বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

ওয়ালটনকে সুবিধা দিতে ল্যাপটপে আমদানি শুল্ক বাড়ানোর উদ্যোগ!

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বার্তা : স্থানীয় শিল্পের প্রসার, রক্ষা ও দেশীয় ল্যাপটপের উন্নয়নের জন্য সরকার আগামীতে ল্যাপটপে আমদানি শুল্ক আরোপের উদ্যোগ নিতে পারে। এ বিষয়ে যুক্তি দেখানো হচ্ছে, আমদানি শুল্ক বাড়ানো হলে বিদেশি ব্র্যান্ডের ল্যাপটপের দাম বেড়ে যাবে। তখন স্থানীয়ভাবে তৈরি ল্যাপটপ কম দামে কেনা যাবে। এতে করে দেশে তৈরি ল্যাপটপ শিল্পের প্রসার ঘটবে, শিল্পকে রক্ষাও করা হবে। অভিযোগ আছে, দেশীয় ব্র্যান্ড ওয়ালটনকে সুবিধা দিতেই মূলত ল্যাপটপে আমদানি শুল্ক বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

জানা গেছে, বর্তমানে ওয়ালটন ব্র্যান্ডের ল্যাপটপ দেশে তৈরি হচ্ছে। সরকারিভাবে দোয়েল নামের একটি ল্যাপটপ তৈরি হলেও বর্তমানে এর কারখানা সক্রিয় নেই। তবে জুন মাসের মধ্যে দোয়েল ল্যাপটপ আবারও উৎপাদনে আসবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

প্রসঙ্গত, স্যামসাং, হুয়াওয়ে, ডেল, এইচপি ও লেনোভো ব্র্যান্ডকে এ দেশে কারখানা স্থাপনের জন্য গত বছর প্রস্তাব পাঠানো হয়। প্রস্তাবনায় বাংলাদেশে কারখানা করলে ল্যাপটপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকার ও দেশের প্রযুক্তি পণ্য ব্যবসায়ীদের সংগঠন এবং ব্যবসায়ীদের (প্রযুক্তিপণ্য আমদানিকারক, পরিবেশক) কাছ থেকে কী ধরনের সুবিধা পাবে সেসবও উল্লেখ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনেও ব্র্যান্ডগুলোর পক্ষ থেকে কোনও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।

প্রস্তাব পাঠানোর সময় সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়, এসব ব্র্যান্ড বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করলে ১০ বছরের কর অবকাশ সুবিধা, ১০ শতাংশ ক্যাশ ইনসেনটিভও (রফতানিতে আর্থিক প্রণোদনা) পাবে। তবুও কোনও অগ্রগতি হয়নি। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই কারণে শুল্ক আরোপের বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে। শুল্ক বাড়ানো হলে সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ডের ল্যাপটপগুলোই বেশি দাম দিয়ে গ্রাহকদের কিনতে হবে। আর না কিনলে তখন বিকল্প থাকবে দেশে তৈরি ল্যাপটপ।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘আমরা যে অবস্থার মধ্যে আছি, দুই জায়গাতে প্র্যাক্টক্যালি উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করা উচিত। একটা হলো মোবাইল ফোন। আরেকটা হলো ল্যাপটপ। ওয়ালটন তো ল্যাপটপ রফতানি করে। ওয়ালটনের প্রোডাক্ট ইমপ্রেসিভ।’

তিনি বলেন, ‘অনেক ইন্টারন্যাশনাল ব্র্যান্ড আমাদের দেশে আসে না। তাহলে বাইরে থেকে আনার দরকার কী। ওয়ালটনের প্ল্যান্ট এখন সম্পূর্ণ সচল আছে। টেলিফোন শিল্প সংস্থার (টেশিস) প্ল্যান্ট বাই জুন (জুনের মধ্যে) ফুললি অপারেশনাল হবে। আমাদের দেশে চাহিদা ইনফ্যাক্ট মিট করার মতো অবস্থা আমাদেরই হবে। আরও দুই একটা কারখানা… গ্রেট ওয়াল এখানে ইন্টারেস্ট শো করেছে। হুয়াওয়ে কালিয়াকৈরের হাইটেক পার্কে জায়গা নিয়েছে। আমরা স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মধ্যে দিয়ে যখন যাচ্ছি, তখন তা আমাদের সাংঘাতিক রকমের ভ্যালু অ্যাড করছে। ওয়ালটন মোবাইলের ওএস (অপারেটিং সিস্টেম) বানাচ্ছে। তার মানে হচ্ছে, বাইরের প্রতি আমাদের নির্ভরশীলতা একদমই থাকছে না। ফলে এটার ওপরে যদি শুল্ক আরোপ করা হয়, তাহলে তো আমাদের লোকাল ইন্ডাস্ট্রি প্রটেকশন পাবে।’

মাত্র একটা কোম্পানি এখন, ওয়ালটন। আরও দুই-একটা কোম্পানি যদি হতো, তাহলে কি ভালো হোতো না? এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘প্রটেকশন দিতে দোষ কী। আমি তো লোকাল ইন্ডাস্ট্রিগুলোকে প্রটেকশন করছি গায়ের জোরে। আমি বাধ্য করছি মেড ইন বাংলাদেশ প্রোডাক্ট কেনার জন্য। এভাবে বাধ্য করায় অটোমেটিক প্রটেকশন হচ্ছে। কিছুই না … ৫ শতাংশ আছে, ওটাকে ১৫ শতাংশ করে দাও।’

আপনি প্রস্তাব করছেন কত, এমন প্রশ্নের জবাবে মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। আগের অর্থমন্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলেছি। এবার অর্থমন্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলবো। আমি ডিটারমাইন্ড যে এটার ওপর (আমদানি শুল্ক) বাড়ানো উচিত।’

তিনি জানান, এই বাজেট কিংবা পরের বাজেট যেকোনও অবস্থাতেই এটা অনিবার্য (শুল্ক আরোপ) যে, স্থানীয় শিল্পকে রক্ষা করতে হবে। কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ খুঁজে পাই না যে, কী কারণে দেশের বাজার অন্যের জন্য উন্মুক্ত করে দেবো।’

সরকারের এই নীতির বিরোধিতা করেছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. রোকন উজ জামান। তিনি বলেন, ‘সরকারের এই সিদ্ধান্ত (ল্যাপটপ আমদানিতে শুল্ক আরোপ) হবে নীতি বিরুদ্ধ। এই নীতির ফলে একদল লোক টাকা কামাই করবে এবং টাকা তাদের পকেটে চলে যাবে। অন্যদিকে, ক্রেতাদেরকে জোর করে ভালো পণ্যের জন্য উচ্চমূল্যে ল্যাপটপ কিনতে বাধ্য করা হবে। যারা কিনতে পারবেন না, বা সক্ষম হবেন না, তারা দেশে অ্যাসেম্বিলিং হওয়া ল্যাপটপ কিনতে বাধ্য হবেন।’ তার পরামর্শ হলো— ‘এটা না করে বরং এ দেশে শিল্পায়নকে উৎসাহিত করা উচিত। এটা করা সম্ভব হলে বড় বড় নির্মাতারা এখানে কারখানা স্থাপনে আগ্রহী হবেন। তাদেরকে জোর করে এখানে কারখানা করতে বাধ্য করা যাবে না।’

বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি (বিসিএস) মো. শাহিদ উল মুনীর বলেন, ‘আমাদের এখনও সক্ষমতা তৈরি হয়নি। ল্যাপটপের আমদানি শুল্ক এখনই বাড়ানো হলে, তা সরাসরি গ্রাহকের ওপরেই পড়ে। ল্যাপটপের দাম বেড়ে যাবে। অন্যদিকে গ্রে চ্যানেলে (অবৈধ পথে) ল্যাপটপ আসাও বেড়ে যাবে, ফলে সরকার রাজস্ব হারাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সক্ষমতা বাড়ার পরে দাম বাড়ানো হলে কোনও আপত্তি নেই আমাদের।’ এক প্রশ্নের জবাবে বিসিএস সভাপতি বলেন, ‘এখনই দাম বাড়ানো হলে একটি প্রতিষ্ঠান (ওয়ালটন) নিশ্চিতভাবে সুবিধা পাবে। এটা ঠিক হবে না। আরও দুই-একটি প্রতিষ্ঠান ল্যাপটপ তৈরিতে আসুক। তখন আমদানি শুল্ক বাড়ানো হলে বিদেশি ব্র্যান্ডের ল্যাপটপের দাম বেড়ে যাবে। তখন স্থানীয়ভাবে তৈরি ল্যাপটপের চাহিদা বাড়বে এবং বাজার চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব হবে।’

মো. শাহিদ উল মুনীর বলেন, ‘আমরা সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর কাছে বাজেট প্রস্তাবনা পেশ করেছি। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা জানিয়েছি, এখনই আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে ল্যাপটপের দাম না বাড়াতে।

নাম ও পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক ওয়ালটনের সাবেক একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘ওয়ালটন ল্যাপটপের মান ততোটা ভালো নয়। মাদারবোর্ডের অবস্থা বেশ খারাপ। এছাড়া, এর বিক্রয় পরবর্তী সেবার মানও খারাপ। প্রায়ই ক্রেতাদের সঙ্গে ঝগড়া হতো। এসব কারণে আমি ওয়ালটনের চাকরি ছেড়ে দিই।’ তিনি একটি দায়িত্বশীল পদে ছিলেন বলে জানান।

তিনি আরও জানান, গ্রাহকদের সফটওয়্যার সংক্রান্ত কোনও সমস্যা হলে তাৎক্ষণিকভাবে ল্যাপটপ মেরামত করে দেওয়া হতো। কিন্তু হার্ডওয়্যার সংক্রান্ত কিছু হলে অনেক সময় লাগতো। গ্রাহকরা এটা মানতে চাইতো না। এসব সমস্যার কারণে ওখানে আমার পক্ষে বেশিদিন চাকরি করা সম্ভব হয়নি।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বিসিএস কম্পিউটার সিটিতে রয়েছে ওয়ালটন আইটি পণ্যর একমাত্র শো-রুম। সেখানে ল্যাপটপও বিক্রি হয়। প্রতিষ্ঠানটির শাখা প্রধান রাজীব হোসাইন খান বলেন, ‘প্রতিমাসে এই শাখা থেকে ৬৫-৭০টা ল্যাপটপ বিক্রি হয়।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক, দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত নিয়ে নিয়ে গবেষণা করেন, ডেভেলপমেন্টের কাজ করেন, এমন অন্তত চার জনের সঙ্গে কথা বলেও ওয়ালটন ল্যাপটপ এবং এর মানের বিষয়ে কোনও ধারণা পাওয়া গেলো না। তারা ওয়ালটনের ল্যাপটপ ব্যবহার করেননি বলে জানান। এমনকী কেউ ব্যবহার করছে এমন তথ্যও তারা জানাতে পারেননি।

উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালে কম্পিউটার ও কম্পি্উটার যন্ত্রাংশের ওপর থেকে কর প্রত্যাহার করা হয়। তারপর থেকে এপর্যন্ত প্রযুক্তিপ্রেমীরা করমুক্ত কম্পিউটার ক্রয় করতে পারছেন।

 

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close