আলোচিত

সিঙ্গাপুর হয়ে উঠছে বাংলাদেশীদের কালো টাকার গন্তব্যস্থল

বার্তাবাহক ডেস্ক : বৈশ্বিক আর্থিক গোপনীয়তার সূচকে সিঙ্গাপুরের অবস্থান পঞ্চম। দেশটিতে অফশোর আর্থিক সেবার বাজার ক্রমেই বড় হচ্ছে। এশিয়ার শীর্ষ অফশোর ফিন্যান্সিয়াল সেন্টার হতে হংকংয়ের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা করছে দেশটি। মূলত এশিয়ার দেশগুলোর ক্রমবিকাশমান অর্থনীতির সুযোগ নিয়ে অফশোর বিনিয়োগের অন্যতম শীর্ষ গন্তব্যও হয়ে উঠেছে সিঙ্গাপুর। একই সঙ্গে হয়ে উঠেছে মুদ্রা পাচার ও কালো টাকার নিরাপদ গন্তব্যস্থলও। এ সুযোগ নিচ্ছে বাংলাদেশীরাও।

সিঙ্গাপুরে রয়েছে নামিদামি অনেক ক্যাসিনো। বেশকিছু ক্যাসিনোর মালিকানায় রয়েছেন বাংলাদেশীরা, যেগুলো কালো টাকার অন্যতম গন্তব্য। এছাড়া সিঙ্গাপুরের মেরিনা বে বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল হোটেল। ভিআইপি ক্যাসিনো হিসেবে রয়েছে এটির বিশেষ পরিচিতি।

সূত্র বলছে, মেরিনা বে ক্যাসিনোতেই কোটি ডলারের বান্ডিল নিয়ে খেলতে যান এক বাংলাদেশী। তিনি নিজেকে যুবলীগের একজন শীর্ষ নেতা হিসেবে পরিচয় দেন। আলোচিত এ নেতা সিঙ্গাপুরের জুয়ার বোর্ডে প্রতিদিন লাখ ডলারের বান্ডিল নিয়ে বসেন। জনশ্রুতি রয়েছে, জুয়ার বোর্ডে ওড়ানো বিপুল অংকের টাকা তার নিজের উপার্জিত নয়। এ টাকার সবচেয়ে বড় উৎস ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্ক। তার ছায়ায় ঢাকায় অন্তত ১৫০ জুয়ার স্পট রয়েছে। সেগুলো চালানো হয় সিঙ্গাপুরের ক্যাসিনোর আদলে, যার মাধ্যমে আয় হচ্ছে দৈনিক প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। এ টাকার বড় অংশ হুন্ডির মাধ্যমে চলে যাচ্ছে সিঙ্গাপুরে।

জানা গেছে, একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের মালিকও কয়েকটি ব্যাংক থেকে বড় অংকের ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ না করে তা সিঙ্গাপুরে পাচার করেছেন। এছাড়া বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তা ও পরিচালকরাও অর্থ পাচারের জন্য সিঙ্গাপুরকে বেছে নিচ্ছেন। আর্থিক গোপনীয়তার সুযোগ নিয়ে দেশটিতে অর্থ পাচার করছেন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের ব্যবসায়ীরাও।

আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের মাধ্যমেও সিঙ্গাপুরে অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটছে। উচ্চমূল্যে আমদানি দেখিয়ে দেশটিতে অর্থ পাচার করছেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি আমদানি-রফতানির অন্যতম রুট হওয়ায় ব্যবসায়ীদের নিত্য গন্তব্য হয়ে উঠেছে সিঙ্গাপুর। গার্মেন্ট বা টেক্সটাইলের মেশিনারিজ আমদানির জন্যও দেশটিতে যেতে হয় ব্যবসায়ীদের। এ সুযোগ কাজে লাগিয়েও অনেকে দেশটিতে অর্থ স্থানান্তর করেন।

সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশীদের যাতায়াত বাড়ায় প্রতিযোগিতা বেড়েছে এ রুটের এয়ারলাইনসগুলোর মধ্যেও। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ও সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস। পাশাপাশি মালয়েশিয়া এয়ারলাইনস ও এয়ার এশিয়াও ঢাকা-সিঙ্গাপুর রুটে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যাত্রী পরিবহন করছে। চিকিৎসা, ব্যবসা ও পর্যটনের নামে বাংলাদেশীরা সিঙ্গাপুরে গেলেও এদের অনেকেই ক্যাসিনোয় জুয়া খেলেন এবং অর্থ পাচার করেন।

এসবই তারা করছেন দেশটির আর্থিক গোপনীয়তা আইনের সুযোগ নিয়ে। সিঙ্গাপুর এ গোপনীয়তা সুরক্ষার কাজটি শুরু করে নব্বইয়ের দশকে আর্থিক বাজার ও ব্যাংকিং খাত উদারীকরণের মধ্য দিয়ে। মূলত ওই সময়ের পর থেকেই দেশটিতে তহবিল ব্যবস্থাপনা, ট্রেজারি অপারেশন, বীমা, ইকুইটি মার্কেট, ডেট ইন্স্যুরেন্স, করপোরেট ফিন্যান্সিংসহ আর্থিক খাতের বিভিন্ন অংশের বাজার সম্প্রসারণ হতে থাকে। এ উদারীকরণ আরো জোরালো হয় ২০০১ সালের আর্থিক গোপনীয়তার নীতিমালাকে আরো কঠোর করে তোলার মধ্য দিয়ে। এজন্য সংশোধন করা হয় ব্যাংকিং আইন। সিঙ্গাপুরে গোপনীয়তার আইন লঙ্ঘনের শাস্তি হলো তিন বছরের জেল। ২০০৪ সালে ট্রাস্ট আইনে সংশোধন করার মধ্য দিয়ে কালো টাকার নিরাপদ গন্তব্য করে তোলা হয় দেশটিকে।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্র্যাকটিশনারদের ভাষ্য হলো, অন্যান্য দেশের সঙ্গে আর্থিক খাতের তথ্য বিনিময়ে কোনো চুক্তি করা হলেও স্থানীয় আদালতেই বিশেষ সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে তাতে ভারসাম্য নিয়ে আসা হয়। আদালতের এ বিশেষ সুবিধার কারণে অন্যান্য দেশের কর্তৃপক্ষের জন্য আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট কোনো তথ্য বের করে আনাটাও বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।

আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা নিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে এ-সংক্রান্ত কিছু সংস্কার করা হয়। এর পরও কালো টাকার স্বর্গ হয়ে উঠেছে দেশটি, যার অন্যতম কারণ হলো আর্থিক গোপনীয়তার নীতি। এ গোপনীয়তা রক্ষায় বেশকিছু সেবা প্রচলিত রয়েছে সিঙ্গাপুরে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দেশটিতে প্রচলিত প্রাইভেট ট্রাস্ট কোম্পানি (পিটিসি) ব্যবস্থার কথা। এটি মূলত আর্থিক লেনদেনে গোপনীয়তা রক্ষা করে চলা ট্রাস্টগুলোর ট্রাস্টি হিসেবে কাজ করে। স্থানীয় এক প্র্যাকটিশনারের ভাষ্যমতে, একটি পিটিসির কাজ হলো ধনী ব্যক্তিদের ‘ট্রাস্টের ওপর উচ্চমাত্রার নিয়ন্ত্রণ ও সতর্কতা’ বজায় রাখার সুযোগ করে দেয়া। সিঙ্গাপুরের অধিবাসী নয়, এমন কেউ যদি অন্য কোনো দেশ থেকে কোনো ধরনের আয় নিয়ে আসে; তাহলে তার কোনো ধরনের কর পরিশোধ করতে হয় না।

এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশ থেকে দেশটিতে অর্থ পাচার হচ্ছে এবং তা ফিরিয়ে আনার নজিরও আছে। বিএনপি চেয়াপারসনের ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর পাচার করা ১৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা ২০১২ সালে ফেরত আনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মূলত সিঙ্গাপুরে পাচার হওয়া কোকোর অর্থের লভ্যাংশ হিসেবে এ টাকা ফেরত আনে দুদক। সর্বশেষ ২০১৩ সালে ফেরত আনা হয় আরো ৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।

সিঙ্গাপুরে পাচার হওয়া কোকোর টাকা ফিরিয়ে আনতে দুদকের পরামর্শক হিসেবে কাজ করে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ফেরদৌস আহমেদ খানের প্রতিষ্ঠান অক্টোখান।

তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে ১৯৪৭ সালের ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট ও ২০১৭ সালের মুদ্রা পাচার প্রতিরোধ আইনের সামঞ্জস্য নেই। ফলে দেশের ব্যবসায়ীরা বিদেশে তাদের ব্যবসা প্রক্রিয়াকে সহজ করতেই বৈধ আয়ের একটি অংশ সিঙ্গাপুরের ব্যাংকিং চ্যানেলে রাখছেন। যদি কেউ তার ব্যাংকে সঞ্চিত অর্থ দিয়ে অবৈধ কিছু না করেন, তাহলে সিঙ্গাপুরে আধুনিকতম ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীরা সে সুযোগই নিচ্ছেন। তাদের গচ্ছিত অর্থই যে কালো টাকা সেটি নয়। বরং দেশের আইনের প্রতিবন্ধকতার কারণেই তারা সে দেশে তাদের আয়ের অর্থ রাখছেন। এজন্য দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মিলিয়ে এ খাতের প্রচলিত আইন সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের বড় ব্যবসায়ীদের অনেকে বিভিন্ন দেশে আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপন করেছেন। সেখান থেকেই মূল ব্যবসা পরিচালনা করছেন তারা। আর আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনে প্রথম পছন্দ হিসেবে তারা বেছে নিচ্ছেন সিঙ্গাপুরকে। যদিও অভিযোগ আছে, অর্থ পাচারের নতুন উপায় হিসেবে বিভিন্ন দেশে আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপন করছেন ব্যবসায়ীরা। এর মাধ্যমে আমদানি-রফতানিতে মূল্য বেশি ও কমের মাধ্যমে অর্থ পাচার করছেন। সুইজারল্যান্ডের আইন শক্ত হওয়ায় সেখানে টাকা রাখতে গেলে প্রশ্ন করা হয়। এ কারণে দেশটিতে টাকা পাচারে ধীরগতি আসছে। তবে সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের ভূমিকায় সিঙ্গাপুরকে দেখা যাচ্ছে। সেখানে টাকা রাখতে গেলে প্রশ্ন করা হয় না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিঙ্গাপুর থেকে রেমিট্যান্সের বড় একটি অংশই হুন্ডির মাধ্যমে দেশে ঢুকছে। এসব দেশে বুথ খুলে প্রবাসী বাংলাদেশীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করছে সংঘবদ্ধ চক্র। এ চক্রের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ আছে বাংলাদেশের বড় ব্যবসায়ীদের। বাংলাদেশী প্রবাসীদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থের গন্তব্য আগে সুইজারল্যান্ডসহ ইউরোপ-আমেরিকার দিকে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে দিক পরিবর্তিত হয়েছে। এখন দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থেরও বড় অংশ সিঙ্গাপুরে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) নজরেও রয়েছে বিষয়টি।

 

সূত্র: বণিক বার্তা

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close