অর্থনীতিআলোচিত

নির্বাচনের আগে চাপের মধ্যে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপসহ বড় ব্যবসায়ীরা

বার্তাবাহক ডেস্ক : নির্বাচনের আগে চাপের মধ্যে আছেন দেশের বড় ব্যবসায়ীরা। সরকারের সংস্থা থেকে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ মুদ্রা পাচারের। আবার কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ তার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরকারের রাজস্ব ফাঁকির। রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে কিনা, তা যাচাইয়ে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) বাংলাদেশ, প্রাণ-আরএফএল, আবুল খায়ের, বসুন্ধরার মতো বেশকিছু বৃহৎ শিল্প গ্রুপে বড় পরিসরে বিশেষ নিরীক্ষা শুরু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এসব গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে সর্বশেষ পাঁচ বছরের ব্যাংক লেনদেন ও বিক্রির তথ্যও চেয়েছে রাজস্ব আহরণকারী সংস্থাটি।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বিশেষ নিরীক্ষার জন্য প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ১১টি প্রতিষ্ঠানকে গত সপ্তাহেই চিঠি দিয়েছে এনবিআরের গোয়েন্দা অধিদপ্তরের গঠিত টিম। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আছে প্রাণ ফুডস, বঙ্গ বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল, রংপুর ফাউন্ড্রি, রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের বিভিন্ন ইউনিট, প্রাণ-আরএফএল প্লাস্টিক ও প্রাণ-আরএফএল এক্সপোর্ট লিমিটেড। রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা ছাড়াও ব্যাংক লেনদেনের তথ্য চাওয়া হয়েছে।

বিশেষ নিরীক্ষার চিঠি পেলেও এ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে চাননি প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কর্মকর্তারা। তবে ব্যবসায় স্বচ্ছতা থাকায় এনবিআর নিরীক্ষা করলেও কোম্পানির কোনো অসুবিধা হবে না বলে জানান তারা।

ব্যাংক হিসাব ও লেনদেনের তথ্য চেয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের ইস্ট ওয়েস্ট ডেভেলপমেন্ট, মেঘনা সিমেন্ট মিলস, বসুন্ধরা পেপার মিলস, বসুন্ধরা এলপি গ্যাস, বসুন্ধরা সিটি ডেভেলপমেন্ট, বসুন্ধরা স্টিল কমপ্লেক্স ও বসুন্ধরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সসহ গ্রুপের মোট ছয়টি প্রতিষ্ঠানকেও চিঠি দিয়েছে এনবিআর।

এখনো চিঠি না পেলেও এনবিআরের নিরীক্ষার জন্য কোম্পানি প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন বসুন্ধরা গ্রুপের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী পরিচালক নাসিমুল হাই। তিনি বলেন, বসুন্ধরা গ্রুপের প্রায় ৫০টির মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এনবিআর সাতটি প্রতিষ্ঠানে বিশেষ নিরীক্ষা করার উদ্যোগ নিয়েছে। সব প্রতিষ্ঠানে নিরীক্ষা করলেও আমাদের কোনো আপত্তি নেই। সব ধরনের কমপ্লায়েন্স মেনেই ব্যবসা করছে বসুন্ধরা। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন দেশীয় আইনকানুন মেনে প্রস্তুত করা হচ্ছে। নিরপেক্ষ অডিটর দিয়েও আমাদের আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করা আছে।

এদিকে হোটেল লা মেরিডিয়ানের স্বত্বাধিকারী আমিন আহম্মেদ ভুঁইয়ার বিরুদ্ধে হোটেল ব্যবসার আড়ালে বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসা ও সরকারি সম্পত্তি আত্মসাতের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আমিন আহম্মেদ ভুঁইয়াকে তলবও করেছে সংস্থাটি।

এছাড়া বিএনএস গ্রুপের কর্ণধার এমএনএইচ বুলুর বিরুদ্ধে ১০৯ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য গোপন ও প্রায় ২৫ কোটি টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ৭ অক্টোবর মামলা করেছে দুদক। এর আগে এক দফা জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে তাকে।

এমএনএইচ বুলুর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ১০৯ কোটি ১৭ লাখ ৫৬ হাজার ৯৮১ টাকা মূল্যমানের সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন এ ব্যবসায়ী। এছাড়া ২৪ কোটি ৭৮ লাখ ৬৬ হাজার ৬২২ টাকা মূল্যমানের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করে তা ভোগদখলে রেখেছেন তিনি।

দুদকে অভিযোগ না থাকলেও রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে এনবিআর বিশেষ নিরীক্ষা করছে আবুল খায়ের গ্রুপের আবুল খায়ের স্টিল, আবুল খায়ের টোব্যাকো, আবুল খায়ের কনডেন্সড মিল্ক, আবুল খায়ের বেভারেজ, শাহ ডেইরি প্রডাক্ট, স্কার্ক কোকোনাট অয়েল, একে ফুড, একে প্রপার্টিজ লিমিটেডসহ মোট ১০টি প্রতিষ্ঠানে। পাঁচ বছরের ব্যাংক হিসাব ও বিক্রির তথ্য চেয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে এরই মধ্যে চিঠিও দিয়েছে এনবিআর। চিঠি দেয়া হয়েছে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশকেও।

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ লিমিটেডের কোম্পানি সচিব মো. আজিজুর রহমান বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজস্ব বাড়াতে এনবিআর যেকোনো কোম্পানিতে নিরীক্ষা করতে পারে। কমপ্লায়েন্সের জন্য এটি ভালো। বিএটি বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে ব্যবসার পাশাপাশি আর্থিক হিসাব সংরক্ষণ করে। এনবিআর নিরীক্ষা করতে এলেই দেখতে পাবে আমরা কতটা স্বচ্ছভাবে ব্যবসা করছি।

বিশেষ এ নিরীক্ষার আওতায় আনা হচ্ছে নাসির গ্রুপের নাসির গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, বাংলাদেশ মেলামাইন লিমিটেড, নাসির এনার্জি সেভিং ল্যাম্পস, বাংলাদেশ ফুটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিজ, নাসির গ্লাসওয়্যার, নাসির টোব্যাকো, নাসির লিফ টোব্যাকো, নাসির বিড়ি ফ্যাক্টরি, বিশ্বাস প্রিন্টিংসহ মোট ১০টি প্রতিষ্ঠানকে। কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে আবদুল মোনেম গ্রুপ, শেলটেক, ডম-ইনো, রূপায়ণ রিয়েল এস্টেট, কনকর্ড, আফতাব রিয়েল এস্টেট, আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশন, জাপান গার্ডেন সিটি, এনা প্রোপার্টিজ, নাভানা, আনোয়ার গ্রুপকেও।

ভ্যাট ফাঁকি রোধ করে রাজস্ব আহরণ বাড়াতেই বিশেষ এ নিরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান এনবিআরের সদস্য (মূসক নিরীক্ষা ও গোয়েন্দা) লুত্ফর রহমান। তিনি বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোম্পানিগুলো একাধিক আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করে। এনবিআরকে এক ধরনের হিসাব দেখালেও অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করে। একই গ্রুপের কোম্পানি ভিন্ন কমিশনারেটের অধীনে থাকায় সবগুলো মিলিয়ে দেখতে পারেন না সংশ্লিষ্ট কমিশনারেটের কর্মকর্তারা। এ জন্যই গোয়েন্দা অধিদপ্তরের মাধ্যমে নিরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

অফশোর কোম্পানি খুলে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে ৮০ লাখ ডলার পাচারের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান চলছে ব্যবসায়ী মোসাদ্দেক আলীর বিরুদ্ধে। অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে আরএকে পেইন্টস ও আশালয় হাউজিংয়ের পরিচালক এসএকে একরামুজ্জামান, আরএকে পেইন্টস ও আরএকে কনজিউমার প্রডাক্টসের পরিচালক কামার উজ জামান, ঝুলপার বাংলাদেশ লিমিটেড ও রাকিন ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির পরিচালক সৈয়দ একে আনোয়ারুজ্জামান, আরএকে পাওয়ার লিমিটেডের পরিচালক মাকসুদুল করিম, আরএকে সিরামিকসের স্বতন্ত্র পরিচালক ফাহিমুল হক, স্টার সিরামিকসের পরিচালক প্রতিমা সরকার, আরএকে কনজিউমার প্রডাক্টসের দুই পরিচালক মোহাম্মদ আমির হোসেন ও এমএ মালেক, রোজা প্রপার্টিজের পরিচালক আশফাক উদ্দিন আহমেদ এবং আরএকে পেইন্টস ও আরএকে ক্যাপিটাল লিমিটেডের পরিচালক শায়লিন জামান আকবরের বিরুদ্ধেও।

অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে সর্বশেষ ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) লতিফুর রহমানকে তলব করে দুদক। কমিশনের নোটিসের পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার দুদক কার্যালয়ে হাজিরও হন তিনি।

দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান ও জিজ্ঞাসাবাদ দুদকের নিয়মিত কাজ বলে জানান সংস্থাটির মহাপরিচালক (ডিজি) মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী। তিনি বলেন, অন্য যেকোনো সময়ের মতোই এটিও দুদকের স্বাভাবিক কার্যক্রমের অংশ। যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠবে, প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ও জিজ্ঞাসাবাদের এখতিয়ার রয়েছে দুদকের। দুদকের অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করা হবে।

 

 

সূত্র: বণিক বার্তা

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close