আলোচিত

এসপি হারুনের বিদায়ে গাজীপুর শহরে ফিরে এলো স্বস্থির প্রাণ

ইদ্রিস আলম, বার্তাবাহক : গাজীপুর শহরে ফিরে এলো স্বস্থির প্রাণ, নানা অন্যায় অত্যাচার ক্ষমতার জোরে গাজীপুরবাসীকে কোণঠাসা করে রেখেছিলেন এক ভয়ংকর অশোভনীয় ক্ষমতা দীর্ঘ চার বছর। দিনকে রাত আর রাতকে করেছে দিন। অভিযোগটি উঠে সদ্য বিদায়ী গাজীপুরের পুলিশ সুপার এস পি হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে। তিনি যে অবৈধ ক্ষমতা দেখিয়েছেন তা হয়তো আর কোন দিন দেখতে হবে না গাজীপুরবাসীকে। বিদায়ী চাঁদপুরের পুলিশ সুপার শামসুন্নাহারকে গাজীপুরে পদায়ন করায়। এরই মধ্যে সারাদেশ জুড়ে নতুন এই এসপির সুনাম সকলের জানা।

এস পি হারুন অর রশিদের চার বছরের রাজত্বের নানা অপকর্মের অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য জানা যায় । যা শুনলে আতকে উঠে স্বাভাবিক জীবন যাপন। এখনও এস পি হারুনের নাম শুনলে গাজীপুরবাসীর অনেকের মাঝ রাতে ঘুম ভেঙ্গে যায় আচমকায়। এমনটায় দাবী নির্যাতিত কিছু পরিবারের।

সরেজমিনে গিয়ে একাধিক এলাকাবাসী অভিযোগের সুরে জানায়, শুরুতেই নিয়মনিতীর বাহিরে চলাফেরার লাইফ স্টাইল সম্পর্কে, তিনি যখন অফিস থেকে বাহির হতেন তখন রাস্তা এমন ভাবে যানবাহন ও জনশুন্য রাখা হত এমন ভাবে কোন মন্ত্রী আসলে ও করা হয়না। দেখা যেত আচকমা সড়কজুড়ে পুলিশের তীব্র হুইসেল। পুলিশ লাঠিপেটা করে সড়কের পাশে দাঁড় করা। শহরে নতুন যারা তাদের মধ্যে অজানা আতঙ্ক বিরাজ করতে থাকে।

কোথাও বড় কিছু ঘটল না-কী ? আতঙ্কগ্রস্থ ও অভ্যস্থদের চোখের সামনে দিয়ে ৬-৭ টি গাড়ির বহর নিয়ে শা শা করে চোখের পলকে বেরিয়ে যান গাজীপুরের ক্ষমতাধর পুলিশ সুপার। পূর্ণ মন্ত্রীর চেয়ে বড় প্রটোকল নিয়ে চলাফেরা করেন এসপি হারুন অর রশীদ।

শুধু চলাফেরায় নয় তাঁর দাপট আর স্বেচ্ছাচারিতায় অসহায় ক্ষমতাসীন, বিরোধী দলের নেতা-কর্মী, সংবাদকর্মী ,আইনজীবী , সুশীল সমাজ কেউ রেহায় পাননি। ২০১৪ সালের ২৪ আগস্ট থেকে ২০১৮ সালের ২৫ আগস্ট গাজীপুরবাসী প্রত্যক্ষ করল হারুন রাজ। এটা ছিলো শুধু তার নিয়মনীতির বাহিরে চলাফেরার লাইফ স্টাইল।

অনুসন্ধানে বেড়িয়ে আসে তার বেশ কিছু দুর্নীতির প্রতিচ্ছবি।

সরকার দলীয়রাও রেহাই পায়নি ক্ষমতাধর এই এসপির হাত থেকে। সরকার দলীয় কাউন্সিলর আব্দুল্লাহ আল মামুন মণ্ডল, নূরুল ইসলাম নূরু, মহানগর ছাত্রলীগ সভাপতি মাসুদ রানা এরশাদ ও তার পাঁচ সহোদরসহ অনেক দলীয় নেতাকর্মী এসপি হারুন কর্তৃক নাজেহাল ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এমনকি গাজীপুর-২ আসনের এমপি জাহিদ আহসান রাসেলের চাচা মতিউর রহমানকেও হয়রানি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।তিনি বর্তমানে জীবিত নেই।

এসময় একাধিক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা জানান, এসপি হারুন স্থানীয় আওয়ামী লীগকে পাত্তাই দেন না। এমনকি মন্ত্রী-এমপিকেও না। ভদ্র সমাজের কেউ ভয়ে তার কাছে অভিযোগ নিয়ে যেতেন না। এসপি হারুন নিজের স্বার্থে নানা কৌশলে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে রাখেন। দলের ব্যক্তিবিশেষকে সুবিধা দিতেন, দলের অনেকের বিরুদ্ধে মামলাও দিয়েছেন। অভিযোগ আছে বিরোধপূর্ণ জমি ‘চুক্তিতে’ একপক্ষকে দখল দিয়ে মোটা অঙ্কের বাণিজ্য করেছেন।

অভিযোগ উঠে, উঠতি ব্যবসায়ীদের নানা অজুহাতে গ্রেফতার করে তাদের কাছ থেকে পাঁচ থেকে ২০ লাখ পর্যন্ত টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হতো বলেও জানান স্থানীয়রা।কিন্তু ঐ ব্যবসায়ীদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে ও পাওয়া যায়নি। হয়তো বা এসপি হারুনের ভয় এখনও তারা করে।

জানাযায়,কালিয়াকৈরের যুবলীগ নেতা রফিক হত্যার পর ডিবির উৎপাতে কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা, পল্লীবিদ্যুৎ, হরিণহাটিসহ আশপাশের এলাকা প্রায় পুরুষশূন্য হয়ে পড়ে। সেই অছিলাই১৫ দিনে প্রায় দেড়শ লোককে ডিবি আটক করে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয়। এক ব্যক্তিকে দুই থেকে তিনবার আটক করার ঘটনাও ঘটেছে। মোটকথা গাজীপুরে এক আতঙ্কের নাম ছিলো এসপি হারুনুর রশিদ।

গত ১ আগস্ট (বুধবার) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে এসপি হারুনকে বদলি ও পদায়ন করে আদেশ দেয়া হয়।ওই আদেশে এসপি হারুনকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার হিসেবে বদলি করে চাঁদপুরের পুলিশ সুপার শামসুন্নাহারকে গাজীপুরে পদায়ন করা হয়। স্বস্থি ফিরে পান গাজীপুরবাসী।

অনুসন্ধানে জানা যায়, তিনি গাজীপুরে যোগদানের পর থেকে ডিবি আতঙ্কে ও নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে এলাকাবাসী। গাজীপুর থেকে কমপক্ষে পাঁচশ ব্যক্তিকে বিভিন্ন মিথ্যা অভিযোগে আটক করে ডিবি। পরে তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের উৎকোচ নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। যারা টাকা দিতে পারেননি বা দেননি তাদের বিভিন্ন মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া হয়। এক্ষেত্রে, আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা জামায়াতকে আলাদাভাবে দেখা হয়নি।

এস পি হারুনের উত্থান গাজীপুরে আসার আগে হারুন ঢাকা মহানগর পুলিশে ছিলেন। তখন বিএনপি নেতা জয়নুল আবেদিন ফারুকের উপর হামলা করে আওয়ামী লীগে রাতারাতি হিরো বনে যান তিনি। তাঁর উত্থান সেই শুরু। আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।

এর মাঝখানে ২০১৬ সালে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের তৃতীয় দফায় গাজীপুর সদর, শ্রীপুর ও কাপাসিয়ায় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ওই বছরের ২১ এপ্রিল এসপি হারুন অর রশীদকে গাজীপুর থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর প্রত্যাহারের আদেশ তুলে নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে ওই বছরের ৩ মে গাজীপুরের পুলিশ সুপার পদে পুনর্বহাল করে। ক্ষমতার জোড়ে লভিং করে সেখানেই থেকে যান তিনি।

অনুসন্ধানে বেড়িয়ে আসে চার বছরে পুলিশ সুপার গাজীপুরে আবাসিক হোটেলে পতিতা ব্যবসা ও মাদক ব্যবসা,জুয়ার আসর বসিয়ে বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছেন। গাজীপুরে যোগদানের পরপর হারুন অর রশীদ জয়দেবপুর চৌরাস্তা, মালেকের বাড়ি, হোতাপাড়া, টঙ্গী এলাকার আবাসিক হোটেলে সাঁড়াশি অভিযান চালান। প্রথমে সমাজের সব স্তর থেকে এ পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানানো হয়। কিন্তু অল্প কয়েকদিনে সকলে হতবাক হয়ে লক্ষ করেন আগের চেয়ে প্রকাশ্য ও বেপরোয়াভাবে পতিতা ব্যবসা চলছে। পুলিশ সুপার আসলে অভিযানের মাধ্যমে হোটেলের পতিতা ব্যবসাকে শৃংখলিত মাসোহারার আওতায় আনেন। একই ধাঁচে মাদক ব্যবসার মাসোহারার নিয়ন্ত্রণ নেন তিনি।

তাঁর চার বছরের শাসনামলে গাজীপুরের বাঘের বাজার, কোনাবাড়ি , হোতাপাড়া এলাকায় বছরব্যাপি জুয়া ও অশ্লীল নৃত্যের স্থায়ী প্যান্ডেল নির্মাণ করে টাকা কামানোর মেশিন স্থাপন করেন।

এক অনুসন্ধানে বেড়িয়ে আসে গত ২০ মে দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে ‘হৃদয়ে বাংলাদেশ’ নামে একটি ফেইসবুক পেজের এক স্ট্যাটাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘সারা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ডায়নী’ বলে মন্তব্য করে একটি কমেন্ট করেন আব্দুল মালেক(৪৮) নামে এক ব্যক্তি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে কটুক্তি করার ঘটনায় মামলা করে নিরাপত্তাহীনতা ও হুমকির মুখে রয়েছেন মামলার বাদী। নিরাপত্তাহীনতা ও হুমকির বিষয়ে সোমবার পূর্ব নির্ধারিত সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করে পরে তা রহস্যজনক কারণে স্থগিত করেছেন মামলার বাদী।

মামলার বাদী নাসির উদ্দিন জর্জ শ্রীপুরে তার নিজ বাড়িতে সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করে বলেন, মামলা করার পর থেকে তাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি ও কটুক্তি ঘটনায় করা মামলা ভিন্নখাতে প্রবাহের হুমকি দিচ্ছেন আসামী পক্ষের লোকজন।

তিনি দাবী করেন, মামলার পরও অভিযুক্ত আব্দুল মালেক প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অভিযুক্ত আব্দুল মালেক এখনও তাঁর ফেইসবুক আইডি পরিচালনা করছেন। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি ও কটুক্তির ঘটনার মামলা যে কোনো মূল্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন করিয়ে নেয়ারও হুমকি দিচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, মামলাটির ন্যায় বিচারের পক্ষে কাজ করায় বিনা কারণে একজন নিরীহ কর্মকর্তাও নাজেহাল হচ্ছেন। এ অবস্থায় তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরী করতেও সাহস পাচ্ছেন না।এখানে এসপি হারুন সাব কলকাঠি নাড়াচ্ছেন। তবে সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করে তা স্থগিতের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিব্রতবোধ করেন।

এদিকে, মামলার প্রতিবেদন বিষয়ে গাজীপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি-শ্রীপুর সার্কেল) শাহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের কাছে বিব্রতবোধ করেছেন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গাজীপুর ডিবি পুলিশের উপ পরিদর্শক (এসআই) আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ঈদের ছুটি ও অন্যান্য কারণে মামলাটি তদন্ত করতে বিলম্ব হয়েছে। এখন তিনি পুরোদমে তদন্ত কাজ শুরু করবেন। এসব কিছুর উপর হাত রয়েছে এস পি হারুনের।

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এটাও পড়ুন

Close
Close