আলোচিত

রাতে ফাঁড়িতে, সকালে সড়কে লাশ

বার্তাবাহক ডেস্ক : স্ত্রী তাসলিমা বেগম, এক বছরের সন্তানসহ বাসচালক ফারুক হোসেন (৩৫) থাকতেন নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের পুরিন্দা এলাকায়। তিনি ভুলতা থেকে গুলিস্তানে চলাচলকারী গ্লোরি পরিবহনের বাস চালাতেন। ফারুকের স্ত্রী তাসলিমা বলছেন, গত শুক্রবার বিকেলে জিনস প্যান্ট ও শার্ট পরা কিছু অস্ত্রধারী লোক বাসায় এসে ফারুকসহ চারজনকে ধরে নিয়ে যান। তাঁদের ভুলতা পুলিশ ফাঁড়িতে রাখা হয়। শনিবার রাতে স্বামীর জন্য মাছ-ভাত নিয়ে ভুলতা ফাঁড়িতে গিয়েছিলেন তাসলিমা। রোববার সকালে জানতে পারেন, মহাসড়কের পাশে স্বামীসহ চারজনের লাশ পড়ে আছে।

ভুলতার স্থানীয় পরিবহনকর্মীরা শুনেছেন, বাসচালক ফারুক ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হয়েছেন। একজন বাসমালিক ভুলতা ফাঁড়িতে গিয়ে ফারুকসহ অন্যদের দেখেও এসেছেন। ফারুকের বাবা জামালউদ্দীন বলেন, ছেলেকে পুলিশের কাছ থেকে ছাড়াতে তিনি ওই বাসমালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। বাসমালিক অবশ্য প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলতে চাননি।

তবে ভুলতা ফাঁড়ি ও জেলার পুলিশ কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

গত রোববার নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার পাঁচরুখী এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দুই পাশ থেকে চারজনের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় গুলিভর্তি দুটি দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র ও একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়। ময়নাতদন্ত শেষে চিকিৎসক জানিয়েছেন, পেছন থেকে শটগান দিয়ে গুলি করে তাঁদের হত্যা করা হয়েছে।

গত রোববার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে চারটি লাশের মধ্যে একটি মাইক্রোবাসচালক লুৎফর রহমান মোল্লার বলে শনাক্ত করেন তাঁর স্ত্রী রেশমা আক্তার। অন্য তিনজন হলেন বাসচালক ফারুক, বেকারিশ্রমিক সবুজ সরদার ও জহিরুল ইসলাম। এই তিনজনের বাড়ি পাবনার আতাইকুলা ইউনিয়নে।

বাসচালক ফারুকের স্ত্রী তাসলিমা বলেন, ফারুকের গ্রামের তিনজন—সবুজ, জহিরুল ও লিটন (সম্পর্কে ভাগনে) তাঁদের বাসায় ছিলেন। তাঁর স্বামীর সঙ্গে তাঁদের সবাইকে গত শুক্রবার তাঁর বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে রোববার সকালে মহাসড়কের পাশে লিটনের লাশ পাওয়া যায়নি। লিটনের অবস্থান কেউ জানে না। মহাসড়কের পাশ থেকে লুৎফর নামে যে মাইক্রোবাসচালকের লাশ পাওয়া যায়, তাঁকে চেনেন না তাসলিমা।

তাসলিমা বলেন, শুক্রবার বিকেলে একজন নারী তাঁর বাড়িতে ফারুকের কাছে এসেছিলেন। তখন ফারুক বলেন, ওই নারী তাঁর বন্ধুর স্ত্রী, বন্ধুকে পুলিশে ধরেছে, তাই পরামর্শ করতে এসেছেন। এর কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যার দিকে কয়েকজন লোক এসে ফারুককে ধরে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যান। এ সময় তাসলিমা চিৎকার করলে তাঁকে মারধর করা হয়।

তাসলিমা বলেন, শনিবার একজন ‘মহাজনের’ (বাসমালিক) মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, ফারুক ভুলতা ফাঁড়িতে আছেন। জানার পর রাতে বাসা থেকে ভাত-মাছ রান্না করে তিনি ফাঁড়িতে নিয়ে যান। কিন্তু প্রথমে পুলিশ তাঁকে ঢুকতে দেয়নি। অনেকক্ষণ অনুরোধ করার পর তিনি স্বামীকে খাবার দিতে পারেন, দেখাও হয়। ফারুক তখন তাঁকে বলেন, ‘ওরা খুব মারছে, আমি সব স্বীকার করছি।’ ফারুক কী স্বীকার করেছেন, জানতে চাইলে তাসলিমা বলেন, তিনি তা জানেন না।

ফারুকের বাবা জামালউদ্দীন পাবনায় ছিলেন, গতকাল সকালে নারায়ণগঞ্জে এসেছেন। তাঁর সঙ্গে নিহত সবুজের বাবা খায়রুল সরদার ও জহিরুলের শ্বশুর নজরুল ইসলামও পাবনা থেকে এসেছেন। হতদরিদ্র এ লোকগুলো গ্রাম থেকে চাঁদা তুলে ঢাকায় আসার খরচ জোগান বলে জানান।

জামালউদ্দীন বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যায় পুত্রবধূ তাসলিমা তাঁকে ফোন করে বিষয়টি জানান। এরপর গ্রামের এক ভাতিজার মাধ্যমে এক বাসমালিকের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। ওই বাসমালিক তাঁদের জানান, ফারুকদের ভুলতা ফাঁড়িতে রাখা হয়েছে। জামালউদ্দীন বলেন, ‘আম কলাম, দ্যাখেন তো, মহাজন, চালান দিবে না ছাড়বে। আমার কথা শুইনে মহাজন খোঁজ নিয়ে কলো, সব কটাক ফাঁড়িত রাখিছে পুলিশ।’ এরপর রোববার সকালে ওই বাসমালিক জামালকে জানিয়েছেন, চারজনের মধ্যে ফাঁড়িতে শুধু একজন আছেন। তিনজনকে ভোররাতে কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

ফারুকের স্ত্রী তাসলিমা বলেন, তিনিও রোববার সকালে এসে ফাঁড়িতে কাউকে না পেয়ে সেখানেই চিৎকার করে কান্নাকাটি করেছেন। স্বামীকে ফিরিয়ে দিতে বলেছেন। তখন পুলিশ তাঁকে গুলি করার হুমকি দিয়েছে।

তবে ভুলতা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম বলেন, এ রকম কোনো ঘটনা তিনি জানেন না। তাঁরা যা বলেছেন, তা সত্য নয়।

নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) আনিসুর রহমান বলেন, এ রকম কোনো ঘটনা ঘটার কথা নয়। যে বা যাঁরা এসব বলছেন, তাঁরা মিথ্যা বলছেন।

এ ঘটনায় পুলিশ হত্যা ও অস্ত্র আইনে দুটি মামলা করেছে। আড়াইহাজার থানার উপপরিদর্শক রফিকউল্লাহ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে এ মামলা করেন।

লিটন কোথায়
ওই বাড়ি থেকে ধরে নেওয়া চারজনের একজন লিটনের খোঁজ মেলেনি। লিটনের ভাই রিপন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা শুনেছেন, লিটনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একই দিনে রূপগঞ্জ থানা এলাকা থেকে হাইওয়ে পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে তা বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করেছে বলে তাঁরা শুনেছেন। তাঁদের ধারণা, সেটি লিটনের লাশ, তাঁরা শনাক্তের চেষ্টা করছেন।

হতদরিদ্র লোকগুলো
পাবনা প্রতিনিধি জানান, পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফারুক ছাড়া অন্য তিনজন—সবুজ, লিটন ও জহিরুল পাবনায় বেকারিতে কাজ করতেন। কয়েক মাস আগে তাঁরা একসঙ্গে ঢাকায় আসেন। ফারুকের বাসায় থাকতেন। বাস চালানো বা অন্য কাজ শেখার চেষ্টা করছিলেন তাঁরা। তাঁদের মধ্যে সর্বশেষ গত সপ্তাহে সবুজ ঢাকায় আসেন।

 

সূত্র: প্রথম আলো

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close