আলোচিত

প্রাণ-আরএফএল বহাল তবিয়তে

জমি দখল, রাজস্ব ফাঁকি, মানহীন ভোগ্যপণ্য বিক্রি করলেও নিশ্চুপ-নির্বিকার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো * ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জনমনে, ভোক্তারা চান গ্রহণযোগ্য তদন্তসাপেক্ষে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা

বার্তাবাহক ডেস্ক : একের পর এক অনিয়ম-দুর্র্নীতির তথ্য উদ্ঘাটিত হলেও বহাল তবিয়তে আছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। অবৈধভাবে জমি দখল, পরিবেশ দূষণ, রাজস্ব ফাঁকি ও বাজারে মানহীন পণ্য বিক্রি করলেও নিশ্চুপ সবাই। এ নিয়ে ভোক্তা পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হলেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে না নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো।

উল্টো দুর্নীতির তথ্য ধামাচাপা দিতে প্রাণ-আরএফএলের সঙ্গে আঁতাত করছে কেউ কেউ। বিগত কয়েকদিন ধরে প্রাণ-আরএফএলের দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণসহ একাধিক সংবাদ উপস্থাপন হয়েছে দৈনিক যুগান্তর ও যমুনা টিভিতে।

মানহীন ভোগ্যপণ্য : প্রাণের ভোগ্যপণ্যও ভেজালে ভরপুর। দুধ, আমের জুস থেকে শুরু করে প্রাণের প্রায় প্রতিটি পণ্যে ভেজালের প্রমাণ পেয়েছে সরকারি সংস্থাগুলো। শুধু দেশে নয়, বিদেশে রফতানি করা পণ্যেও ভেজাল পাওয়ায়, তা দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

২০১৩ সালে হলুদের গুঁড়ায় সিসার মাত্রা বেশি থাকায় প্রাণ কর্তৃপক্ষই বাজার থেকে হলুদের গুঁড়া তুলে নেয়। গুণগত মান বজায় রাখতে না পারায় ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রাণের ৮টি খাদ্যপণ্যের সিএম লাইসেন্স বাতিল করে বিএসটিআই। এগুলো হল- ম্যাংগো, অরেঞ্জ, লেমন, স্ট্রবেরি, লিচি, অ্যাপল, পাইনঅ্যাপলসহ ফ্রুট ককটেল নামের সব ফ্রুট ড্রিংকস। প্রাণের ম্যাংগো জুসেও নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে আমের পরিমাণ কম পাওয়া গেছে। শুধু জুস নয়, মানবদেহের জন্য উপকারী দুধেও ভেজাল দেয় প্রাণ।

সিরাজগঞ্জে কোম্পানির সংগ্রহ করা তরল দুধে নোংরা পানি মেশানোর প্রমাণ পেয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। দুধ পরীক্ষার সময় পাওয়া গেছে জীবন্ত মাছও। এগুলোসহ ভেজালের ফিরিস্তি তুলে ধরে যমুনা টিভির ৩৬০ ডিগ্রিতে প্রতিবেদন সম্প্রচার করা হয়, যা এখন মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে। সবার প্রশ্ন একটাই- ভোগ্যপণ্যে ভেজাল দিয়েও কীভাবে ব্যবসা করছে প্রাণ। তা সত্ত্বেও কোনো কোনো গণমাধ্যমে এসব গুরুতর অভিযোগকে বেমালুম পাশ কাটিয়ে গ্রুপের পণ্যসামগ্রীর সাফাই গাইছেন খোদ প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার।

অনেকটা একপেশে ও উদ্দেশ্যমূলক এ ধরনের সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদন পড়ে ভোক্তাদের অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তারা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত প্রতিবেদন ছাড়া আত্মপক্ষ সমর্থনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এ ধরনের বক্তব্য তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

পরিবেশ দূষণ : নাটোরের একডালায় প্রাণ এগ্রোর বর্জ্যে এলাকাবাসীর জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে, রাসায়নিক বর্জ্যরে কারণে শুধু জমির ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে না, জলাশয় ও পুকুরের মাছও মরে যাচ্ছে। বিপর্যয়ের বিষয়টি স্বীকার করে এলাকাবাসীকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার আশ্বাস দিলেও এক বছরে তা বাস্তবায়ন করেনি প্রাণ।

গত বছরের মাঝামাঝি প্রাণ এগ্রোর দূষিত বর্জ্যে মড়ক দেখা দেয় সদর উপজেলার আয়চান ও চাঁনপুর বিলে। মারা যায় মাছ। নষ্ট হয় দুটি বিলের পাকা ধান, পাটসহ বিভিন্ন ফসল। চরম ক্ষতির মুখে পড়েন দুই হাজার হেক্টর জমির কৃষক। সে সময় কারখানার ডাম্পিং সেকশন ও মার্কেট থেকে ফেরত আসা পণ্যের বিষাক্ত বর্জ্য বৃষ্টির পানির সঙ্গে ছড়িয়ে দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করে কৃষকদের ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেয়া হয় এবং সে অনুযায়ী তালিকা তৈরি করা হয়। কিন্তু এক বছর পার হলেও আশ্বাসের বাস্তবায়ন করা হয়নি।

শুধু নাটোরেই নয়, হবিগঞ্জেও প্রাণ-আরএফএল পরিবেশ দূষণ করছে। এখানে এই গ্রুপের ৫টি কারখানা আছে। আইন অনুযায়ী বর্জ্য শোধনাগারের (ইটিপি) মাধ্যমে বর্জ্য শোধন করে বাইরে ফেলার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। রাতের আঁধারে অপরিশোধিত বর্জ্য উন্মুক্ত খালে ফেলা হয়। এ কোম্পানির তরল বর্জ্যে হুমকির মুখে সুতাং নদী। পানি বিষাক্ত হয়ে পড়ায় নদীতে আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। পানির অবস্থা এত খারাপ যে, সেচের কাজেও তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গেলেই চুরি কিংবা চাঁদাবাজির মামলা দিয়ে ভুক্তভোগীদের হয়রানি করা হয়। এর ফলে শুষ্ক মৌসুমে নদী ভাগাড়ে পরিণত হয়।

অবশ্য প্রাণ-আরএফএলের কারখানার দূষিত বর্জ্যরে প্রমাণ পেয়েছে পরিবেশ অধিদফতর। গত মে মাসে অধিদফতরের সিলেট বিভাগীয় কর্মকর্তারা এলাকাবাসীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কারখানা পরিদর্শনে যান। পরীক্ষা শেষে অসঙ্গতি পাওয়ায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা গেলে ইটিপি চালু রাখে প্রাণ-আরএফএল। চলে আসার পর বন্ধ রাখা হয়। আর রাতের আঁধারে বর্জ্য খালের পানিতে ছেড়ে দেয়।

জমি দখল : অন্যের জমি জবরদখল করে শিল্প স্থাপন করছে প্রাণ-আরএফএল। নাটোরে কৃষকদের প্রায় ৫০ বিঘা জমি দখল করে কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে রেখেছে প্রাণ এগ্রো লিমিটেড। সেখানে ফসল ফলাতে পারছেন না কৃষকরা। আবার বালু ফেলে কৃষিজমি নষ্ট করা হচ্ছে। এসব বিষয়ে বারবার আবেদন করলেও কৃষকদের কথার তোয়াক্কাই করেনি প্রাণ। প্রতিকার চেয়ে ক্ষতিগ্রস্তরা জেলা প্রশাসনের দ্বারস্থ হন। কিন্তু কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। শুধু আশ্বাস দিয়ে বিদায় করা হয়।

এখানেই শেষ নয়, আরও আছে। রাজশাহীর গোদাগাড়িতে সরকারি খাসজমি দখল, জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়ে জমি কেনা, ফসলি জমিতে শিল্প স্থাপনের মতো অভিযোগ আছে। এতটাই বেপরোয়াভাবে প্রাণ জমি দখল করছে যে, পুরুষদের পাশাপাশি নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধেও হয়রানিমূলক মামলা দেয়া হচ্ছে।

গোদাগাড়ির মঠবাড়ি মৌজার ৪ নম্বর দাগের ৪৩ শতাংশ খাসজমি ৯৯ বছরের জন্য লিজ নেন পিরিজপুর গ্রামের বাসিন্দা আবদুর রশিদ। কিন্তু জমিটি এখন প্রাণের কব্জায়। এ রকম আরও খাসজমি দখলের অভিযোগ আছে। প্রাণ এগ্রোর ভেতরে ও বাইরে মোট ৫টি মৌজায় খাস খতিয়ানের প্রায় ১১৮ বিঘা জমি রয়েছে। কারখানার ভেতরেই ৮টি দাগের অস্তিত্ব মিলেছে।

এদিকে গোদাগাড়ির আমানতপুরে ৩ ফসলি জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে প্রাণ এগ্রোর কারখানা। এর গাঁ ঘেঁষেই বরেন্দ্র উন্নয়ন প্রকল্পের গভীর নলকূপ। ফসলি জমির মাঝে কারখানা গড়ে ওঠায় একদিকে কৃষকরা সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির বর্জ্য জমা হচ্ছে পুকুরে। সেই পুকুরের পানি ছড়িয়ে যায় কারখানার তিন দিকে থাকা ফসলি জমিতে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রাণের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবে রূপ পায়নি।

রাজস্ব ফাঁকি : প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজস্ব ফাঁকির তথ্য বেরিয়ে আসছে। হবিগঞ্জে রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রির দুটি ইউনিট প্রায় ৪০ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। কাঁচামাল আমদানির তথ্য গোপন করে, রফতানির অনুমোদন ছাড়া রফতানি দেখিয়ে ও অবৈধভাবে রেয়াত নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে।

গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১২ কোটি ৯৯ লাখ টাকার ও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২২৯ কোটি ২ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করে। এ দুই অর্থবছরে ২৪২ কোটি ২ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি দেখিয়ে মূসক-১৯ চালানের মাধ্যমে ৩৬ কোটি ৩০ লাখ টাকার ভ্যাট দেয়। কিন্তু সিলেট ভ্যাট কমিশনারেটের নিরীক্ষায় বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। যেমন ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকার কাঁচামাল আমদানি দেখানো হয়। কিন্তু অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের তথ্যে দেখা যায়, প্রায় ৩৭ কোটি ৪০ লাখ টাকার কাঁচামাল আমদানি হয়েছে। অর্থাৎ কোম্পানিটি প্রায় মূল্য ২১ কোটি ৬৩ লাখ টাকার কাঁচামাল আমদানি কম দেখিয়েছে। এ কাঁচামাল দিয়ে পণ্য উৎপাদনের পর তা বিক্রি করা হয়। এ হিসাবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৪ কোটি ৫ লাখ টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে।

একই কায়দায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা অবৈধ রেয়াত নেয় প্রতিষ্ঠানটি। এর বাইরে ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন পণ্য বা সেবা ক্রয়ের বিপরীতে কোনো ভ্যাট পরিশোধ করেনি। এতে প্রায় উৎসে মূসক ১৩ কোটি ৬১ লাখ টাকা। সুদসহ মোট ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ দাঁড়ায় ২৩ কোটি ৭৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৮৪ টাকা। সব মিলিয়ে ইউনিট-২ বিভিন্ন খাত সুদসহ ৩১ কোটি ২৪ লাখ টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের হেড অফিস ও কারখানায় একযোগে অভিযান চালায় ভ্যাট গোয়েন্দা টিম। প্রাথমিকভাবে ভ্যাট ফাঁকির হিসাব প্রমাণিত হওয়ায় অধিকতর তদন্তের জন্য ১১টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়। বর্তমানে অনুসন্ধান কার্যক্রম চলমান আছে।

প্রসঙ্গত, প্রাণ-আরএফএলের নিুমানের বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী এবং তাদের নানামুখী অনিয়ম, দুর্নীতি, জালিয়াতি ও জনহয়রানির বিষয়ে এখন পর্যন্ত যুগান্তর ও যমুনা টিভিতে যেসব সংবাদ প্রকাশিত ও সম্প্রচারিত হয়েছে তার সপক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষিত আছে। কিন্তু প্রতিটি ঘটনায় তাদের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায় না। তারা উৎপাদনসহ কারখানার পুরো পরিবেশ দেখানোর জন্য দিনক্ষণ ঠিক করে সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে গণমাধ্যমকে নিয়ে যেতে চান। অথচ সংবাদের প্রয়োজনে আকস্মিক পরিদর্শন করতে চাইলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয় না। এখানেই লুকিয়ে আছে সব রহস্য। সবকিছু জেনেও প্রশাসনও নিশ্চুপ থাকে।

 

 

এ সংক্রান্ত আরও পড়ুন…

কর ফাঁকির অভিযোগে প্রাণের ১১ প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলব

ট্যাক্স ফাঁকির অভিযোগে আরএফএল গ্রুপের সদর দফতরে এনবিআর’র অভিযান

প্রাণ আরএফএল’র হুমকিতে শীতলক্ষ্যা

 

সূত্র: যুগান্তর

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এটাও পড়ুন

Close
Close