আলোচিত

দুইবার বৈধ, দুইবার অবৈধ বলল রাজউক

বার্তাবাহক ডেস্ক : প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ডের শিকার বনানীর এফ আর টাওয়ারটি নিয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অন্তত চারটি চিঠি পাওয়া গেছে। যার দুটিতে তারা ভবনটিকে বৈধ এবং দুটি চিঠিতে একে অবৈধ বলে জানিয়েছে। ২০০৬ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে এই চিঠিগুলো চালাচালি হয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জমির মালিক এবং ভবন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ও ভবনের একাংশের ক্রেতা কাশেম ড্রাইসেলের করা পৃথক দুটি ব্যাংকঋণের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রাজউক দুই রকম প্রতিবেদন দিয়েছে। এর মাধ্যমে ভবনটিকে বৈধ ও অবৈধ ঘোষণা করার বিষয়টি প্রথম প্রকাশ পায়।

নথিপত্র অনুযায়ী, ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে কাশেম ড্রাইসেল ও ভবন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রূপায়ন হাউজিং এস্টেট লিমিটেড একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণের জন্য আবেদন করে। নিয়ম অনুযায়ী এ ক্ষেত্রে ভবনটি যে বৈধ, সে বিষয়ে রাজউক থেকে একটি চিঠি নিতে হয়। ওই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজউকের অনাপত্তিপত্র জমা দিয়ে তারা ভবনটির ২০, ২১ ও ২২ তলা বন্ধক রেখে ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা ঋণ নেয়। রাজউকের এই অনাপত্তিপত্র অনুযায়ী ভবনটি বৈধ।

কিন্তু পরের বছর ২০০৭ সালে জমির মালিক ফারুক ভবনটির ষষ্ঠ তলা বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়ার জন্য রাজউকের কাছে অনাপত্তিপত্র চান। ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে রাজউক চিঠি দিয়ে তাঁকে জানায়, ১৮ তলার অনুমোদন নিয়ে নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন আরও চারতলা বাড়ানো হয়েছে। এমন অবস্থায় ঋণ গ্রহণের আবেদন বিবেচনার সুযোগ নেই।

আবার ২০১৩ সালে রাজউকের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক সংস্থাটির আঞ্চলিক অফিসে একটি চিঠি দেন। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘২৩ তলার বাণিজ্যিক নকশা বিসি (বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন, রাজউক) কমিটি কর্তৃক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে মর্মে পরিলক্ষিত হয়।’

অন্যদিকে কাশেম ড্রাইসেলের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভবনটির ২১, ২২ ও ২৩ তলার নিবন্ধনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রাজউক ২০১৪ সালে এক চিঠি দেয়। তাতে রাজউক জানায়, রাজউকের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ শাখার মতামতের আলোকে ২১, ২২ ও ২৩ তলা হস্তান্তরের আবেদন বিবেচনার সুযোগ নেই। অর্থাৎ এই অংশ অবৈধ।

এমন বিতর্কের মধ্যে বাস্তব অবস্থা জানতে পক্ষ থেকে ভবনের জমির মালিকপক্ষ, নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ও রাজউকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

তিন পক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৮৯ সালে রাজউক থেকে নিলামের মাধ্যমে বনানীর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউর ৩২ নম্বর প্লটটি কিনে নেন প্রকৌশলী এস এম এইচ আই ফারুক। সেখানে ভবন নির্মাণের আবেদন করলে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ১৮ তলা ভবনের নকশার অনুমোদন দেয় রাজউক। নিজের টাকায় ভবনের ভিত্তি (ফাউন্ডেশন) তৈরির কাজ করেন ফারুক। ২০০৩ সালের এপ্রিল মাসে তিনি একটি চুক্তির মাধ্যমে মেসার্স রূপায়ন হাউজিং এস্টেট লিমিটেডকে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগ দেন। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এল এ মুকুল ভবনটি ১৮ তলা থেকে বাড়িয়ে ২৩ তলা করার প্রস্তাব দেন জমির মালিককে। সে অনুযায়ী জমির মালিক ও নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একই বছরের জুলাই মাসে আরেকটি সম্পূরক চুক্তি হয়। ওই চুক্তির ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ভবনটি ১৮ তলা থেকে ২৩ তলা করতে রাজউক ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দপ্তর থেকে অনুমোদন নেওয়ার দায়িত্ব নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের থাকবে। এ ক্ষেত্রে জমির মালিকের কোনো দায় থাকবে না।

২০০৭ সাল নাগাদ ২৩ তলা এফ আর টাওয়ারের নির্মাণকাজ শেষ হয়। ইতিমধ্যে মেসার্স কাশেম ড্রাইসেলের মালিক তাসভিরুল ইসলামের কাছে ২১, ২২ ও ২৩ তলা বিক্রি করে দেয় নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। আর চুক্তি অনুযায়ী ভবনের ৪৫ শতাংশ জমির মালিককে বুঝিয়ে দেয় তারা।

নগর গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, রাজউকের লোকজন জড়িত না থাকলে এ ধরনের অনিয়ম হতে পারে না। বহুদিন ধরেই এই আলোচনা আছে যে, রাজউকের ভেতরে সমস্যা আছে। এখন এর সঙ্গে জড়িত সব পক্ষকেই জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে।

জমির মালিকপক্ষ দাবি করছে, ১৯৯৬ সালে তারা ভবন নির্মাণের জন্য রাজউক থেকে নকশার অনুমোদন নিয়েছিল। সে অনুযায়ী ভবনটি ১৮ তলা হওয়ার কথা। এরপর ভবনটির আর কোনো বৈধ নকশা হয়নি।

২০০৮ সালে জমির মালিক ফারুকের পক্ষ থেকে গুলশান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। তাতে বলা হয়, এফ আর টাওয়ারের নকশায় ব্যত্যয় ঘটিয়ে আরও চারটি ফ্লোর বেশি নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলোকে রাজউক অবৈধ বলে ঘোষণা দিয়েছে। ভবনের আরও নানা অনিয়মের তথ্য জানিয়ে আইনি সহায়তা চান জমির মালিক।

২০১০ সালের মে মাসে রাজউকের তখনকার চেয়ারম্যানকে একটি চিঠি দেন জমির মালিক ফারুক। তিন পাতার ওই চিঠিতে নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ, রাজউকের অবৈধ ঘোষণা করা তিনটি তলা কাশেম ড্রাইসেলের কাছে বিক্রির বিষয়টি জানানোর পাশাপাশি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের বিক্রি করা ফ্লোর কারও নামে নিবন্ধন হয়েছে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়।

ফারুকের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ওই চিঠির পর ৮ বছর পেরিয়ে গেলেও রাজউক এ বিষয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

এই অবস্থায় গত ২৮ মার্চ ভবনটিতে আগুন লাগে এবং ২৬ জন মানুষ মারা যান। আহত হন অন্তত ৭০ জন।

এর আগে ২০০৮ সালের ৩১ আগস্ট এই ভবনের বেসমেন্টে আগুন লেগেছিল। তখন জমির মালিক ফারুকের পক্ষ থেকে গুলশান থানায় একটি জিডি করা হয়। তাতে বলা হয়, চুক্তি অনুযায়ী ভবনটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বেসমেন্টে অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামাদির কোনো ব্যবস্থা রাখেনি। নকশা অনুযায়ী জেনারেটর ও সাবস্টেশনের জন্য নির্ধারিত স্থানটি বিক্রি করে অনিরাপদ ও অরক্ষিত স্থানে এগুলো স্থাপন করা হয়েছে।

এসব বিষয়ে ভবনের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রূপায়নের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এল এ মুকুলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে তাঁর প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, বৈধভাবে রাজউকের অনুমতি নিয়েই ভবনটি ২৩ তলা করা হয়েছে। ২০০৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজউকের বিসি কমিটির সভায় এই অনুমোদন দেওয়া হয়।

অগ্নিকাণ্ডের পর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় রাজউক ও নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আলাদাভাবে নকশা ও কাগজপত্র সংগ্রহ করেছে। রাজউক কমিটিকে ১৮ তলা পর্যন্ত একটি নকশা এবং নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ২৩ তলা পর্যন্ত একটি নকশা সরবরাহ করে। কমিটির সদস্যরা বলছেন, কোন নকশাটি আসল, তা আরও যাচাই-বাছাই ছাড়া তাঁরা বলতে পারছেন না।

সার্বিক বিষয়ে রাজউকের বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুর রহমান বলেন, ‘একবার ভবনটিকে বৈধ এবং আরেকবার অবৈধ ঘোষণা করার বিষয়টি আমিও শুনেছি। এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সব তথ্য বিশ্লেষণ করছে। তদন্তে যে সিদ্ধান্ত আসবে, সে অনুযায়ীই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ২৩ তলা ভবনের নকশা অনুমোদনের কাগজপত্র রাজউকের কাছে আছে কি না, জানতে চাইলে গত বুধবার চেয়ারম্যান বলেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, দুর্নীতিগ্রস্ততা ও রাজনৈতিক তুষ্টতা মুখ্য হলে এমনই হয়। উন্নয়ন অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণের যে বিশাল দায়িত্ব, তা সব সময় এড়িয়ে গেছে রাজউক। ফলে অসংখ্য মৃত্যুকূপের বিপজ্জনক নগরীতে পরিণত হয়েছে ঢাকা।

 

সূত্র: প্রথম আলো

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এটাও পড়ুন

Close
Close