আলোচিতজাতীয়

ঘূর্ণিপাকে রাজনীতি

বার্তাবাহক ডেস্ক : রাজনীতিতে ক্ষমতার দাপটের কাছে হার মানছে আদর্শ। চলছে দল ও জোটের খেলা। দলীয় রাজনীতিতে একজন রাজনীতিবিদদের দলের প্রতি যে আদর্শ থাকা উচিত, এখন তা আর লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। দলীয় আদর্শের চেয়েও রাজনীতিবিদদের কাছে মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছে ক্ষমতা।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যেন ঘূর্ণিপাকে পড়েছে রাজনীতি। দল ভাঙছে, জোট হচ্ছে, আবার ভাঙছে। তাৎক্ষণিক লাভ বা নগদ পাওনার জন্য সবাই যেন ব্যতিব্যস্ত। এর ফলে রাজনীতির স্বাভাবিকতা ব্যাহত হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লষকরা মনে করছেন, ছোট দলগুলোর গন্তব্য প্রেস ক্লাবকেন্দ্রিক। সেখানে গিয়ে তারা বলে আমরা নতুন একটি দল গঠন করলাম, আমরা নতুন একটি জোট গঠন করলাম। এতে রাজনীতিতে গুণগত কোনো মান আসে না। অতীতে আসে নাই, এখনো আসছে না এবং ভবিষ্যতেও আসার সম্ভবনা খুবই কম।

তারা আরও বলেন, ছোট দলগুলো যখন কোনো জোটে আসে তখন দেখে কোন জোটে গেলে লভ্যাংশ বেশি পাওয়া যাবে। এখনে আদর্শ বা নীতির কোনো বিষয় থাকে না। ছোট দলগুলো ক্ষমতার ভাগিদার হতে চায়। দলগুলোর মূল হিসাব থাকে তারা কতটুকু পাবে।

জানা গেছে, বর্তমানে দেশে মোট ১৯৩টি রাজনৈতিক দল এবং ১৪টি রাজনৈতিক জোট আছে। এর মধ্যে প্রধান দুটি জোট হচ্ছে-আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট এবং বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট (২০ দল থেকে ন্যাপ ও এনডিপি বের হয়ে গেছে)। সর্বশেষ বিএনপি, গণফোরাম, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ও নাগরিক ঐক্য মিলে গঠিত হয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে এ জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. কামাল হোসেন। ড. কামাল হোসেন গণফোরামের সভাপতি এবং সংবিধান প্রণেতা। তিনি এক সময়ে বন্ধবন্ধুর মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ছিলেন। তিনি তখন আইনমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এর পরে ঘটনাক্রমে আওয়ামী লীগ থেকে ছিটকে পরেন এবং গণফোরাম গঠন করে। তার দলে তিনি ছাড়া উল্লেখযোগ্য আর কোনো নেতা নেই।

আর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা মাহামুদুর রহমান মান্না এক সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগ থেকে ছিটকে পড়ে নাগরিক ঐক্য গঠন করেন।

এভাবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অধিকাংশ নেতাই কোনো না কোনো সময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আর এখন তারা আওয়ামী লীগবিরোধী অ্যালায়েন্স গঠন করেছেন। রাজনৈতিক আদর্শচ্যুতির কারণেই এমনটা হচ্ছে বলে বিশ্লেকদের মত।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মিছবাহুর রহমান ও তরিকত ফেডারেশনের সাবেক মহাসচিব আবদুল আউয়ালের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে ১৪ দলের ‘ইসলামিক ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স’। এ জোট আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকবে বলে জানা গেছে। যদিও আওয়ামী লীগ সবসময়ই অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাস করে, আর ইসলামী দলগুলো বরাবরই ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করে আসছে।

জাকের পার্টির চেয়ারম্যান খাজা মোস্তফা আমীর ফয়সাল মুজাদ্দেদী বলেছেন, আমরা সুফি মতাদর্শ ধারণ করি। এখানে ধর্ম, গোত্র বা সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে মানুষকে স্থান দেওয়া হয়। এ আদর্শ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে মেলে। এ কারণে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির সঙ্গে আমরা থাকতে চাই।

এদিকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ ৫৮টি দল নিয়ে সম্মিলিত জাতীয় জোট নামে একটি মোর্চা বানিয়ে রেখেছেন। সম্প্রতি ঢাকায় নির্বাচনী জনসভা করেছেন এরশাদ। তিনি জোটের পরিধি আরও বাড়াতে পারেন বলে জানিয়েছেন পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার। বর্তমান সরকারের সময়ে গৃহপালিত বিরোধী দল হিসেবে পাঁচ বছর পার করেছে জাতীয় পার্টি। এবারও সরকারের সঙ্গে মিলেমিশে থাকবে জাপার রাজনীতিতে এমন ধারণা অনেকটাই পরিষ্কার।

বিএনপির সাবেক নেতা নাজমুল হুদা বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট অ্যালায়েন্স (বিএনএ) নামে ৩৪ দলীয় একটি জোট করেছেন, বেশিরভাগ দলই নামসর্বস্ব। এ জোটও ক্ষমতাসীন জোটে যুক্ত হতে আগ্রহী। অথচ নাজমুল হুদা বিএনপি সরকারের আমলে যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

গত জুলাই মাসে সিপিবি, বাসদ এবং বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ মোট ৮টি দল নিয়ে গঠন করা হয় বাম গণতান্ত্রিক জোট। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন দুই জোটের বাইরে তৃতীয় শক্তি গড়ার প্রত্যাশায় নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান ধরে রাখতে চাচ্ছে এই জোট। ভাঙাগড়ার এ খেলায় সবশেষ শিকার হলো আরও তিনটি দল। এ তিনটি দল ভেঙে হয়েছে আরও কয়েকটি দল। ভাঙাগড়ার এ খেলায় শিকার বি. চৌধুরীর বিকল্পধারা। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, মহাসচিবকেই বহিষ্কার করল দলটির আরেক পক্ষ। এর আগে ২০ দলীয় জোট ভেঙে বেরিয়ে আসে ন্যাপ ও এনডিপি। পরে দল দুটির অন্য নেতারা, বহিষ্কারের দাবি করে মূল নেতাদের। আর এভাবেই ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হচ্ছে দলগুলো।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান এ বিষয়ে বলেন, ছোট দলগুলোর মূল ভিত্তিটাই হচ্ছে প্রেস ক্লাবকেন্দ্রিক। সেখানে গিয়ে তারা সাংবাদিক সম্মেলন করে ঘোষণা করে, একটি রাজনৈতিক গঠন করলাম, আমরা নতুন একটি জোট গঠন করলাম ইত্যাদি ইত্যাদি। এতে রাজনীতিতে গুণগত কোনো মান আসে না।

এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, উপমহাদেশে মনে হয় বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেখানে রাজনৈতিক দল গঠনের কোনো ফরমেশন নেই এবং কোনো রেস্ট্রিকশনও নেই। সংবিধানে যদি কিছু ক্রাইটোরিয়া দেওয়া থাকত তাহলে এ ১৯৩টি দল হতো না।

 

 

সূত্র: পরিবর্তন

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close