আলোচিত

হত্যায় জড়িত ‘প্রভাবশালী’, তাই পাঁচ বছরেও শেষ হচ্ছে না ব্যবসায়ী কৃষ্ণ হত্যা মামলার তদন্ত!

বার্তাবাহক ডেস্ক : ‘প্রায় সাড়ে ৫ বছর সময় নিয়ে তদন্ত চালিয়েও গাজীপুরের কালীগঞ্জের ব্যবসায়ী কৃষ্ণচন্দ্র দাস হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি পুলিশ’।

২০১৪ সালের ৩১ জানুয়ারি রাতে কালীগঞ্জ পৌরসভার মনসাতলা এলাকায় মদ্যপ বন্ধুদের হাতে খুন হন কৃষ্ণচন্দ্র দাস। সেই হিসেবে ১৩ জুন ২০১৯ (বৃহস্পতিবার) হত্যাকাণ্ডের ৫ বছর ১৩৩ দিন অতিবাহিত হচ্ছে।

‘এখন পর্যন্ত মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছে ছয়জন, কিন্তুু হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ প্রায় সাড়ে ৫ বছর হলেও এখনো রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি তদন্ত কর্মকর্তা তথা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী’।

তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বিগত ‘পাঁচ বছরে আদালত ২১ বার তারিখ নির্ধারণ করলেও বার বার সময় চেয়েছে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, কিন্তু প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি’। আগামী ২০ জুন তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য পরবর্তী তারিখ ধার্য করেছে আদালত। এছাড়াও এজাহারভুক্ত সকল আসামি বর্তমানে জামিনে কারামুক্ত রয়েছে।

মামলাটি শুরুতে কালীগঞ্জ থানা পুলিশের হাতে থাকলেও ২০১৮ সালের ২ জানুয়ারি থেকে বর্তমানে তদন্তের দায়িত্বে রয়েছে গাজীপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশ(ডিবি)।

নিহত কৃষ্ণচন্দ্র দাস কালীগঞ্জ বাজারের মুদি মনোহরী ব্যবসায়ী গৌরচন্দ্র দাসের ছেলে। কৃষ্ণচন্দ্র দাস কালীগঞ্জ বাজারে বিভিন্ন আইটেমের কসমেটিকস ও সাজসামগ্রী পণ্যের ব্যবসা করতেন।

এজাহারভুক্ত ‘দুই আসামির আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ওঠে এসেছে কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও পৌরসভার কাউন্সিলর প্রভাবশালী নেতা পরিমলচন্দ্র ঘোষ হত্যাকাণ্ডের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিতি ছিল এবং ঘটনায় তার জড়িত থাকার সংশ্লিষ্টতা থাকার তথ্য’।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় অনেকেই জানান, ‘স্থানীয় প্রভাব এবং পরিমলের সংশ্লিষ্টতায় দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে এ মামলার তদন্ত। এছাড়াও পরিমলচন্দ্র ঘোষকে এখন পর্যন্ত আইনের আওতায় আনা হয়নি। তাকে আইনের আওতায় আনলে হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদঘাটন করতে পারতো পুলিশ’।

পূর্বের তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, মদ্যপ বন্ধুরা কৃষ্ণকে হত্যা করেছে। আর এ ঘটনার সঙ্গে কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও পৌরসভার কাউন্সিলর পরিমলচন্দ্র ঘোষ জড়িত। তবে মামলার বাদী কৃষ্ণের বাবা এজাহারে পরিমলের নাম অন্তর্ভুক্ত করেননি। যদিও দুই আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ওঠে এসেছে ঘটনাস্থলে পরিমল ছিলেন।

এর আগে এই মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কয়েজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, এ ঘটনার সঙ্গে ‘কাউন্সিলর পরিমল জড়িত থাকলেও স্থানীয় প্রভাবের কারণে তাকে এখনও আইনের আওতায় আনা যায়নি। বাদী গৌরচন্দ্র দাসও জানতেন হত্যাকাণ্ডের সময় ঘটনাস্থলে পরিমল ছিলেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তিনি এজাহারে তার নাম দেননি’।

এক তদন্ত কর্মকর্তা জানান, এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি কী কারণে কৃষ্ণকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী পাওয়া যাচ্ছে না। তবে এটা নিশ্চিত কৃষ্ণের মাথায় কেউ আঘাত করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, রণজিৎ উত্তেজিত হয়ে কৃষ্ণের মাথায় আঘাত করেছে। তাকে এখনও গ্রেফতার করা যায়নি। তিনি বলেন, কাউন্সিলর পরিমলকে কেন আসামি করা হয়নি তা রহস্যজনক।

দুই আসামির স্বীকারোক্তি : স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ধ্রুবজিৎ বলেন, রাত সাড়ে ১০টার দিকে বাড়ি থেকে ২০-৩০ ফুট দূরে কয়েকজন মাতালের হট্টগোল শুনতে পান। কণ্ঠ শুনেই তিনি তাদের চিনতে পারেন। তিনি বলেন, সেখানে রণজিৎ, কাউন্সিলর পরিমল, উত্তম, খসরু, মেহেন্দী, উত্তম ও কৃষ্ণ ছিল। তিনি আরও বলেন, পুকুর ঘাটে প্রায়ই মদ খেয়ে তারা হট্টগোল করত। রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার দিকে হট্টগোল আরও বেড়ে যায়। তখন বিষয়টি তার কাছে সন্দেহজনক মনে হয়। তিনি বের হতে চাইলে তার স্ত্রী বাধা দেন। তবে কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করেই হট্টগোল থেমে যায়। এরপর তার সামনে দিয়ে একটা লোক দৌড়ে যায়। লোকটি রণজিৎ ছিল তিনি তা বুঝতে পারেন।

স্বীকারোক্তিতে উত্তম জানায়, ঘটনার দিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে দিলীপের সঙ্গে তিনি ঘটনাস্থলে যান। সেখানে তিনি কৃষ্ণ, পরিমল, খসরু ও রণজিৎকে দেখতে পান। পরিমলের সঙ্গে তার কথা হয়। এরপর তারা দু’জনেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।

মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, ২০১৪ সালের ৩১ জানুয়ারি রাতে কালীগঞ্জ পৌরসভার মনসাতলা এলাকায় কৃষ্ণ খুন হন। এলাকার ক্ষেত্রমোহন দাসের পুকুর পাড়ে বসে একসঙ্গে মদ পান করেন কৃষ্ণ, কাউন্সিলর পরিমল, রণজিৎ চন্দ্র দাস, খসরু, দিলীপ চন্দ্র দাস (চান্দাইয়ার দিলীপ), দিলীপ চন্দ্র দাস (মুনসুরপুরের দিলীপ), উত্তমচন্দ্র দাস ও ধ্রুবজিৎ ঘোষ। এ সময় নিজেদের মধ্যে হট্টগোল হয়। এক পর্যায়ে কেউ কৃষ্ণের মাথায় শক্ত কিছু দিয়ে আঘাত করে। পরে তাকে পুকুরে ফেলে দেয়া হয়। পরদিন পুকুর থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় কৃষ্ণের বাবা প্রথমে অজ্ঞাতদের আসামি করে মামলা করেন। ঘটনার চার মাস পর সম্পূরক এজাহারে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করেন। সেখানে পরিমল ও খসরুর নাম ছিল না। তবে তিনি বলেন, অজ্ঞাত আরও কয়েকজন জড়িত থাকতে পারে।

নিহত কৃষ্ণচন্দ্র দাসের স্বজনরা বলেন, দুই আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার পর জানতে পেরেছি কাউন্সিলর পরিমল ঘটনাস্থলে ছিলেন। আমরা চাই সঠিক তদন্ত করে জড়িতদের দ্রুত যেন বিচারের মুখোমুখি করা হয়।

তদন্ত দীর্ঘায়িত এবং আসামীদের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে ওঠে আসা পরিমলচন্দ্র ঘোষের বিষয়ে মামলার সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা গাজীপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক মোহাম্মদ আক্তার হোসেন বলেন, ‘কৃষ্ণ হত্যা মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি’। মামলার তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে, এই বিষয়ে এর চেয়ে বেশি আর কিছু বলা যাচ্ছে না। ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়েই তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে যাদের নাম আসবে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।

আইনজ্ঞদের মতে, আইন অনুযায়ী তদন্ত কর্মকর্তা বারবার আদালত থেকে সময় নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই বলে এমন একটি হত্যাকাণ্ড নিয়ে গড়িমসি? হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে যদি কোনো সমস্যা থেকে থাকে তাহলে কেন তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হচ্ছে না তার একটি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা থাকা দরকার। কর্তৃপক্ষকে এমন একটি ব্যাখ্যা দিতে হবে, যা গ্রহণযোগ্য হতে হবে। এমন একটি স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ডের তদন্ত সঠিকভাবে হচ্ছে কি না, সঠিক পথে তদন্ত কর্মকর্তা চলছেন কি না, তা তদারকির জন্য, দেখার জন্য তদারকি কর্মকর্তা বা কর্তৃপক্ষ থাকা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে (কৃষ্ণ হত্যাকাণ্ড) আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে ব্যর্থতার কারণেই এমন প্রশ্ন আসতে পারে।

যেকোনো ফৌজদারি মামলায় তদন্ত শেষে চার্জশিট বা অভিযোগপত্র ও ফাইনাল রিপোর্ট বা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার বিধান রয়েছে। এ ছাড়া সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়ার বিধান রয়েছে। একবার তদন্ত শেষ হলে অধিকতর তদন্ত করারও সুযোগ রয়েছে আইনে। মামলায় কোনো নতুন আসামির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার সুযোগ রয়েছে। আইনে এই সুযোগ থাকার পরও কেন কৃষ্ণ হত্যা মামলায় আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হচ্ছে না, তা বোধগম্য নয়। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ না হলে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া সম্ভব নয়—এমন কথা বলতে পারেন তদন্ত কর্মকর্তা। কিন্তু আইনে যেখানে অধিকতর তদন্তের সুযোগ রয়েছে, সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেখানে সাড়ে পাঁছ বছরেও তদন্ত শেষ না করার কোনো যুক্তি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close