আইন-আদালতআলোচিততথ্য প্রযুক্তিবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

সাইবার অপরাধীদের শনাক্ত করতে বেগ পেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর

বার্তাবাহক ডেস্ক : অনলাইনে জঙ্গি কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে প্রতারণাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত অন্তত ২৩০ অপরাধীকে শনাক্ত করতে পারছে না পুলিশ। এক বছর ধরে পুলিশের নজরদারি শুরুর পরও নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে তারা। তবে তাদের শনাক্ত কিংবা গ্রেপ্তার কোনোটিই সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও দমনে যুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা। তারা জানান, মোবাইল ফোন অপারেটররা পুরনো ভার্সনের ইন্টারনেট প্রটোকল (আইপি) ব্যবহার করার ফলে সাইবার অপরাধীদের শনাক্ত করতে বেগ পেতে হচ্ছে। এরই মধ্যে অপারেটরদের সঙ্গে বৈঠক করে নতুন ভার্সনের আইপি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (এনটিএমসি) পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জিয়াউল আহসান বলেন, ‘সাইবার অপরাধী সহজেই শনাক্তকরণের জন্য ভি সিক্স ভার্সনের আইপি ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে। এটি করা গেলে অদূর ভবিষ্যতে সাইবার স্পেসে সক্রিয় অপরাধী ধরা যেমন সহজ হবে, তেমনি অপরাধ তৎপরতাও কমে যাবে।’

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘মোবাইল ফোন অপারেটরদের সরবরাহ করা তথ্যের জটিলতার কারণে সাইবার অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে সমস্যা হচ্ছে। কারণ মোবাইল ফোন অপারেটরদের একটি আইপির মাধ্যমে অসংখ্য ইউজার সক্রিয়। এতে প্রকৃত আসামিকে শনাক্ত করা যায় না। এভাবে গত এক বছরে সিটিটিসির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগ অন্তত ২৩০ সাইবার অপরাধী শনাক্ত করতে পারেনি, যাদের সবার আইপি সরবরাহ করা হয়েছিল দেশের বিভিন্ন মোবাইল ফোন অপারেটরের কাছে। কিন্তু তারা কোনো অপরাধীর নির্দিষ্ট পরিচয়সূচক আইপি নম্বর বা অন্য কোনো পরিচয়সূচক নম্বর সরবরাহ করতে পারেনি। এ কারণে আমাদের পক্ষে ওই সব আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।’

সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের অপর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি অপরাধী বাংলালিংকের নম্বর ব্যবহার করে তাদের ফেসবুক আইডি খুলে থাকে। এ ছাড়া গ্রামীণসহ অন্যান্য মোবাইল ফোন কোম্পানির সিম ব্যবহার করে থাকে এই অপরাধীরা।’

সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে মোবাইল ফোন অপারেটরদের নিয়ে বৈঠক করেছেন পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। বৈঠকে তারা মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট অপরাধীর নির্দিষ্ট তথ্য চেয়েছেন। ওই বৈঠকে অংশ নেওয়া পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘মোবাইল ফোন অপারেটররা তাদের সীমাবদ্ধতার কথা বলেছেন। কারণ বর্তমানে তারা যে ধরনের প্রযুক্তি (ভি-ফোর ভার্সনের আইপি) ব্যবহার করছেন, সেই প্রযুক্তিতে একটি আইপির বিপরীতে হাজার হাজার ব্যবহারকারী থাকেন। এতে মূল অপরাধীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। এ ছাড়া আসামির নির্ধারিত সময়ের বিভিন্ন সেশনের তথ্য চাওয়া হলেও তারা একইভাবে নানা কৌশলে এড়িয়ে যান। এতে আসামি শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে ভি-ফোর ভার্সনের আইপি ব্যবহারের ফলে এই জটিলতা তৈরি হয়েছে। আপগ্রেড ভার্সনের আইপি, যেমন ভি-ফাইভ ব্যবহার করলে একটি আইপির বিপরীতে অল্পসংখ্যক ব্যবহারকারী থাকে বলে সহজেই মূল অপরাধীর পরিচয় শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া ভি-সিক্স ভার্সনের আইপিতে একজন ইউজারের একটিমাত্র আইপি থাকে। এটি বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে ব্যবহার হয়ে থাকে।’

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, ফেইসবুকের কাছে জঙ্গিদের বিষয়ে তথ্য চাইলে তারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে তথ্য সরবরাহ করে না। তাদের অ্যাকাউন্ট বা গ্রুপ বন্ধও করে না।

পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘মোবাইল ফোন অপারেটররা বিদেশি ভেন্ডরদের মাধ্যমে বর্তমানে ভি-ফোর ভার্সনের আইপি ব্যবহার করছে। এসব আইপি সীমিত হওয়ায় মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানিগুলোর একটি আইপির বিপরীতে হাজার হাজার মানুষ ফেইসবুক ব্যবহার করে থাকেন।’

এনটিএমসির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জিয়াউল আহসান বলেন, ‘সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও অপরাধী শনাক্ত করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ হতে হবে। যদিও আমাদের বেশির ভাগ থানা পুলিশ এসবের কিছুই জানে না।’

সিআইডির সাইবার বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অপরাধীর বিষয়ে যখন মোবাইল অপারেটর কর্র্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়, তখন তার পরিচায়ক সূত্র হিসেবে সংশ্লিষ্ট আইপি সরবরাহ করা হয়। কিন্তু একটি আইপির বিপরীতে হাজার হাজার ব্যবহারকারী থাকায় সংশ্লিষ্ট অপরাধী শনাক্ত করা তাদের পক্ষে জটিল হয়ে পড়ে। এতে অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।’

সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার নাজমুল হোসেন বলেন, ‘আসামিদের গ্রেপ্তার করার জন্য বিভিন্ন কৌশলে তাদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সময়মতো তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।’

পুলিশ সদর দপ্তরের সাইবার ক্রাইম বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অ্যানক্রিপ্টেড কনভার্সন (ভেতরকার আলাপ) কখনো অন্য কেউ বের করতে পারে না, ফেইসবুক কর্র্তৃপক্ষ ছাড়া। আবার ফেইসবুক যদি ওই তথ্য স্টোর না করে, তারাও পাবে না। ২০১৫ সালে এনটিএমসি ভি-সিক্স ভার্সনের আইপি ব্যবহারের জন্য সুপারিশ করেছিল বিটিআরসির কাছে। বিটিআরসি সেই বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করেছে।’

 

সূত্র: দেশ রূপান্তর

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এটাও পড়ুন

Close
Close