বিনোদন

বিদায়! আমাদের সময়ের আইকন আইয়ুব বাচ্চু!

বিনোদন বার্তা : সদ্য প্রয়াত আইয়ুব বাচ্চু আমাদের আশির বাংলাদেশের সম্ভাবনা, নব্বইয়ের বিকাশ এবং একুশ শতকের অধঃপতনের মূর্তিমান প্রতিচ্ছবি। একজন মিডিওকারের কঠোর পরিশ্রম এবং ক্রমাগত নিজেকে চ্যালেঞ্জ করার মাধ্যমে সুপেরিয়র শুধু নয়, একজন লিজেন্ড এবং একটি জেনারেশনের কালচারাল আইকন হয়ে ওঠার উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত আইয়ুব বাচ্চু।

প্রথম জীবনে আইয়ুব বাচ্চু আশির দশকে সেই সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যান্ড সোলসের লিড গিটারিস্ট ছিলেন। সেই সময়ে চট্টগ্রামের মিউজিক সিন ক্রিয়েটিভ এনার্জিতে টগবগ করে ফুটছিল। সোলস, রেনেসাঁ, ফিলিংসের মতো বাংলাদেশের সেরা ব্যান্ডগুলো জন্ম নিচ্ছিল আলম পরিবার এবং আরো কিছু এলাকার আতুর ঘরে।

সোলসে তপন চৌধুরী, নকীব খান বা নাসিম আলীর মতো গায়কদের মাঝে গান গাওয়ার সুযোগ আইয়ুব বাচ্চুর কমই ছিল। সুগায়ক হিসেবে নয় বরং লিড গিটারিস্ট হিসেবেই তিনি দৃষ্টি কেড়েছিলেন।

সোলসের সঙ্গে বিভিন্ন প্রোগ্রামে ইংরেজি গানের কাভার গাইতেন। প্রথম জীবনে তার গলার টোন খুব বেশি আকর্ষণীয় ছিল না। এবং গলার এক্সপ্রেশনও ছিল সীমিত।

চট্টগ্রামে ব্যান্ড গানের কনসার্টে যারা নিয়মিত যেত, তাদের একটা হাস্যরসের আলাপ ছিল, বাচ্চুইয়া আজিয়াও গান গাইতে উইঠ্যে। (বাচ্চু আজকেও গান গাইতে উঠেছে)।

কিন্তু সেই আইয়ুব বাচ্চু এক সময়ে বাংলাদেশের বাংলা ব্যান্ডের সবচেয়ে এক্সপ্রেসিভ গানগুলোর মধ্যে কিছু গেয়েছেন। তার টোনের স্বাতন্ত্র্যটিই তাকে বরং আলাদা করে তুলেছে পরে। এর একমাত্র কারণ সাধনা এবং অধ্যবসায়। তিনি সবসময়ই তার সীমানাকে ঠেলে ছড়িয়ে বাড়িয়ে জায়গা করেছেন।

যদিও মেলোডিক পপভিত্তিক ব্যান্ড সোলসের গিটারবাদক হিসেবে আইয়ুব বাচ্চু নাম করেছিলেন, কিন্তু আইয়ুব বাচ্চু মূলত ছিলেন একজন রক গিটারিস্ট। নিজেকে খুঁজে নেয়ার পথে সোলসে থাকার সময়ই তিনি দুটি অ্যালবাম প্রকাশ করেছিলেন, যে অ্যালবামে নিরীক্ষামূলক শিল্পী হিসেবে আইয়ুব বাচ্চু তার মেধা ও স্বকীয়তার ছাপ রেখেছেন। এর মধ্যে প্রথম অ্যালবাম আলোড়ন না তুললেও দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘ময়না’ তাকে জনপ্রিয়তা এনে দেয়।

আইয়ুব বাচ্চুর স্বতন্ত্র কাজের মধ্যে ক্রমাগতই রক এবং হার্ড রক মিউজিকের দিকে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা ছিল। লিড ভোকাল তপন চৌধুরী এবং নাসিম আলী খানের সোলস খুব সম্ভবত সে ঘরানায় যেতে প্রস্তুত ছিল না। তাই সোলস থেকে বেরিয়ে এসে কিছু নবীন আর্টিস্ট নিয়ে আইয়ুব বাচ্চু যখন তৈরি করেন নিজস্ব ব্যান্ড এলআরবি বা লিটল রিভার ব্যান্ড, সেই সময়ই তিনি বাংলাদেশের মূলধারার সেরা গিটারিস্ট হিসেবে নাম কুড়িয়েছেন। এলআরবি, মানে লিটল রিভার ব্যান্ড নামে অস্ট্রেলিয়ায় আর একটা ব্যান্ড আছে জানতে পেরে পরবর্তীতে এলআরবির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘লাভ রান্স ব্লাইন্ড’।

এত দিন ধরে পপ ও রকের দোলায় দুলতে থাকা বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিক এ সময়ে প্রথম হার্ড রক এবং মেটালের যুগে প্রবেশ করে মূলধারায় এলআরবি এবং অল্টারনেটিভ ঘরানায় ওয়ারফেজ, রকস্ট্রাটাসহ আরো কিছু ব্যান্ডের হাত ধরে। এ ঘরানাগুলোর সীমানা নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনায় না ঢুকে এবং এর আগে আজম খানের সঙ্গী রকেট বা নিলয় দাস বা সমসাময়িক অন্য আর্টিস্টদের সঙ্গে তুলনা না করে আমরা বলতে পারি, আইয়ুব বাচ্চু বাংলাদেশের প্রথম আর্টিস্ট, যিনি গিটারভিত্তিক রক মিউজিককে মূলধারায় নিয়ে আসেন। এবং খুব অল্প সময়ে গিটারভিত্তিক রক গানের অনেকগুলো ক্ল্যাসিকের জন্ম দেয় এলআরবি। বিটিভির একটি অনুষ্ঠানে ‘হকার’ গানের মাধ্যমে এলআরবি বাংলাদেশকে তাদের আগমনী বার্তা শোনায় এবং এর এক বছরের মধ্যেই এলআরবির ডবল অ্যালবাম বাংলাদেশের সেই সময়ে তরুণ-কিশোরদের ঝাঁকুনি দিয়ে নিয়ে আসে রক এবং ব্লুজ রক মিউজিকের নতুন একটি জগতে।

এলআরবির প্রথম ডবল অ্যালবামের আগে ব্যান্ডের ফর্মুলা ছিল বারোয়ারি। সিন্থের উপরে ভিত্তি করে কিছু ব্যালাড, দু-একটা রক, একটা রেগে, একটা ফোক, ক্ষেত্রবিশেষে একটা ব্লুজ গান নিয়ে বারোয়ারি অ্যালবাম হতো তখন। কিন্তু এর মধ্যে এলআরবির ডবল অ্যালবাম ছিল প্রথম সফল মূলধারার গিটারভিত্তিক রক অ্যালবাম। যদিও সেই অ্যালবামে অনেকগুলো ফর্মুলাভিত্তিক বারোয়ারি গান ছিল। কিন্তু অ্যালবামটিতে হকার, মাধবী, ঘুম ভাঙা শহরে’সহ বেশকিছু গান বাংলার রকের পরিণত হওয়ার পরিচয় দেয়।

এরপরের কয়েক বছরে একে একে বের হয় সুখ, তবুও, চমক, ঘুমন্ত শহরে’সহ বেশকিছু ক্ল্যাসিক অ্যালবাম, যার মাধ্যমে আইয়ুব বাচ্চু এবং তার ব্যান্ড এলআরবি পপ মিউজিকের প্রাধান্য থেকে সিন্থপপভিত্তিক বাংলা ব্যান্ড মিউজিককে রক ঘরানার দিকে টেনে নিয়ে গেছেন।

আইয়ুব বাচ্চু ও জেমসের প্রতিদ্বন্দ্বিতা তখন তুঙ্গে এবং শৈল্পিক এ দ্বন্দ্বে তারা একে অন্যকে ক্রমেই যেমন ছাপিয়ে গেছেন আবার উভয় একই সঙ্গে করেছেন ১৯৯৫ সালে স্ক্রু ড্রাইভার এবং ক্যাপসুল ৫০০এমজি।

অ্যালবাম দুটোতে রয়েছে হাসতে দেখো, আহা জীবন, নীল বেদনায়, কিছু চাইবো না বা আরো কিছু অসাধারণ গান। আইয়ুব বাচ্চুর ‘কষ্ট’ অ্যালবাম এই সময়ে বাংলাদেশের পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামেগঞ্জে, সিনেমা হলে, বিপণিবিতানে, চায়ের দোকানে দোকানে বেজেছে।

এ সময়কে বাংলা ব্যান্ড সংগীত নিজেকে সর্বোচ্চ উচ্চতায় নিয়ে যায় এবং শহুরে মধ্যবিত্তের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গে পরিণত হয়। সেই সময়ে কৈশোর বা তারুণ্যে থাকা শহুরে মধ্যবিত্ত প্রজন্মের বড় একটি অংশের মনন এবং জীবনবোধকে নির্মাণ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন আইয়ুব বাচ্চু ও জেমস এবং ব্যান্ড মিউজিকের অন্য লিজেন্ডরা, যাদের নাম আলাদা করে এখানে উল্লেখ করছি না।

বাস্তবতা হচ্ছে, সেই সময়ে গড়ে ওঠা জেনারেশনের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল থেকে বেশি প্রভাব ফেলেছিল ব্যান্ড মিউজিক, যার প্রধান দুজন আইকন হলেন আইয়ুব বাচ্চু ও জেমস।

এ সময়টি আমাদের জাতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সময়। ’৯০-এর স্বৈরাচার পতনের পরে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের যে অভিযাত্রা, সেই সময়ে সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাহিরে বাণিজ্যিক উদারীকরণের ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণী ধীরে ধীরে আর্থিক সক্ষমতা অর্জন করতে থাকে। ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র হতে থাকে একান্নবর্তী পরিবার। উঠতি মধ্যবিত্তের সঙ্গে সঙ্গে জন্ম নেয় নিওলিবারেলিজমের বলি প্রিকারিয়েট ক্লাস। চাকরির খোঁজে গ্রাম থেকে শহরে আসা পিতা-মাতার গর্ভে জন্ম নেয়া গ্রামের সঙ্গে সম্পর্কহীন প্রথম কি দ্বিতীয় প্রজন্ম, তখন তার শহুরে ইট-পাথর আর পিচঢালা রাস্তার অস্তিত্বের মধ্যে জীবনের মানে খুঁজে বেরাচ্ছে, যার ভাষা দেন আইয়ুব বাচ্চু বা হুমায়ূন আহমেদ বা হুমায়ুন ফরিদি।

বিশ্বগোলকায়ন এবং এমটিভির প্রভাবে তখন মন বহির্মুখী। স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তিতে সভ্যতার সংঘর্ষ চলছে আন্তর্জাতিক মহল এবং বাংলাদেশের অন্দরমহলেও। বাংলা ব্যান্ড মিউজিক বিশ্ব মিউজিকের সঙ্গে তুলনীয় একটি স্থানে পৌঁছায় তার মান ও প্রভাবে। নব্য মধ্যবিত্তের মননে এবং উঠতি তরুণদের মানস নির্মাণে এ সময়ে বাংলা ব্যান্ড এবং তার প্রধান একজন আইকন আইয়ুব বাচ্চু কী গভীর ভূমিকা রেখেছেন, তা তার মৃত্যুতে ভক্তদের সীমাহীন শোক প্রকাশে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।

একজন তরুণের তার জীবনে যত ধরনের অনুভূতি আছে, তার প্রায় সব কিছু প্রকাশের জন্যই আইয়ুব বাচ্চুর আশ্রয় নিতে পারেন।

প্রেমে পড়লে ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’।

প্রেমে ব্যর্থ হলে আছে ‘সেই তুমি’।

একটু জীবনবোধে অপূর্ণতা অনুভব করলে ‘গতকাল রাতে’।

জীবনমুখী গান চাইলে— হকার, মাধবী।

মামা-চাচার কারণে চাকরি খুঁজে না পেলে আছে ‘চাঁদমামা’।

সেই সময়ের জীবনযাত্রার যত ধরনের অনুভব আছে, তার সব কিছুকেই বাচ্চুর গান কম-বেশি ধারণ করেছে।

জীবিকার সন্ধানে গ্রাম থেকে শহরে আসা তরুণের অনুভব—

ইটপাথরের সত্যগুলো গোপন রেখে

কল্পনাতে মনগড়া এক শহর এঁকে,

মাছে ভাতে তার ছেলেটা এখন ভালোই আছে

বাড়ি ফিরে বন্ধুরে তুই মাকে বলিস।

যদিও প্রতিটি অ্যালবামেই ফর্মুলা পূর্ণ করা সেই তুমি অথবা ফেরারি মনের মতো ব্যালাড গান জনপ্রিয়তা পেয়েছে, কিন্তু অনেকের মতেই আইয়ুব বাচ্চুর সেরা গান তার হার্ড রক গানগুলো চাঁদমামা, পাগল, গতকাল রাতে, ঘুমন্ত শহরে, মাধবী, ঘুম ভাঙা শহরে ইত্যাদি।

প্রতিটি শিল্পীর জীবনে উত্থান-পতন থাকে। আইয়ুব বাচ্চু কোন সময়ে তার শিখরে পৌঁছেছেন, তা আলাদা করে বলা মুশকিল; কিন্তু আশি ও নব্বইয়ের মাঝামাঝি সময়ে যে জেনারেশনের মেধা ও মননে তিনি জেমস, আজম খান বা ওয়ারফেজ বাংলা রক মিউজিকের তাল ঢুকিয়ে দিয়েছেন, সেই তরুণ প্রতারিত অনুভব করেছে যখন আইয়ুব বাচ্চু সিনেমার জন্য গেয়েছেন ‘আম্মাজান, আম্মাজান’।

একই সঙ্গে একবিংশ শতকের প্রথম দশকে তিনি যখন ডিসকো বা ড্যান্স বিটের সঙ্গে গেয়েছেন উড়াল দেব আকাশে, নদীর বুকে চাঁদ অথবা বারো মাস, তখনো তার রক ভক্তরা অনুভব করেছেন তাদের প্রিয় আইয়ুব বাচ্চু পালটে যাচ্ছে।

ফলে নব্বইয়ের প্রজন্মের সঙ্গে আইয়ুব বাচ্চুর ধীরে ধীরে একটি দূরত্ব তৈরি হয়। খুব কম মিউজিশিয়ানই বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভাব, ভঙ্গি, মেজাজ ধরে রেখে বুড়ো হতে পারেন। বলার সুযোগ আছে, ভক্তদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইয়ুব বাচ্চুও ঠিক মতো বুড়ো হতে পারেননি। মার্কেট তাকে হতে দেয়নি। কারণ সংগীতের বড় শ্রোতা ও ক্রেতা মূলত তরুণ। একজন পঞ্চাশোর্ধ্ব প্রৌঢ় রকগুরুকে যখন একজন অষ্টাদশী তরুণীর অনুভূতি নিয়ে গান লিখতে হয়, তখন তার প্রথম জীবনের ভক্তদের জীবন এবং বোধ পাল্টে গেছে। তাই বাংলাদেশে আইয়ুব বাচ্চু শুধু নয় বিশ্ব মিউজিকেও আশির দশকের তেমন কোনো হেয়ার রকার পাওয়া যায় না, যারা পরবর্তীতে নিজেকে আবার আবিষ্কার করতে পেরেছেন। সবাই গতে বাধা পড়ে গেছে।

কিছু কিছু সং রাইটার পেরেছেন, যাদের মধ্যে আছেন বব ডিলান বা লিওনারড কহেন বা সুমন চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু তারাও অনেক ভাঙনের মধ্য দিয়ে গেছেন। ক্রনিকলসে বব ডিলান লিখেছিলেন, আশির দশকে তিনি যখন জনপ্রিয়তা হারাচ্ছেন এবং নিজেকে খুঁজে পাচ্ছেন না, তখন একবার তিনি তার প্রডিউসারকে বলেছেন, ম্যাডোনার লাইক এ ভারজিনের মতো গান যদি তিনি লিখতে পারতেন, তাহলে ভালো হতো কিন্তু তিনি পারছেন না।

প্রকৃতপক্ষে সং রাইটার বা কবিতা থেকে শিল্পী হওয়া সংগীতজ্ঞরা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বুড়ো হতে পারেন। আইয়ুব বাচ্চু সেই অর্থে কবি ছিলেন না। কিছু গানের লিরিকস তিনি লিখেছেন বটে, কিন্তু মূলত তিনি কবিদের লিরিকস নিয়ে গান করতেন। তাকে ৫০ বছর বয়সে এসেও ২০ বছরের প্রেমে ব্যর্থ তরুণের জন্য গান লিখতে হয়েছে।

তাই আইয়ুব বাচ্চু হূদয় খানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে পারেননি। কারণ এ তরুণদের ভাষা, বোধ এবং উপলব্ধি আশি বা নব্বইয়ের তরুণ থেকে ভিন্ন, যাদের সঙ্গে তিনি সংযোগ ঘটাতে পারেননি। তাই আইয়ুব বাচ্চু ধীরে ধীরে নিজেকে হারিয়েছেন।

কিন্তু দিনের শেষে সব শিল্পীকে বাসা ভাড়ার বিল দিতে হয়, সংসারের খরচ মেটাতে হয় বা ব্যাংকের মাসিক কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। সে হতে পারে রক গড, সে হতে পারে খ্যাপ আর্টিস্ট। তাই একজন মধ্যবয়সী রকগুরুর শৈল্পিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো ধরনের জাজমেন্টে যাওয়া আমাদের ঠিক হবে না। কারণ বাজার এমন একটি জিনিস, এ বাজারের সাধ-আহল্লাদ মেটাতে গিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বা হুমায়ুন ফরিদিও পেরেছেন কিনা, তার উত্তর প্রশ্নবিদ্ধ।

কিন্তু যে কারণেই হোক। আইয়ুব বাচ্চুও ঠিক একটা পয়েন্টে আশি এবং নব্বইয়ের প্রজন্মের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছিলেন। এবং সেই তরুণরাও ইট-পাথরের দেয়ালে জীবন সংসার, সাধনার চাপে পিষ্ট হয়ে তাদের কৈশোর এবং তারুণ্যের উচ্ছ্বাসকে হারিয়ে ফেলেছিল। তাই এ হারিয়ে যাওয়াটা পারস্পরিক।

কিন্তু এই প্রজন্ম কখনো ভোলেনি তার প্রেমে পড়া, স্বপ্ন দেখা, ক্ষোভ, ক্রোধ, দ্রোহ, আতলামি, ছ্যাঁক খাওয়া, চাকরি পাওয়া, শহুরে জীবনের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা, ড্রাগস অ্যাডিকশন, বাসের হ্যান্ডেল ঝুলে ঝুলে যাতায়াত, মা-বাবার সঙ্গে জেনারেশন গ্যাপ— সব কিছুকে আইয়ুব বাচ্চু ধারণ করেছেন তার গানে।

আশির দশকে বিশ্ব সংস্কৃতি থেকে নিয়ে, কলকাতার রাবীন্দ্রিক প্রভাব উপেক্ষা করে, বাংলাদেশের নিজের মাটি, নিজেদের আলো, নিজেদের ঘামে সম্পূর্ণ বাংলাদেশের যে স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে উঠেছে, যার মধ্যে আমরা নিজেদের চিনতে পারি, সেই স্বাতন্ত্র্য গড়ে তুলে এ গর্বিত আত্মপরিচয় দিয়েছেন যে কয়েকজন শিল্পী, আইয়ুব বাচ্চু তাদের মধ্যে একজন।

তিনি আশি ও নব্বইয়ের প্রজন্মের কৈশোর ও তারুণ্যের অংশ শুধু নন, তিনি তাদের অস্তিত্বের অস্তিত্ব, আত্মার আত্মা। তিনি না থাকলে, আমরা আমরা হয়ে উঠতাম না। তাই আজকে আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুতে সেই তরুণরা আবার একদিনের জন্য হলেও তার কৈশোরে ফিরে গেছে, ফিরে গেছে তার হারানো তারুণ্যে। তাই আজকে সোস্যাল মিডিয়ায় যে বাঁধনহারা শোকের প্রকাশ, তার জানাজায় হাজার হাজার মানুষের আগমন, কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে গোল হয়ে বসে গান রেকর্ড করে তার ভাইরাল ভিডিও— এর সবই আশি ও নব্বই এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্মের নিজেকে খুঁজে পেয়ে আবার শেষবারের মতো হারানোর আগে বিদায় বলা।

এ বিদায় আইয়ুব বাচ্চুকে নয়, এ বিদায় তার নিজের শৈশব, কৈশোর এবং তারুণ্যকেই, যাকে সে আইয়ুব বাচ্চুর মতোই আর কখনো ফিরে পাবে না।

২.

আইয়ুব বাচ্চু ও জেমস আমাদের সর্বশেষ কালচারাল আইকন। আমার হিসাবে তাদের পরে আর কোনো আইকন আসেনি। একজন আইকন একটা পুরো সময় এবং জেনারেশনকে ধারণ করেন।

একজন শিল্পীর পক্ষে একটা জনপদের পুরো সময়কে তার কাজে ধারণ করা, স্পর্শ করা, প্রকাশ করা, তাদের অনুভূতির প্রতিনিধিত্ব করা অসম্ভব। আমরা এখানে মূলত উঠতি মধ্যবিত্ত এবং শহুরে সমাজের কথাই বলছি। কিন্তু সেইটুকুকেই ধারণ করার মতো শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু ও জেমসের পরে আর আসেনি।

আইয়ুব বাচ্চু, জেমস বাদেও সত্তর, আশি বা নব্বইয়ের দশকে অনেক কালচারাল লিজেন্ড এসেছেন। কিন্তু আইয়ুব বাচ্চু ও জেমস সবার থেকে আলাদা কারণ, তারা সবাই সমাজের একটা অংশ বা সময়ের একটা অংশকে কানেক্ট করেছেন। অন্যদিকে আইয়ুব বাচ্চু ও জেমস তাদের কাজের বিস্তৃতি এবং প্রভাবের দিক থেকে একটা জেনারেশনের বেড়ে ওঠা, সময়ের সঙ্গে তার সংযোগ এবং বিচ্ছিন্নতাকে পূর্ণভাবে ধারণ করেছেন, যেমনটা বাকিদের মধ্যে দেখা যায়নি। জেনারেশনের হিসাব সাধারণত ১০ কি ১২ বছরে হয়। আমাদের সত্তরের দশকে আজম খান, আশির মাঝামাঝি থেকে নব্বইয়ের দশকে জেমস ও আইয়ুব বাচ্চু, তারপর একটা বিশাল শূন্যতা।

এটা একটা ভালো প্রশ্ন কেন নব্বইয়ের দশকের রমরমা এ মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি একবিংশ শতকের শুরুতে এসে মুখ থুবড়ে পড়ে গেছে। অনেকগুলো কারণের মধ্যে দুটি কারণ আমরা আলাদা করে বলতে পারি—

১. প্রাতিষ্ঠানিক বাস্টারডাইজেশন। ২. প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ না করে মার্কেট ক্যাপিটালিজমের ওপর মার্কেট ছেড়ে দেয়া।

প্রাতিষ্ঠানিক বেজন্মাকরণ আমাদের সরকারি ও বেসরকারি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অধঃপতনকে ব্যাখ্যা করতে ব্যবহার করা যায়। যখন একটা সিস্টেম, সিস্টেমের সবচেয়ে গারবেজ, সবচেয়ে অদক্ষ এবং সবচেয়ে মেধাহীন অংশগুলোকে উপরে তুলে নিয়ে এসে সিস্টেমের সবচেয়ে মেধাবী অংশটাকে নিচে নিয়ে যায়, তখন সিস্টেমের উন্নতির আর কোনো উপায় থাকে না, তখনই একটা সিস্টেমের বেজন্মাকরণ হয়। কারণ তখন সিস্টেমে ভালো করার প্রণোদনা থাকে শুধু বেজন্মাকরণ প্রক্রিয়ার সুবিধাভোগীদের হাতে। এবং মেধাবীরা তখন সিস্টেমে জায়গা না পেয়ে ধীরে ধীরে হারিয়ে যান।

এ বেজন্মাকরণ পদ্ধতির অন্যতম কাণ্ডারি একবিংশ শতকের শুরুর বেশকিছু রেকর্ড কোম্পানি এবং পরবর্তীতে বেশকিছু এফএম রেডিওর এক্সিকিউটিভরা, যারা সংগীতকে কিছু ফর্মুলা হিসেবে দেখা শুরু করেন এবং নিজেদের কোটারি গ্রুপ বাদে অন্যদের সিস্টেমে উঠে আসার সুযোগ বন্ধ করে দেন। এবং এই সময়ে রেকর্ড কোম্পানি, এফএম রেডিওগুলো ঢাকাকেন্দ্রিক বেশকিছু ভাই-ব্রাদার গ্রুপ তৈরি করে, যাদের অনুমতি এবং সংস্পর্শ ছাড়া একটা বড় সময়ে ধরে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন মেধা উঠে আসতে পারেনি।

অন্যদিকে রেকর্ড কোম্পানিগুলো সব আর্টিস্টকে ফর্মুলাভিত্তিক মিউজিক করতে বাধ্য করে। ফলে রেকর্ড কোম্পানির বেঁধে দেয়া ফর্মুলায় নিজের শৈল্পিক অনুভূতির প্রকাশ দেখতে না পেয়ে অনেক সম্ভাবনাময় শিল্পী মার্কেট ছেড়ে চলে যান।

প্রযুক্তির কারণে আগের সিডি বা ক্যাসেটভিত্তিক মার্কেট মডেল ফেল করার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য আলাদা কিছু নয়। এমপিথ্রি ও পাইরেসি আসার পর মার্কেট মেকানিজম বিশ্বব্যাপী ফেল করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে এ পতনটা খুব দ্রুত হয়েছে মূলত তত্কালীন সরকারের অসহযোগ, নির্বুদ্ধিতা ও মনোযোগের অভাবে।

বিএনপির দ্বিতীয় মেয়াদ ২০০১ থেকে ২০০৬ সময়ে রেকর্ড কোম্পানিগুলো অজস্রবার সরকারের কাছে পাইরেসি বন্ধে সাহায্য চেয়েছে। শিল্পীরা এবং রেকর্ড কোম্পানিগুলো আন্দোলন করেছে, রাস্তায় মিছিল করেছে, কিন্তু সেই সময়ের সরকার তাদের কোনো সুরক্ষা দেয়নি। ফলে মার্কেটে যখন মার্কেট মেকানিজম ফেল করে এবং মার্কেট থেকে জীবিকা আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়, তারপরে মার্কেটে ভালো কাজের প্রণোদনা আর ছিল না। কথিত আছে, ১৯৯৬ সালে আইয়ুব বাচ্চুর কষ্ট অ্যালবামের জন্য ২২ লাখ টাকা নিয়েছিল। সত্য, মিথ্যা জানি না।

কিন্তু মার্কেট ধ্বংস হওয়ার কারণে আর কোনো মেধাবী শিল্পীর এ প্রণোদনা ছিল না যে সে একদিন আইয়ুব বাচ্চুর মতো হবে, একটা অ্যালবাম হিট করে নিজের এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থা বদলে দেবে।

ফলে একদিকে বেজন্মাকরণ, অন্য দিকে মার্কেট ফেইলর— এ দুই কারণে মার্কেটের মেধাবী যে অংশের সুযোগ ছিল, তারা আর সামনে আসতে পারেনি। জায়গা করে নিয়েছে বেজন্মাকরণ প্রক্রিয়ার সুবিধাভোগীরা, যাদের পূর্ণভাবে ভোক্তারা গ্রহণ করেননি।

একটা-দুইটা ভালো কাজ করে মেধার দুর্বলতার কারণে তারাও আর শ্রোতাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাননি। দোষ হয়েছে শ্রোতাদের যে বাংলা গানের শ্রোতা নেই, অথচ এমপিথ্রির কল্যাণে শ্রোতারা এখন আগের থেকে বেশি গান শোনেন।

আজকের জেনারেশনের তাদের নিজস্ব একজন আইয়ুব বাচ্চু বা জেমস নেই, তারা যে এখন হিন্দি গানে বা কেনয়া ওয়েস্টের বা ব্লিংভিত্তিক হিপ হপের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পেতে গিয়ে নিজেকে খুঁজে পাচ্ছে না, এটা তাদের আরো অস্থির করে তুলছে। সাইকোলজিস্ট আইন্সওরথের অ্যাটাচমেন্ট থিওরিও একই কথা বলে।

অ্যাটাচমেন্ট থিওরি বলে, শৈশব ও কৈশোরে একজন ব্যক্তির তার বাবা বা মা বা ভাই-বোন বা সমাজের বা স্থানের সঙ্গে গভীর বন্ধন কেমন, তার ওপর নির্ভর করে তার মানসিক ভারসাম্য কেমন হবে। প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় তার মানসিক বিকাশ নিরাপদ হবে না নিরাপত্তাহীনতা ভোগ করবে, তা নির্ভর করবে তার শৈশবের অ্যাটাচমেন্ট বা বন্ধনের ওপর। এ অ্যাটাচমেন্ট থিওরিকে সমাজের সঙ্গে ব্যক্তির বন্ধন হিসেবেও আমরা দেখতে পারি।

আমাদের সমাজ কী? আমাদের বন্ধুতা কী? আমাদের সমাজের সঙ্গে সম্পর্কের, বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্কের যোগাযোগগুলো কোন সাংস্কৃতিক উপাদান নিয়ে গড়ে ওঠে?

আমাদের জেনারেশনকে গান বা নাটক বা উপন্যাস দিয়ে বেঁধেছে যে আইয়ুব বাচ্চু, হুমায়ুন আহমেদ বা হুমায়ুন ফরিদি, সেটাই আমাদেরকে সমাজ, রাষ্ট্র এবং সময়ের একটা সম্মিলিত অনুভূতি এবং বন্ধন দিয়েছে। যা সাইকোলজিস্ট আইন্সওরথের অ্যাটাচমেন্ট থিওরি অনুসারে আমাদের মনের মধ্যে একটি নিরাপত্তার বোধ দেয়, সমাজের সঙ্গে এমনকি অপরিচিতের সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তি দেয়।

নোয়া হারিরি তার সেপিয়েন্স বইয়েও এ বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন যে মানব জাতি যখন বিমূর্ত জিনিসকে কল্পনা করতে পেরেছে, তখনি সে রাষ্ট্র, সমাজকে কল্পনা করতে পেরেছে এবং যার কারণে দূরবর্তী মানুষ একটি রাষ্ট্রের মতো বিমূর্ত ধারণাকে ধারণ করে একান্নবর্তীর মতো বাস করতে পেরেছে।

কিন্তু আজকে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক বোধ অনুভব করার মতো যথেষ্ট উপাদান না থাকায় আজকে হিন্দি এবং প্রাশ্চাত্যের হিপ হিপ ব্লিং সংস্কৃতির আগ্রাসনে আটকে পরা কিশোর বা তরুণী হয়তো সেই বোধটা ধারণ করতে ব্যর্থ হয়। ফলে তার গড়ে ওঠায় সে মানসিকভাবে নিরাপত্তাহীনতা আসার সুযোগ তৈরি হয়।

এই যে জেনারেশন জি অথবা মিলেনিয়ল তাদের সঙ্গে আমাদের আশির প্রজন্মের পার্থক্যগুলো এ জায়গাতেই।

আজকের তরুণরা শুনে অবাক হবেন, আশি ও নব্বইয়ের দশকে বাংলা ব্যান্ডের মান এশিয়ার প্রথম দিকে ছিল এবং বর্তমান বলিউড থেকে এগোনো ছিল। সেই শ্লাঘা আমাদের নকল ছিল না। আসলেই আমাদের সংগীত সেই সময়ে দক্ষিণ এশিয়া শুধু নয়, এশিয়ায় শীর্ষ স্থানে ছিল। তাই আশি বা নব্বইয়ের দশকে আমাদের নিজেদের খুঁজে পেতে বলিউড বা হলিউডের দিকে তাকাতে হয়নি। আমাদের ব্যান্ড মিউজিক প্রাশ্চাত্য থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছে, প্রাশ্চাত্যের ইনস্ট্রুরুমেন্ট ব্যবহার করেছে। কিন্তু যা নির্মাণ করেছি, সেটা ছিল আমাদের একান্ত নিজস্ব।

তখন একটা অ্যালবাম রিলিজ হওয়ার পর সেই অ্যালবাম নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় আড্ডায় আডডায় আলোচনা হতো। কিন্তু বিগত পাঁচ বছরে ১০টা হিট গান দেখানো যাবে না, যা আজকের প্রজন্মের বড় অংশকে একই সঙ্গে স্পর্শ করেছে।

এই শূন্যতাটিকে পূরণ না করলে আমরা পাব আইন্সওরথের অ্যাটাচমেন্ট-বহির্ভূত নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা প্রজন্ম। যেহেতু মুক্ত বাণিজ্যে সব কিছুই অর্থমূল্যে বিবেচিত হয়, তাই বলতে হবে, একটি নিরাপত্তাহীনতা ভোগা প্রজন্মের মার্কেট মূল্যও অনেক চড়া। তাই আজকে শুধু আত্মিক প্রয়োজন নয়, একটা সুষ্ঠু মার্কেট ক্যাপিটালিজম এবং প্রতিযোগিতামূলক বুর্জোয়া শ্রেণী বিকাশ করার জন্যও নিজস্ব অন্তরগত সাংস্কৃতিক চর্চা জরুরি। নিজস্ব আইকন থাকা জরুরি, যারা জেমস বা আইয়ুব বাচ্চুর মতো একটা জেনারশনকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন।

আজকে যে রাষ্ট্রের চেহারা দেখা যাচ্ছে, তাতে ষাট থেকে নব্বইয়ের প্রজন্মের উপরে আর তেমন কোনো আশা রাখা যাচ্ছে না। তারা স্বাধীনতা এনেছেন বটে, কিন্তু তারা কোন রাষ্ট্র রেখে যাচ্ছেন— এই রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক বিপর্যয় আমরা নিয়ত দেখছি— যা এ লেখার উপজীব্য নয়।

তারপরও বলি আইয়ুব বাচ্চু, হুমায়ুন আহমেদ এবং হুমায়ুন ফরিদিরা একটি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক পরিচয় দিয়ে এ জনপদের নাগরিকদের এক সুতোয় বেঁধেছিলেন এবং সেই সুতোর বন্ধনের কারণে আমরা একটা সমতাভিত্তিক, ন্যায্যতাভিত্তিক সবার সঙ্গে সমভাবে শেয়ার করা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখা ছাড়তে পারি না, পারব না।

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এটাও পড়ুন

Close
Close