অর্থনীতি

নতুন বিনিয়োগে সিদ্ধান্তহীনতায় দেশীয় উদ্যোক্তারা

বার্তাবাহক ডেস্ক : চামড়াজাত পাদুকা ও উচ্চমূল্যের পোশাকপণ্য উৎপাদনে অনেকদিন ধরেই বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন দেশীয় এক উদ্যোক্তা। অনেক খোঁজার পর গত মার্চে বিনিয়োগ প্রকল্পের জন্য জমিও কেনেন। গত সেপ্টেম্বরে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নিবন্ধন নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু সম্প্রতি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ পিছিয়ে ২০১৯ সালের শেষার্ধকে বেছে নিয়েছেন এ উদ্যোক্তা।

এ উদ্যোক্তার মতো আরো অনেকেই বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়নে সিদ্ধান্তহীনতায় আছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের ভাষ্য, এক মাসের মধ্যেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে পূর্বাভিজ্ঞতা থেকে তারা বর্তমান সময়টিকে বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত মনে করছেন না। ঝুঁকি এড়াতে তাই এ বছর নতুন বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়ন পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন তারা।

চলতি বছর বিনিয়োগ বাস্তবায়ন নিয়ে দেশীয় উদ্যোক্তাদের সিদ্ধান্তহীনতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বিনিয়োগ নিবন্ধন পরিসংখ্যানেও। উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ আগ্রহের প্রকাশ ঘটে প্রকল্প নিবন্ধনের গতিপ্রকৃতিতে। চলতি বছরের নয় মাসের (জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর) স্থানীয়, শতভাগ বিদেশী ও যৌথ বিনিয়োগের পরিসংখ্যান পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশীদের বিনিয়োগ আগ্রহ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, নির্বাচনের বছর হওয়ায় বিনিয়োগের বিষয়ে খুব সতর্ক তারা। এর প্রভাব পড়েছে প্রকল্প নিবন্ধনের মোট পরিসংখ্যানে। এর মধ্যেও আবার বেশি সতর্ক স্থানীয় উদ্যোক্তারা। রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রত্যক্ষভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ থেকেই সিদ্ধান্তহীনতায় বেশি ভুগছেন তারা।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিআইডিএ) বছরভিত্তিক নিবন্ধন পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরের নয় মাস (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত স্থানীয়, শতভাগ বিদেশী ও যৌথ বিনিয়োগের নিবন্ধন হয়েছে ১ হাজার ৩৭০ কোটি ডলারের। ২০১৭ সালের একই সময়ে নিবন্ধিত বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৬৮৮ কোটি ডলারের। এ হিসাবে নিবন্ধিত বিনিয়োগের পরিমাণ কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ।

চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে সার্বিকভাবে বিনিয়োগ নিবন্ধন প্রায় ১৯ শতাংশ কমলেও স্থানীয় বিনিয়োগ নিবন্ধন কমেছে আরো বেশি, ২৯ শতাংশ। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে ১ হাজার ২৬টি প্রকল্পে নিবন্ধিত স্থানীয় বিনিয়োগের পরিমাণ ৯৪৪ কোটি ৬১ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে ১ হাজার ২২৬টি প্রকল্পে নিবন্ধিত স্থানীয় বিনিয়োগ ছিল ১ হাজার ৩৪৮ কোটি ১৯ লাখ ডলারের। এ হিসাবে স্থানীয় বিনিয়োগ নিবন্ধন কমেছে ২৯ শতাংশ।

নির্বাচনকালে রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে পূর্বাভিজ্ঞতা থেকেই দেশীয় উদ্যোক্তাদের অনেকে হয়তো জানুয়ারি বা মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন বলে মনে করেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি আবুল কাসেম খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, নির্বাচনকালে রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভিন্নতা থাকে। এর প্রভাব পড়ে বিনিয়োগে। চলতি বছরের সার্বিক পরিবেশ অনেকটাই অপ্রত্যাশিত। এ রকম পরিস্থিতি যে থাকবে, পূর্বাভিজ্ঞতা থেকে আশা করা যায়নি। সেজন্যই হয়তো অনেকে বিনিয়োগের জন্য সময় নিচ্ছেন। অনেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কিন্তু পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে সময় নিচ্ছেন। এটা হওয়াই স্বাভাবিক।

এমনিতেই দেশে বিনিয়োগ বাস্তবায়নে জ্বালানি অনিশ্চয়তাসহ জমি ও অবকাঠামোর সংকট রয়েছে। এতে বিলম্বিত হচ্ছে বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন। অনেকে আবার নিবন্ধনের পরও বিনিয়োগ পরিকল্পনা থেকে সরে আসছেন।

বিআইডিএর তথ্য বলছে, ২০১৫-১৭ পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের নিবন্ধন হলেও আশাব্যঞ্জক নয় বাস্তবায়নের চিত্র। গত তিন বছরে নিবন্ধিত প্রকল্পগুলোর মোট বিনিয়োগ প্রস্তাবনার পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৩৬৩ কোটি ৮৮ লাখ ডলার। যদিও এসব বিনিয়োগ প্রস্তাবনার সামান্যই বাস্তবায়ন হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে বাস্তবায়নের হার শূন্য।

গত তিন বছরে নিবন্ধন নেয়া একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাদের অনেকেই বিনিয়োগ পরিকল্পনা থেকে সরে আসার কথা জানিয়েছে। নানা জটিলতায় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রগতি আনতে পারছে না তারা। বিনিয়োগ পরিকল্পনা শতভাগ বাস্তবায়ন করে ফেলেছে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সীমিত।

নির্বাচনের বছর হওয়ায় এবার বিনিয়োগকারীরা নিবন্ধনের আগ্রহ কম দেখিয়েছেন বলে জানিয়েছে বিআইডিএ সূত্রগুলো। তারা বলছেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয়রাই নিবন্ধন কম নিয়েছেন। একক মাস বিবেচনা করলে কয়েক বছরের মধ্যে চলতি বছরের অক্টোবরে স্থানীয় ও বিদেশী বিনিয়োগ নিবন্ধন অনেক কম হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশীরা অনিশ্চয়তার বিষয়টি উপলব্ধি করলেও পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে প্রকল্প নিবন্ধন করিয়েছেন।

জানতে চাইলে বিআইডিএর নির্বাহী সদস্য নাভাস চন্দ্র মণ্ডল বলেন, বিনিয়োগকারীরা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেই বিনিয়োগের পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেন। সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দেশী বা বিদেশী সব বিনিয়োগকারীর মানসিকতা একই রকম। আশা করছি, আগামী বছরগুলোয় বিনিয়োগের আগ্রহে জোয়ার দেখা যাবে।

স্থানীয় বিনিয়োগ নিবন্ধন কমলেও বেড়েছে প্রস্তাবিত শতভাগ বিদেশী ও যৌথ বিনিয়োগের পরিমাণ। বিআইডিএর পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে শতভাগ বিদেশী ও যৌথ ১২৩টি প্রকল্পে বিনিয়োগ নিবন্ধনের পরিমাণ ৪২৬ কোটি ১৯ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে ১১৮টি প্রকল্পে যেখানে শতভাগ বিদেশী ও যৌথ বিনিয়োগ নিবন্ধনের পরিমাণ ছিল ৩৪০ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। এ হিসাবে আলোচ্য সময়ে শতভাগ বিদেশী ও যৌথ বিনিয়োগের আগ্রহ বেড়েছে ২৫ শতাংশ।

ব্যবসায়ীদের মতে, দেশী বা বিদেশী বিনিয়োগকারীমাত্রই চান নিরবচ্ছিন্ন বিনিয়োগ অবকাঠামো সুবিধা। চলতি বছরটি নির্বাচনের বছর হওয়ায় ব্যবসায়ীরা কিছুটা সতর্ক অবস্থানে প্রকল্প নিবন্ধন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আশার কথা হলো, বিদেশীদের বিনিয়োগ আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে। এ আগ্রহ যাতে বজায় থাকে, সেজন্য আগামীতে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করার পাশাপাশি ওয়ান স্টপ সার্ভিস নিশ্চিত করতে হবে।

আবুল কাসেম খান বলেন, বিদেশীদের আগ্রহ কম থাকলে সেটা উদ্বেগের কারণ হতো। কিন্তু বিদেশীদের আগ্রহ ও বিনিয়োগপ্রবাহ দুই-ই বেড়েছে। এটা ইতিবাচক দিক। বিদেশীরা অনেক কিছু পর্যবেক্ষণ করেই বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেন। তারা হোমওয়ার্ক করেই মাঠে নামেন। সার্বিকভাবে বিনিয়োগের পরিবেশ ভালো বলেই তারা নিবন্ধন নিচ্ছেন। দেশীয় বা আমাদের নিজেদের নিয়ে চিন্তার কোনো কারণ নেই। কারণ আমি এখন না করলে তিন-চার মাস পর বিনিয়োগ বাস্তবায়ন করব। কিন্তু বিদেশী বিনিয়োগকারী ফিরে গেলে সেটা হতাশার, উদ্বেগের। আশা করছি, নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিও এখনকার মতো স্বাভাবিক থাকবে।

ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশার যথার্থতা দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত হালনাগাদ করা এফডিআই পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে নিট এফডিআইয়ের পরিমাণ ছিল ১৪১ কোটি ৫৯ লাখ ৭০ হাজার ডলার। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৯৮ কোটি ৭০ লাখ ৯ হাজার ডলার। এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে দেশে নিট এফডিআই প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ৪৩ শতাংশ।

 

 

সূত্র: বণিক বার্তা

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এটাও পড়ুন

Close
Close