আলোচিত

নানারকম অব্যবস্থাপনায় মাঠ প্রশাসনে বিশৃঙ্খল অবস্থা

বার্তাবাহক ডেস্ক : নানারকম অব্যবস্থাপনায় মাঠ প্রশাসনে বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে। কেউ ফেইসবুকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে বিষোদগার করছেন। কেউবা সরকারি টাকা কোষাগারে জমা না করে অধস্তনদের পকেটে রেখে দিচ্ছেন। এতসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে জামালপুরের ডেপুটি কমিশনারের (ডিসি) বিরুদ্ধে নারী অফিস সহকারীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ আচরণের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।

এসব অভিযোগের মধ্যে সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তাকে মেয়াদ পূর্তির আগেই প্রত্যাহার করা হচ্ছে। তাদের ওএসডি করা ছাড়াও কর্মকর্তাদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বন্ধ রাখাসহ তিরস্কারসূচক বিভিন্ন দন্ড দেওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

অফিস সহকারীর সঙ্গে অশালীন মেলামেশার কারণে জামালপুর থেকে প্রত্যাহারকৃত আহমেদ কবীরকে ডিসি করতে ভূমিকা রেখেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে সরকারের গত মেয়াদের এক প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে। আহমেদ কবীর ওই প্রতিমন্ত্রীর যশোর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ছিলেন। এই পদে থাকার সময়ই তিনি প্রতিমন্ত্রীর আস্থাভাজন হয়েছিলেন। সিইও থেকে ২০১৭ সালের ৮ মে তাকে জামালপুরের ডিসি করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, ডিসি ফিটলিস্টে নাম না থাকার পরও প্রতিমন্ত্রী তার প্রভাব খাটিয়ে ডিসি করেছিলেন আহমেদ কবীরকে। বিষয়টি নিয়ে সেই সময় প্রশাসনের সিনিয়র কর্মকর্তারা অস্বস্তির মধ্যে পড়েছিলেন। আহমেদ কবীরকে একটি একক আদেশে ২০১৭ সালের ৮ মে ডিসি পদে নিয়োগ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেছেন, ফিটলিস্টে নাম না থাকার বিষয়টি তদন্ত করা হবে। তদন্তে আহমেদ কবীরের বিষয়গুলো ছাড়াও কার ফেইসবুক আইডি থেকে ভিডিওটি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তা খতিয়ে দেখা হবে। প্রমাণ হলে ডিসির বিরুদ্ধে যেমন বিভাগীয় মামলা হবে ঠিক তেমনি তথ্যপ্রযুক্তি আইনে ভিডিও ফাঁসকারীর বিরুদ্ধেও আইসিটি অ্যাক্টে মামলা হবে। কারণ ভিডিও ফাঁসকারী সরকারের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করেছেন।

জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পাস করা আহমেদ কবীর ১৮তম বিসিএসের কর্মকর্তা। যশোর জেলা পরিষদের সিইও পদে নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি স্থানীয় সরকার বিভাগ, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের উপসচিব, পঞ্চগড়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক এবং একই জেলার এডিসি ছিলেন। তিনি বগুড়ার সোনাতলা, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী ও রৌমারীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

গত রবিবার জামালপুরের ডিসি আহমেদ কবীরের সঙ্গে আলাদা আলাদা প্রজ্ঞাপনে চুয়াডাঙ্গা ও খাগড়াছড়ির ডিসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। চুয়াডাঙ্গার ডিসি গোপাল চন্দ্র দাসকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে উপসচিব পদে বদলি করা হয়েছে। খাগড়াছড়ির ডিসি মো. শহীদুল ইসলামকে বদলি করা হয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পদে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডিসিদের কার্যক্রম নিয়মিত মনিটরিং করা হয়। গত ষাণসিক প্রতিবেদনে এই দুই ডিসির কার্যক্রমের পর্যবেক্ষণ আশানুরূপ ছিল না। তখনই তাদের প্রত্যাহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু ওই সময়ই প্রত্যাহার করা হলে ডিসি পদে যোগ দিতে না দিতেই প্রত্যাহারের খবরে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার

সৃষ্টি হতে পারত। এ কারণে সেই সময় তাদের প্রত্যাহার করা হয়নি। গোপাল চন্দ্র দাস চুয়াডাঙ্গার ডিসি হওয়ার আগে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ছিলেন। তার ডিসি হওয়ার আদেশ জারি হয়েছিল গত বছর ২৩ সেপ্টেম্বর। তিনি ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ১১ মাস। আর শহীদুল ইসলাম ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ১৩ মাস। সাধারণত ডিসিকে দুই থেকে তিন বছর জেলায় রাখা হয়। যেসব ডিসি ভালো পারফরম্যান্স দেখান তাদের সাধারণত এক জেলা থেকে আরেক জেলায় বদলি করা হয়। অনেক ডিসিকে যুগ্ম সচিব হওয়ার পূর্বপর্যন্ত ডিসি পদে বহাল রাখা হয়। কিন্তু গোপাল চন্দ্র দাস ও শহীদুল ইসলামকে অনেক আগেই প্রত্যাহার করা হয়।

সরকারি নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করার অভিযোগে বিভাগীয় মামলায় দিনাজপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. জয়নুল আবেদীনের এক বছর বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখার দণ্ড দিয়েছে সরকার। গত ১ আগস্ট এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কর্মকর্তারা বলছেন, জয়নুল অবেদীন পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালীর ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করেছিলেন। গুচ্ছগ্রামের ঘরগুলো নির্ধারিত মাপের টিন ও লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে নির্মাণ করা হয়নি। কিছু ঘরের মেঝেতে মাটি দেওয়া হয়নি। জয়নুল আবেদীন প্রকল্পের কাজ সঠিকভাবে তদারকি করেননি এবং বিধিবহির্ভূতভাবে প্রকল্পের পাঁচটি চেকের টাকা নিজের নামে উত্তোলন করেছিলেন। এসব অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার পরও তাকে ‘লঘুদন্ড ’ দেওয়া হয়।

মাঠপ্রশাসনের কর্মকর্তারা নিজ নামে এবং অফিসের পদবি ব্যবহার করে ফেইসবুক ব্যবহার করতে পারেন। এসব ফেইসবুক আইডিতে সরকারি উন্নয়নমূলক কর্মকা- প্রচারের কথা থাকলেও তারা অনেকেই ফেইসবুককে নিজেদের প্রচারের কাজে ব্যবহার করেন। এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর অ্যাসাইনমেন্ট অফিসার শিলু রায়ের বিরুদ্ধে নরসিংদীর শিবপুরের ইউএনও থাকার সময় তার ব্যক্তিগত ফেইসবুক থেকে ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সম্পর্কে মিথ্যা স্ট্যাটাস দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অসদাচরণের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা করে ব্যক্তিগত কৈফিয়ত তলব করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ব্যক্তিগত শুনানিতে তিনি কোনো ভুল হয়ে থাকলে তা একান্তই অনিচ্ছাকৃত উল্লেখ করে অভিযোগ থেকে অব্যাহতির জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চান। স্বেচ্ছায় দোষ শিকার করায় তাকে তিরস্কারসূচক লঘুদ- দেয় সরকার। গত ৩০ জুলাই এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

দিনাজপুর সদরের ইউএনও মো. ফিরুজুল ইসলাম বগুড়ার শেরপুরের এসি ল্যান্ড থাকার সময় তার বিরুদ্ধে সরকারি ফি ডিসিআরের মাধ্যমে আদায় না করায় ১২ লাখ ৯৭ হাজার ২০০ টাকা অনাদায়ী থাকার অডিট আপত্তি ওঠে। বগুড়ার এডিসির সরেজমিন তদন্তে ৬ লাখ ৯৭ হাজার ১৮৫ টাকা অনাদায়ী থাকার অভিযোগ প্রমাণ হয়। ওই অফিসের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ডিসিআরেরর মাধ্যমে আদায়কৃত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাতের জন্য নিজের কাছে রেখে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ফিরুজুল ইসলামের বিরুদ্ধে শেরপুরে তার শেষ কর্মদিবসে ৫০৯টি ডিসিআরের মাধ্যমে ব্যাংকে জমাকৃত অর্থ ও আদায়কৃত অর্থের অমিলের অভিযোগ উঠেছে। রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনারের প্রতিবেদনে এসব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতার কথা রয়েছে। গত ৩ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে বগুড়ার ডিসির কাছে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা জানতে চাওয়া হয়েছে।

সরকারের অনেক কর্মকর্তা ছুটি নিয়ে বিদেশে পড়তে যান। সরকারও জুনিয়র কর্মকর্তাদের বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার বিষয়ে উৎসাহ দেয়। বেশিরভাগ কর্মকর্তাই চাকরিতে ঢুকেই বা মাঠপর্যায়ে কর্মরত থাকার অবস্থায় বিদেশ পড়তে যান। শিক্ষা ছুটি নিয়ে বিদেশে যাওয়া এসব কর্মকর্তার দেশে না ফেরার অভিযোগ বেড়েছে। বিষয়টি মাঠপ্রশাসনে এক ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। সহকারী সচিব ঊর্মি বড়ুয়াকে উচ্চশিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়া গিয়ে আর দেশে না ফেরার অভিযোগে চাকরিচ্যুত করা হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গত ১৩ জুন ঊর্মি বড়ুয়ার বিরুদ্ধে চাকরি হতে বরখাস্ত করার গুরুদ- দেওয়ার প্রজ্ঞাপন জারি করে।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেছেন, ‘ঘটনাগুলো দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত। এসব ঘটনা সমর্থনযোগ্য নয়। তবে মাঠপ্রশাসন বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নয়। গোটা দেশের শাসনব্যবস্থার ছাপ মাঠ প্রশাসনে পড়বে এটাই স্বাভাবিক। তবে এসব বিষয়ে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’

 

সূত্র: দেশ রূপান্তর

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close