লাইফস্টাইল

‘জীবনে প্রথমবার কোনো নারীকে স্পর্শ’

লাইফস্টাইল ডেস্ক : আধুনিক ভারতের ১০ জন পুরুষের জীবন নিয়ে বিবিসি হিন্দি বিভাগের বিশেষ প্রতিবেদনমালা ‘হিজ চয়েসে’-এর অংশ নিয়ে প্রতিবেদনটি করা হয়েছে। এই ১০ জনই সমাজ বা পরিবারের হাসি-মশকরা উপেক্ষা করে নিজের মতো করে জীবন কাটাচ্ছেন। অনেকের কাছে হয়তো তাদের এই জীবনধারা অপছন্দের, কিন্তু এরা সমাজের তৈরি করা কোনো নির্দিষ্ট জীবনধারায় নিজেদের আটকিয়ে রাখতে চাননি। এদের পরিচয় অবশ্য গোপন রাখা হয়েছে।

ভারতের গুজরাট রাজ্যের ছোট একটি শহরের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার যাঁতাকলে পড়ে সময়মতো বিয়ে করা হয়ে ওঠেনি তার। চল্লিশ বছর বয়সে পৌঁছে এখন আর ১০টা মানুষের মতো জীবনকে আর ভাবছেন না তিনি।

তার নিজের বয়ানে শুনুন নেপথ্য কাহিনী:

‘সেই রাতটা এখনো মনে আছে, স্মরণীয় রাত ছিল সেটা। ২৮ বছরের জীবনে সেই প্রথমবার আমি কোনো নারীকে স্পর্শ করেছিলাম।’

‘ওই নারী আমার স্ত্রী ছিলেন না। একজন যৌনকর্মী ছিলেন। আমার অবশ্য তাতে কোনো সমস্যা ছিল না, কারণ আমার ইচ্ছাগুলো তো পূরণ করতে পারছিলাম সেই মুহূর্তে।’

‘পরের একটা গোটা সপ্তাহ ধরে আমি মনে মনে সেই মুহূর্তগুলো উপভোগ করেছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমি যেন অন্য এক জগতে বাস করছি। সত্যিই অন্য এক জগত।’

‘তখনো আমার বিয়ে হয়নি। গুজরাতের যে শহরে আমি থাকি, সেখানে পুরুষের তুলনায় মেয়েদের সংখ্যা ছিল কম। তাই আমার মতো অনেক যুবকেরই বিয়ে করার ইচ্ছেটা পূরণ হয়ে উঠত না।’

‘বিয়ে না হওয়ার যুক্তি হিসাবে আমার বাবা-মাকে নানা কথা শুনতে হতো। কেউ বলত, আপনার ছেলে যদি সরকারি চাকরি করত, তা-ও না হয় কথা ছিল। বেসরকারি সংস্থার চাকরিতে কী কোনো ভরসা আছে? তারপর আপনাদের জমিজমাও নেই- এইসব কথা বলত।’

gazipurkontho
বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। ছবি: বিবিসি

‘সেই সময়ে আমার বেতন ছিল আট হাজার টাকা। আমি ছিলাম বাড়ির বড় ছেলে। আর আমারই বিয়ে হচ্ছিল না।’

‘আমার মাথায় সবসময় একটা জিনিস ঘুরত, যেকোনো জায়গায় যদি একটা বিয়ের সম্বন্ধ পাকা হয়ে যায়, তাহলে সমাজে আমি মুখ দেখাতে পারি। এই রকম যখন আমার মানসিক অবস্থা, তখনই খুব কাছের বন্ধু নীরজের বিয়ে ঠিক হয়ে গেল।’

‘ও আমার থেকেও কম রোজগার করত, তবুও ওর বিয়ের সম্বন্ধটা পাকা হয়ে গেল কারণ ওর বাবার ২০ একর জমি ছিল।’

‘আমরা চার বন্ধু মাঝে মাঝেই মদ খেতে পাশের একটা শহরে যেতাম। সেদিনও গিয়েছিলাম। বন্ধুরা বোধ হয় আমার মন খারাপটা লক্ষ্য করেছিল। এক বন্ধু গ্লাসে বিয়ার ঢালতে ঢালতে বলেছিল, “তুই এত মন খারাপ করে আছিস কেন? চল আমার সঙ্গে। তুই যদি বিয়ে করেও নিস, তাহলেও এর মতো মজা পাবি না। দেখবি, দুনিয়াটা কত রঙিন। এনজয় কর ভাই”।’

‘আমার প্রথমে সায় ছিল না। বন্ধুরা পীড়াপীড়ি করতে লাগল। শেষমেশ ওদের সঙ্গে একটা হোটেলে গিয়েছিলাম আমি। তার আগে আমি বেশ কয়েকবার ব্লু-ফিল্ম দেখেছি, কিন্তু কোনো নারী সংস্রব আমার কাছে সেই প্রথম।’

‘তারপর থেকে ওই হোটেলে যাওয়াটা আমার অভ্যেসে পরিণত হলো। পাঁচ বছর ধরে নিয়মিত যেতাম ওই হোটেলে। নিজের মনকে শান্ত করার জন্য ওটা বেশ সহজ রাস্তা ছিল।’

‘তবে একদিন আমার বাবার কানে কথাটা পৌঁছল কোনোভাবে। আমার গায়ে তো হাত তুলতে পারেননি, কিন্তু নিজের রাগটা আমার ওপরে প্রচণ্ড চেঁচিয়ে প্রকাশ করছিলেন।’

‘তোমার লজ্জা করল না এটা করতে? নিজের মা-বোনের কথা একবারও ভাবলে না? সমাজে তারা মুখ দেখাবে কী করে সেটা ভাবলে না তুমি? এইসব বলে চিৎকার করছিলেন বাবা।’

‘মা আর দিদি কাঁদছিল। দিদির শ্বশুরবাড়িতেও এই ব্যাপারটা নাকি জানাজানি হয়ে গিয়েছিল। আমি বলার চেষ্টা করেছিলাম যে, বন্ধুরা মদ খাইয়ে আমাকে হোটেলে নিয়ে গিয়েছিল। নেশার ঘোরে বুঝতে পারিনি কী করে ফেলেছি। ক্ষমাও চেয়েছিলাম।’

‘বাবা বলেছিল, এতগুলো বছর ধরে একই ভুল করে গেলে–বারবার, এই প্রশ্নের জবাব আমার কাছে ছিল না।’

‘তিনদিন কোনো কথা বলেনি বাবা। তৃতীয় দিনে সরাসরি বলল, তোমার জন্য এক বিধবার সন্ধান পেয়েছি। তার পাঁচ বছরের একটা ছেলে আছে। কিন্তু মেয়েটি ভালো পরিবারের। মেয়ের বাবা তোমার এই সব কীর্তিকলাপ জানেন, তবুও বিয়ে দিতে রাজী হয়েছেন। তোমার বয়স বাড়ছে, এই সম্বন্ধটাতে আর না করো না।’

‘ততদিনে আমার অন্য একজনকে পছন্দ হয়ে গেছে। যে হোটেলে আমি যেতাম যৌনকর্মীদের কাছে, মেয়েটি ওই হোটেলে কাজ করত। হাউসকীপিং বিভাগে কাজ করত ও, যারা হোটেলে ঘরদোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখে। রোজগার হয়তো বেশি করত না, কিন্তু তার হাসিটা ভীষণ সুন্দর ছিল।’

‘কিন্তু আমার কীর্তিকলাপ ওর অপছন্দ ছিল। সে-ও আমাকে বিয়ে করতে রাজী হলো না। আমি ভীষণভাবে ভেঙে পড়লাম।’

‘একটা না-পাওয়ার বেদনা আমার কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। এমন একজন কাউকে না-পাওয়ার কষ্ট, যে জীবনভর আমার সঙ্গে থাকবে, আমার ভাবনাচিন্তাগুলো যার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে পারব। বিয়ে না করতে পারার কষ্টটা আমাকে শেষ করে দিচ্ছিল ওই সময়ে।’

‘আমার জন্য বাড়ির লোকজন সমাজে মুখ দেখাতে পারছিল না। তাই আমি একদিন বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলাম। প্রায় সপ্তাহ দুয়েক পরে বাবা-মায়ের কথায় আমি বাড়ি ফিরেছিলাম।’

‘তবে এসবের মধ্যেও আমার বিয়ে না হওয়া নিয়ে লোকে নানা কথা বলা বন্ধ করেনি। পরিবারের লোকজন সেসব শুনতে বাধ্য হতো। সমাজ ব্যাপারটাই আসলে এ রকম, যেসব প্রশ্ন করলে মানুষের মনে দুঃখ দেওয়া যায়, সমাজ সেসব কথা বলতেই ভালোবাসে।’

gazipurkontho
‘এখন আমি সম্পূর্ণ স্বাধীন, বিয়ের চিন্তাও নেই’। ছবি: বিবিসি

‘কিন্তু আমার কাছে ব্যাপারটা অসহ্য ঠেকছিল। তাই চিরকালের মতো আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম। নতুন শহরে চলে এলাম আমি। নতুন লোকজন, নতুন এলাকা, কিন্তু আমার স্বভাব বদলাল না। কখনো পড়শি নারী, কখনো বা পাশের কোনো শহরে চলে গিয়ে মনের ইচ্ছেগুলো মেটাতাম।’

‘কোনো সময়ে আমার বসও আমার সঙ্গে যেতেন। আমার ওপরে খুব ভরসা করতেন উনি। আজ আমার বয়স ৩৯। বিয়ে হয়নি এখনো, কিন্তু এখন আমি আর একাকিত্বে ভোগী না।’

‘বিয়ের যে স্বপ্ন আমি একটা সময়ে দেখতাম, সেগুলো সবই মিটিয়ে নিতে পারি আমি। হয়তো সেই সব স্বপ্নপূরণের সঙ্গী হিসেবে স্ত্রীকে পাইনি। জীবনটাই এরকম। এখন পরিবার সব কিছুই মেনে নিয়েছে। ছোটভাইও এক আদিবাসী মেয়ের সঙ্গে প্রেম করে বিয়ে করেছে। আমি এখন সম্পূর্ণ স্বাধীন।’

‘বিয়ের চিন্তা এখন আমার মাথায় আর আসে না, কারণ আমি এখন যে জীবনধারায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি, তাতে আর বিয়ে করা মানায় না।’

‘আমার বেতন এখন ৪০ হাজার টাকা, এছাড়াও কিছু উপরি পাওনাও হাতে আসে। কোনো কিছুরই অভাব নেই, তাই মনে কোনো গ্লানিও নেই। জানি না, যদি আমার বিয়ে হয়ে যেত, তাহলে জীবনটা কীভাবে কাটত।’

‘তবে সমাজের পরোয়া করি না আজকাল আর। আমি আমার স্বাধীন জীবন নিয়েই খুব খুশি।’

 

 

সূত্র: বিবিসি বাংলা

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এটাও পড়ুন

Close
Close