গৃহবধূ। তখন সফিকুল গৃহবধূকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে। পরে গৃহবধূর মুখ বেঁধে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে সফিকুল। এরপর গৃহবধূকে উলঙ্গ অবস্থায় ফেলে সফিকুল পালিয়ে যায়। পরে মুখের বাঁধন খুলে গৃহবধূ ডাক চিৎকার করলে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিয়ে যায়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কালীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মফিজুর রহমান মল্লিক বলেন, ”মামলার তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। অভিযুক্ত সফিকুল ইসলাম উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়েছে।”

ধর্ষক ফারুক।

সাত, এর আগে কালীগঞ্জের খৈকড়া এলাকার এক প্রবাসীর স্ত্রীর (৪০) কাছ থেকে জমি কেনার টাকা নিয়ে তাকে ‘জিম্মি করে’ দীর্ঘদিন যাবৎ ধর্ষণের অভিযোগে গত ২২ অক্টোবর মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী গৃহবধূ। মামলার পর অভিযুক্ত ফারুক (৪৫) পলিয়ে যায়।

অভিযুক্ত ফারুক বক্তারপুর ইউনিয়নের খৈকড়া কোনা পাড়া এলাকার মৃত ফজর আলী শেখের ছেলে। তার বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে বলে জানায় এলাকাবাসী।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, বক্তারপুর ইউনিয়নের খৈকড়া কোনা পাড়া এলাকার এক প্রবাসীর স্ত্রীর (গৃহবধূ) কাছ থেকে ২০০৭ সালে জমি কেনার কথা বলে ৭ লাখ টাকা নেয় অভিযুক্ত ফারুক। এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে ওই গৃহবধূর ছেলেকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে গৃহবধূকে জিম্মি করে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে জোড় পূর্বক ধর্ষণ করে আসছিলো ফারুক। গত ২৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ওই গৃহবধূর ঘরে ডুকে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে ফারুক। পরবর্তীতে ২২ অক্টোবর সন্ধ্যা পৌণে ছয়টার দিকে ওই গৃহবধূ মাগরিবের নামাজ পড়ার জন্য অজু করতে গেলে তার ছেলেকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে কুপ্রস্তাব দেয় ফারুক। ওই সময় ফারুকের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় গৃহবধূ উপর ক্ষিপ্ত হয়ে তার চুলের মুঠি ধরে কাপড় খুলে জোড় পূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা করে ফারুক। ওই সময় গৃহবধূর ডাক-চিৎকারে তার ছেলে চলে আসলে তাদের দু’জনকে গলা কেটে হত্যার হুমকি দিয়ে ফারুক পালিয়ে যায়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কালীগঞ্জ থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মোজাম্মেল হক বলেন, ”মামলা দায়ের পর অভিযুক্ত ফারুক পলিয়ে যায়। বর্তমানে উচ্চ আদালতে থেকে জামিন পেয়েছে। মামলার তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।”

আট, অপরদিকে গত ৯ অক্টোবর শুক্রবার রাতে কালীগঞ্জ পৌরসভার দেওপাড়া এলাকায় প্রথম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীকে (৭) ধর্ষণের চেষ্টা করে সেভেন রিংস সিমেন্টের ট্রাক ড্রাইভার আলমগীর হোসেন (২৯) ।

পরে ১০ অক্টোবর (শনিবার) রাত আটটার দিকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

গ্রেপ্তার আলমগীর হোসেন সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের আফতাব আলীর ছেলে। সে কালীগঞ্জ পৌরসভার দেওপাড়া হানিফের বাড়িতে ভাড়া থেকে সেভেন রিংস সিমেন্টের ট্রাক চালায়। ভুক্তভোগী শিশুটি স্থানীয় একটি স্কুলের প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থী।

ভুক্তভোগী শিশুর পরিবার ও স্থানীয়রা বলেন, দেওপাড়া এলাকায় ভুক্তভোগী শিশুটি তার বাবা-মায়ের সঙ্গে একটি ভাড়া বাড়িতে থাকে। অভিযুক্ত আলমগীর শুক্রবার গভীর রাতে ওই শিশুকে জোরপূর্বক তার ঘরে নিয়ে ধর্ষনের চেষ্টা করে। পরবর্তীতে শিশুটি কান্নাকাটি শুরু করলে এক পর্যায়ে এ ঘটনা কাউকে জানালে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে শিশুটিকে ছেড়ে দেয় আলমগীর। এরপর ভুক্তভোগী শিশু তার বাবা-মায়ের কাছে ঘটনার বিষয়ে বললে তারা স্থানীয়দের কাছে অভিযোগ দিলে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে স্থানীয় একটি চক্র।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কালীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ফরিদ মিয়া বলেন, ”গত ১০ অক্টোবর রাত আটটার দিকে আলমগীরকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। মামলার তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হয়েছে।”

লাগামহীন ভাবে ধর্ষণের ঘটনা আংশকাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে স্থানীয়রা বলছেন, ”নারী-শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধ ও প্রতিকারে সরকারের আরো কার্যকর ভূমিকা পালনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।”

গাজীপুর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাহানাজ আক্তার বলেন, ”নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানো এবং সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে কালীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় উঠান বৈঠক করা হচ্ছে। সকলকে উঠান বৈঠক থেকে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সচেতনতা মূলক দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়।

শাহানাজ আক্তার আরো বলেন, ”নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সহায়তা পেতে সকলকে ন্যাশনাল হেল্পলাইন সেন্টারের টোল ফ্রি নম্বর ১০৯-এ কল করতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সকল স্বাস্থ্যসেবা, পুলিশী ও আইনী সহায়তা, মনোসামাজিক কাওন্সেলিং, আশ্রয় সেবা, ডিএনএ পরীক্ষার সুবিধা প্রদান করা হয়ে থাকে।”

 

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close