আলোচিতজাতীয়

পোশাক শিল্পে নতুন চ্যালেঞ্জ, বাংলাদেশ কি পারবে?

বার্তাবাহক ডেস্ক : ম্যাকেনজি অ্যান্ড কোম্পানি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ক্রেতারা কাছাকাছি দেশ থেকে তৈরি পোশাক কিনতে চায়।উদ্দেশ্য খরচ ও সময় বাঁচানো। এটা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ম্যাকেনজি অ্যান্ড কোম্পানির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্যাশন ধারার দ্রত পরিবর্তনশীলতার কারণে দূরের দেশ থেকে পণ্য এনে ক্রেতার চাহিদা পূরণ করা কষ্টকর হয়ে উঠছে। ক্রেতাদের কাছে দ্রুততর সময়ে পণ্য পৌঁছে দিতে তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠানগুলো কাছাকাছি জায়গা থেকে পোশাক উৎপাদন করবে।

‘ইজ অ্যাপারেল ম্যানুফ্যাকচারিং কামিং হোম?’ শিরোনামে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয়ভাবে কিংবা নিজ দেশের কাছাকাছি দেশে পোশাক উৎপাদন করতে গেলে উৎপাদন খরচ কিছুটা বাড়লেও জাহাজে পণ্য পরিবহনের ব্যয় থাকবে না বললেই চলে। ফলে সামগ্রিক বিচেনায় উৎপাদন খরচে তেমন হেরফের হবে না। বলা হয়েছে, আগামী দশকের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন ও ইউরোপীয়দের মধ্যে নিজ নিজ দেশের কাছাকাছি জায়গায় উৎপাদিত পোশাক পরিধানের প্রবণতা আরো বাড়বে।প্রতিবেদনে কর্মী হিসেবে মানুষের বদলে রোবট ব্যবহারের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে।

ম্যাকেনজি অ্যান্ড কোম্পানি পোশাক শিল্প খাতের ১৮৮ জন প্রতিনিধির ওপর জরিপটি পরিচালনা করে। সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে ৭৯ শতাংশ নির্বাহী বলেছেন, ২০২৫ সাল নাগাদ দ্রুততার জন্য কাছাকাছি জায়গাকে প্রাধান্য দেয়া হতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের যেসব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কিংবা চীন থেকে জিন্স উৎপাদন করতো, তারা মেক্সিকোর দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে কিংবা সেখানে উৎপাদন বাড়িয়ে দিতে পারে। ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য এখনো বাংলাদেশ থেকে পোশাক নেয়া সাশ্রয়ী।এখানে উৎপাদন খরচ অনেক কম। তবে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর উৎপাদন চীন থেকে তুরস্কে স্থানান্তর করা হলে তাতে অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য পাওয়া যাবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে ৩০ দিন ধরে জাহাজে মালামাল পরিবহন করার খরচসহ চীনে প্রতি জোড়া জিন্স উৎপাদনের খরচ পড়েছে ১২ দশমিক ০৪ ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন করলে ১৭ শতাংশ বা ১৪ দশমিক ০৫ ডলার বেশি খরচ পড়তো। গবেষণা বলছে, জাহাজে পোশাক পরিবহণের যে সময় ব্যয় হয় তা বাঁচানোর কথা চিন্তা করলে এ খরচ পুষিয়ে যাবে। আর এর মধ্য দিয়ে ট্রেন্ড অনুযায়ী পণ্য বিক্রির প্রবণতা বাড়বে।

ওই একই জিন্স বাংলাদেশে উৎপাদনে প্রতি জোড়া খরচ পড়েছে ১০ দশমিক ৬৮ ডলার৷ তবে দুই দিনের ট্রাক শিপিং খরচ বিবেচনা করলে মেক্সিকোতে প্রতি জোড়া জিন্সের উৎপাদন খরচ ১০ দশমিক ৫৭ ডলার। ম্যাকেনজির গবেষণা বলছে, এভাবে ‘বাজার পর্যন্ত পৌঁছানোর সময়’ কমিয়ে পোশাক প্রতিষ্ঠানগুলো একটি মৌসুমেই সবচেয়ে আধুনিক ট্রেন্ডটি ধরতে পারবে।প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘‘ছয় মাসের ফ্যাশন চক্রকে দ্রুত গতির বিবেচনা করা হতো। কিন্তু বর্তমানে ‘স্পিডি ফ্যাশনে’র ক্ষেত্রে গতি নির্ধারণের মাপকাঠি ছয় সপ্তাহের বেশি নয়৷ কিছু খুচরা বিক্রেতা আরো দ্রুত গতিতে এর সঙ্গে তাল মেলাতে পারে।’’

গবেষকরা মনে করছেন, ফ্যাশন ট্রেন্ডের দ্রুত গতির সঙ্গে তাল মেলানো ছাড়াও অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিও কাছাকাছি দেশে উৎপাদনে আগ্রহ তৈরির আরো একটি কারণ। এক জোড়া জিন্স সেলাই করতে এখন গড়ে ১৯ মিনিট সময় লাগে, যা মোট উৎপাদনের সময়ের চেয়ে অর্ধেকেরও বেশি। তবে রোবট ব্যবহার করলে এ সময় ৪০ থেকে ৯০ শতাংশ কমে আসবে। ডিজিটাল প্রিন্টিং ব্যবহার করলে পোশাক তৈরি শেষ করতে শ্রমের পরিমাণ ৭০ শতাংশের মতো কমে যাবে। ম্যাকেনজি যেসব নির্বাহীর ওপর জরিপ চালিয়েছে, তার মধ্যে ৮০ শতাংশেরও বেশি নির্বাহী বলেছেন, ২০২৫ সাল নাগাদ সাধারণ পোশাকগুলোর উৎপাদন স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে হবে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারকেদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘‘মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্র পোশাক পায় দুই দিনে। আর আমাদের পাঠাতে লাগে ৩০ দিন। ফলে তারা যদি অটোমেশনে যায়, তাহলে তারা আরো দ্রুত উৎপাদন ও সরবরাহ করতে পারবে। তাই তাদের যে নতুন চিন্তা তাতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশের পোশাক খাত। সব বিবেচনায় উৎপাদ খরচ যেমন কম রাখতে হবে, তেমনি ক্রেতাদের চাহিদামতো সময়ের মধ্যে পোশাক সরবরাহ করতে হবে।’’

তিনি বলেন,‘‘এজন্য আমাদের লিড টাইম (উৎপাদন থেকে ক্রেতার হাতে পৌছানো পর্যন্ত) কমিয়ে আনতে হবে। আর আমাদের ব্যাকওয়ার্ড ইন্ডাষ্ট্রি লাগবে। কারণ আমরা অনেক ফেব্রিকই আমদানি করি। আরো অনেক পন্য আমদানি করতে হয়। তাদের সময়ের ওপর আমাদের নির্ভর করতে হয়। তারা কখন ফেব্রিক দেবে তার ওপর আমাদের উৎপাদন নির্ভর করে। এটা একটা বড় সমস্যা। লিড টাইম কমাতে হলে আমাদের বন্দরের ক্যাপাসিটি বাড়াতে হবে। কাস্টমস ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। আর ব্যাকোয়ার্ড ইন্ডাস্ট্রির কথা তো বললামই। এসব মিলে আমরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারব। আমরা এজন্য সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় প্রস্তাব পেশ করেছি।’’

আর উইনসাম নিট কম্পোজিট লিমিটেড নামে একটি তৈরি পোশাক কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমির উল ইসলাম বলেন, ‘‘যুক্তরাষ্ট্র যদি তার আশপাশের দেশ মেক্সিকো, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা থেকে গার্মেন্টস প্রোডাক্ট নিতে চায়, তা তাদের বাল্ক ডিমান্ড, মানে মিলিয়ন মিলিয়ন পিসের জন্য কতটা সফল হবে, এটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কারণ, মেক্সিকো, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা বাংলাদেশ থেকে প্রচুর তৈরি পোশাক নেয়। তারাও কিছু পোশাক তৈরি করে, তা হলো ফ্যান্সি প্রোডাক্ট, যা উচ্চ মূল্যের, এইসব ফেন্সি প্রোডাক্ট তারা অ্যামেরিকায় পাঠায়। কিন্তু বাল্ক প্রোডাক্ট করলে সব মিলিয়ে বাংলাদেশের কস্টিংয়ে তারা পারবে না।’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘আমরা চাইলেই লিড টাইম আরো কমিয়ে আনতে পারি। ইউরোপের দেশগুলোতে আমরা ৩০ থেকে ৪৫ দিনে পোশাক সরবরাহ করি। আর অ্যামেরিকায় ৯০ থেকে ১২০ দিন৷ এখন এখানে ক্রেতা দেশেরও দায়িত্ব আছে। তাদের নানা প্রোসিডিওর শেষ করতে অনেক সময় লেগে যায়। সেটা সহজ করলে লিড টাইম কমে আসবে। আর আমাদের নিজেদের তো বন্দর নিয়ে কাজ করতেই হবে।’’

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান(বিআইডিএস)-এর অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ মনে করেন, পোশাক ক্রেতা পশ্চিমা দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কাছে এখন তিনটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে– দাম, লিড টাইম এবং ফ্যাশন৷ আর ফ্যাশন দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। ফ্যাশনেবল প্রেডাক্টের দামও বেশি৷ তিনি বলেন, ‘‘এসব কারণে ইউরোপের কাছে তুরস্কের গুরুত্ব বাড়ছে। আফ্রিকার কিছু দেশ, যেমন ইথিওপিয়ার গুরুত্বও বাড়ছে। তবে এটাও সত্য যে, যেটা ফ্যাশনেবল হাই ভ্যালু প্রোডাক্ট, তার জন্য লিড টাইম গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যা সাধারণ গার্মেন্টস পণ্য, তার জন্য কত কম দামে পাওয়া যায় সেটা গুরুত্বপূর্ণ। আর সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোনো সংকটে পড়ার আশঙ্কা আমি দেখছি না। তবে সমস্যা হবে হাই ভ্যালু ফ্যাশন প্রোডাক্টের ক্ষেত্রে। কারণ, ফ্যাশন খুব দ্রুত পরিবর্তন হয়৷ এখানে লিড টাইম আসলেই খুব গুরুত্বপূর্ণ।’’

তবে তিনি মনে করেন, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শেষ পর্যন্ত লিড টাইম কমাতেই হবে। এখানকার গার্মেন্টস প্রোডাক্টের কাঁচামালের জন্য বাইরের দেশের ওপর নির্ভর করতে হয়। বন্দর সুবিধা অপ্রতুল। বন্দরের দক্ষতাও বাড়ানো প্রয়োজন। শুধু চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভর করে মংলা বন্দরকে সচল করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশে উৎপাদিত পোশাকের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন৷ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় তিন পোশাক রফতানিকারক দেশের একটি বাংলাদেশ। ম্যাকেনজির জরিপ বলছে, চীনের পর পোশাক উৎপাদনের উৎস হিসেবে বাংলাদেশকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। রানা প্লাজা ভবন ধস পরবর্তী বিপর্যয় কাটিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পেরেছে বাংলাদেশ।তবে বাংলাদেশের সফলতার একই মডেলের ওপর নির্ভরশীল থাকা চলবে না। প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকতে হলে অটোমেশন ও উদ্ভাবনের নতুন ট্রেন্ডগুলোর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে বাংলাদেশকে। সেটাকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বলছেন কেউ কেউ।

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এটাও পড়ুন

Close
Close