আলোচিত

জাতীয় তথ্য সেন্টারে লাইসেন্সবিহীন সফটওয়্যার ব্যবহার করছিল চীনা কোম্পানি

বার্তাবাহক ডেস্ক : ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে সরকার গাজীপুরে যে অত্যাধুনিক জাতীয় তথ্য সেন্টার তৈরি করছে, তাতে লাইসেন্সবিহীন সফটওয়্যার ব্যবহার করছিল চীনা কোম্পানি জেডটিই করপোরেশন। এ অবস্থাতেই প্রায় এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই ফোর টায়ার ডাটা সেন্টারটি বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল কোম্পানিটি। তবে প্রকল্প পরিচালকের সতর্ক দৃষ্টির কারণে শেষ মুহূর্তে এসে বিষয়টি ধরা পড়ে। এর ফলে ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেল বাংলাদেশ। প্রকল্প পরিচালক লাইসেন্সবিহীন সফটওয়্যার ব্যবহারের বিষয়টি চিঠি দিয়ে ঊর্ধ্বতনদের জানিয়ে দেন এবং জেডটিই করপোরেশনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। আগামী মাসেই এই ডাটা সেন্টারের উদ্বোধন করার কথা রয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, এ প্রকল্পের চুক্তিতেই তৃতীয় পক্ষের সফটওয়্যার ব্যবহারের ক্ষেত্রে মূল যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জেডটিইকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তিতে যন্ত্রপাতি সরবরাহের জন্য নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানকে এ ধরনের দায়মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি নজিরবিহীন। চুক্তিতে দায়মুক্তির ব্যবস্থা থাকার কারণেই জেডটিই লাইসেন্সবিহীন সফটওয়্যার ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক আবু সাঈদ চৌধুরী জানান, কারণ দর্শানোর চিঠি পাওয়ার পর এরই মধ্যে জেডটিই লাইসেন্সবিহীন সফটওয়্যারের পরিবর্তে লাইসেন্সসহ অরিজিনাল বা প্রকৃত সফটওয়্যার স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি আরও জানান, প্রকল্প চুক্তি অনুযায়ী সঠিকভাবে বুঝিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত জেডটিইকে বিলও পরিশোধ করা হবে না।

তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ডাটা সেন্টারে লাইসেন্সবিহীন সফটওয়্যার ব্যবহারের বিষয়টি নজরে আসার পরই তিনি এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, কোনো অবস্থাতেই পাইরেটেড বা লাইসেন্সবিহীন সফটওয়্যার গ্রহণ করা হবে না। জেডটিইকে আগামী ১৫ মার্চের মধ্যে কম্পিউটার কাউন্সিলের নামে লাইসেন্স করা আসল সফটওয়্যার ব্যবহার করে সমস্যার সমাধান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে জেডটিই ব্যর্থ হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লাইসেন্সবিহীন সফটওয়্যার ব্যবহার করা হলে এক বছর পরই মূল অপারেটিং সিস্টেমসহ তৃতীয় পক্ষের অন্যান্য সফটওয়্যারের হালনাগাদ নবায়ন সম্ভব হতো না এবং ডাটা সেন্টারটি অচল হয়ে পড়ত। একই সঙ্গে ডাটা সেন্টার থেকে ডাটা চুরির বড় ঝুঁকি থেকে যেত। তথ্য চুরির সন্দেহ থেকে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়াসহ একাধিক দেশ জেডটিইর যন্ত্রপাতি ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে।

প্রকল্প পরিচালকের চিঠিতে যা আছে: গত নভেম্বরে এটিতে সফটওয়্যার বসানোর পরীক্ষায় যান প্রকল্প পরিচালক আবু সাঈদ চৌধুরী। পরীক্ষার সময় বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের প্রকৌশলীরা জানান, জেডটিই যে সফটওয়্যার ব্যবহার করেছে, সেটি বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের নামে লাইসেন্স করা হয়নি। বিষয়টি জানার পর প্রকল্প পরিচালক কম্পিউটার কাউন্সিলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানান এবং একই সঙ্গে জেডটিই করপোরেশনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন।

নোটিশে বলা হয়, জেডটিই করপোরেশনের ব্যবহূত সফটওয়্যারে কম্পিউটার কাউন্সিলের নামে কোনো লাইসেন্স নেই। একই সঙ্গে ব্যবহূত মূল যন্ত্রপাতির বড় অংশই জেডটিইর উৎপাদন করা নয়, বিভিন্ন নির্মাতা কোম্পানির কাছ থেকে কেনা হয়েছে। লাইসেন্স না থাকার ফলে পরবর্তী সময়ে হার্ডওয়্যারের কারিগরি ত্রুটির ক্ষেত্রেও এগুলোর প্রতিস্থাপন কিংবা হালনাগাদ অসম্ভব হয়ে পড়বে। এ ছাড়া অপারেটিং সিস্টেমসহ নিরাপত্তা ও অন্যান্য তৃতীয় পক্ষের সফটওয়্যার সেবা দেওয়া মাইক্রোসফট, ওরাকল কিংবা ডেল কোনো কোম্পানিই কোনো ধরনের হালনাগাদ বা নবায়ন সমস্যা দেবে না।

চিঠিতে আরও বলা হয়, কম্পিউটার কাউন্সিল ডাটা সেন্টারের নামে জেডটিইর যন্ত্রপাতি কেনার কোনো দলিলাদি প্রদর্শন করতে পারেনি। অথচ এ বিষয়টি ওয়ারেন্টি এবং পরবর্তী সময়ে হালনাগাদের জন্য অপরিহার্য ছিল।

দায়মুক্তি দিয়ে চুক্তি জেডটিইর সঙ্গে: অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, প্রকল্পে যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে জেডটিইর সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছে, সেই চুক্তির ১২.৩ অনুচ্ছেদে তৃতীয় পক্ষের সফটওয়্যার ব্যবহারের ক্ষেত্রে জেডটিইকে সম্পূর্ণ দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প পরিচালকের চিঠিতেও এই দায়মুক্তির বিষয় উল্লেখ করে বলা হয়, চুক্তির এই অনুচ্ছেদের ফলে তৃতীয় পক্ষের সফটওয়্যার-সংক্রান্ত কোনো দায়বদ্ধতা যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জেডটিইর নেই। এ অবস্থায় ডাটা সেন্টারের নামে কোনো লাইসেন্স না থাকায় ব্যবহূত সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে কোনো ওয়ারেন্টিও দাবি করতে পারবে না কম্পিউটার কাউন্সিল।

সংশ্নিষ্ট একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, মূল যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে সফটওয়্যার কেনা এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে এ ধরনের দায়মুক্তি নজিরবিহীন। তিনি বলেন, সাধারণ একজন ক্রেতাও যদি একটি কম্পিউটার কেনেন, তাহলেও কম্পিউটার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে সফটওয়্যারের দায়ও নিতে হয়। কেউ ডেলের কাছ থেকে একটি ব্র্যান্ডেড ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ কম্পিউটার কিনলে সেখানে অপারেটিং সিস্টেমসহ তৃতীয় পক্ষের সফটওয়্যারের ওয়ারেন্টির দায় ডেলকেই নিতে হয়। এটাই স্বাভাবিক নিয়ম।

অথচ এত বড় একটি ডাটা সেন্টারের ক্ষেত্রে জেডটিইর সঙ্গে চুক্তিতে বলা হয়েছে, ‘ইকুইপমেন্ট কনট্রাক্ট এক্সপ্রেসলি এক্সকুলুডস থার্ড পার্টি সফটওয়্যার ফ্রম দ্য ওয়ারেন্টি পিরিয়ড।’ এর অর্থ, সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে ওয়ারেন্টি সীমার শুরু থেকেই জেডটিইকে বিশেষভাবে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এটা অস্বাভাবিক। বিশেষজ্ঞদের মত, এটা প্রমাণ করে লাইসেন্সবিহীন সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে অনিয়মের বিষয়টি প্রকল্পের শুরু থেকেই করা হয়েছিল। ফলে এখন লাইসেন্সবিহীন সফটওয়্যার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও জেডটিইকে দায়বদ্ধ করা অনেকটা দুরূহ হয়ে পড়বে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, লাইসেন্সবিহীন সফটওয়্যার ব্যবহার না করা হলে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি থেকে যায়। প্রথমত, বর্তমানে বিভিন্ন সফটওয়্যার নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজনে প্রতিনিয়ত হালনাগাদ হয়, লাইসেন্স না থাকলে এগুলো হালনাগাদ হবে না। পাশাপাশি মাঝেমধ্যেই ব্যবহারজনিত ত্রুটির কারণে সফটওয়্যার ক্র্যাশড বা ভেঙে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রেও বড় সংকট হবে, কারণ লাইসেন্স না থাকলে সফটওয়্যার সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো সমাধান দেবে না। দ্বিতীয়ত, বছর শেষে সফটওয়্যার নবায়ন হবে না। ফলে সে সময় পুরো ডাটা সেন্টারই অচল হয়ে পড়তে পারে। তৃতীয়ত, লাইসেন্সবিহীন সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে তথ্য চুরির বড় ঝুঁকি থেকে যায়। হালনাগাদ না হওয়ার কারণে পুরো ব্যবস্থার নিরাপত্তায় হ্যাকাররা হামলা চালানোর সহজ সুযোগ পেতে পারে।

একনজরে ডাটা সেন্টার: বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ডাটা বা তথ্য সংরক্ষণের বৃহত্তর ও নিরাপদ সুবিধা নিশ্চিত করতে ফোর টায়ার ডাটা সেন্টার প্রকল্পটি নেওয়া হয় ২০১৫ সালে। ব্যয় ধরা হয় এক হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে হার্ডওয়্যারের জন্য এক হাজার কোটি টাকা এবং সফটওয়্যারের জন্য ৫৯৯ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। প্রকল্পটি ২০২০ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

 

সূত্র: সমকাল

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এটাও পড়ুন

Close
Close