আলোচিত

অস্তিত্বহীন নদী বাঁচানোর ভুয়া প্রকল্পে পাঁচ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের পাঁয়তারা!

বার্তাবাহক ডেস্ক : মরা বা আধামরা নদীর নাব্য ফেরাতে, খনন, তীররক্ষা ও তীর সংরক্ষণের নামে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) অসংখ্য প্রকল্প চলমান।

এ কাজের সুবাদে এক শ্রেণির অসাধু চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। তার পরও জিনাই, ঘাঘট, বংশী ও বাগদা নদীর প্রবাহ পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ নিয়েছে।

প্রকল্প এলাকা হিসেবে অন্য উপজেলার সঙ্গে ময়মনসিংহের গফরগাঁও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু ওই চার নদীর কোনো অস্তিত্ব বা প্রবাহ নেই গফরগাঁওয়ের ভেতর দিয়ে। তারপরও প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

২০২৪ সালে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বিআইডব্লিউটিএ।

তা যাচাই করতে সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিভিন্ন অঙ্গে অসঙ্গতি ধরা পড়ায় আপত্তি করে বলা হয়— সম্পূর্ণ সরকারি অর্থে এত বড় প্রকল্প গ্রহণ করা মোটেই ঠিক হয়নি।

কনসালটেন্সির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, অসংখ্য সরকারি ড্রেজিং থাকার পরও বেসরকারি লোকদের জন্য বেশি দামে ড্রেজিং রেট কেন? এটা প্রতি ঘনমিটারে ৭০ টাকা বেশি।

এ খাতে ব্যয় হবে আড়াই হাজার কোটি টাকারও বেশি। ডাইক নির্মাণেও অন্যান্য প্রকল্পের তুলনায় প্রতি ঘনমিটারে বেশি ধরা হয়েছে ৫৮ টাকা। তাতে ১৪০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এভাবে প্রতিটা অঙ্গে অযৌক্তিক ব্যয় প্রাক্কলন করেছে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়।

এসব ব্যাপারে মতামত জানতে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের বিআইডব্লিউর পরিকল্পনা বিভাগ প্রধান ও পরিচালক জাভেদ আনোয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ব্যস্ত থাকায় কথা বলা সম্ভব হয়নি।

যুগ্ম পরিচালক এ কে এম মুজিবুর রহমানের সঙ্গে কথা হলেও তিনি কোনো ব্যাখা দিতে পারেননি। অস্তিত্বহীন নদী দেখানো হয়েছে— এটা কি ইচ্ছাকৃত ভুল, না টাকা তুলে নেয়ার কৌশল; এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, কিভাবে ভুল হয়েছে তা ডিপিপি না দেখে বলা যাবে না।

তিনি বলেন, এটার সঙ্গে আরেক যুগ্ম পরিচালক মুহাম্মদ মহিউদ্দিন চৌধুরী জড়িত। তিনিই বিস্তারিত বলতে পারবেন। তাই মহিউদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হলেও টেকনিক্যাল ব্যাপার ড্রেজিং বিভাগ দেখে থাকে। পরিকল্পনা বিভাগ শুধু ফরমেটে ফেলে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করে।

এরপর সচিবসহ অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের সই হওয়ার পরই অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। কাজেই আমার দায় সে রকম নেই বলেও জানান তিনি।

এ ব্যাপারে নৌ-সচিব মো. আবদুস সামাদ বলেন, আমার জানামতে গফরগাঁওয়ে এই চার নদীর অস্তিত্ব নেই। ভুলক্রমে অফিসাররা হয়তো তালিকাভূক্ত করেছে। আপনার সই ছাড়া কোনো ডিপিপি হয় না, তারপরও কেন ভুল, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, অনেকদিন আগের কথা, তাই হয়তো মনে নেই।

বাস্তবে না থাকলেও কিভাবে নদীর নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে পরিকল্পনা কমিশনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ডিপিপির সব কিছু দেখেশোনে ব্যয় কম-বেশি যাচাই করা হয়। চলমান প্রকল্পের চেয়ে বেশি মনে হলে কমিয়ে দেয়া হয় ব্যয়। তবে প্রকল্প এলাকা কী কী হবে তা জানার জন্য ম্যাপ চাওয়া হয়।

অনুষ্ঠিত পিইসি সভায় এ প্রকল্পেও ম্যাপ চাওয়া হয়েছে। সংশোধিত ডিপিপিতে তা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, আসলে কোথায় প্রকল্প হচ্ছে তা দেখেই পিইসি সভা করা দরকার।

তবেই বিভিন্ন সংস্থার অস্তিত্বহীন প্রকল্প ধরা সম্ভব। নকশা থাকলে এটা সহজে ধরা পড়ে। অনেক মন্ত্রণালয় ডিপিপিতে নকশা দেয় না। তাই সংশোধিত ডিপিপিতে তা চাওয়া হয়।

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে প্রকল্পের সব কিছু দেখে অনুমোদন দেয়া হয়। কাজেই অস্বিত্বহীন প্রকল্প অনুমোদন হতে পারে না। তথ্য-প্রমাণ পেলে তা অবশ্যই বাতিল করা হবে।

নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য সূত্র জানায়, ‘জিনাই, ঘাঘট, বংশী ও বাগদা নদীর প্রবাহ পুনরুদ্ধারের জন্য শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ নিশ্চিতকরণ, নৌ-পথের উন্নয়ন ও বন্যা ব্যবস্থাপনা : শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থে এতে ব্যয় ধরা হয়েছে চার হাজার ৭৮৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা। প্রকল্প এলাকা ধরা হয়েছে রংপুর, ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের ১০ জেলার ৩২টি উপজেলা। এর মধ্যে রংপুর জেলা সদর, মিঠাপুকুর, পীরগাছা ও গঙ্গাচড়া উপজেলা ধরা হয়েছে। গাইবান্ধা জেলা সদর, সাদুল্লাহপুর, ফুলছড়ি ও সুন্দরগঞ্জ। নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ ও জলঢাকা উপজেলা।

ঢাকা জেলার সাভার, কেরানীগঞ্জ ও ধামরাই রয়েছে। গাজীপুরের কালিয়াকৈর, শ্রীপুর, কাপাসিয়া ও কালিগঞ্জ। মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর। জামালপুর সদর, সরিষাবাড়ী, মেলান্দহ ও মাদারগঞ্জ।

টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর, ঘাটাইল, কালিহাতী, বাসাইল, সখীপুর, মির্জাপুর, গোপালপুর ও ভুয়াপুর উপজেলা এবং শেরপুর সদর উপজেলাও রয়েছে। এ ছাড়া ময়মনসিং জেলার গফরগাঁও উপজেলাও তালিকাভূক্ত করা হয়েছে প্রকল্প এলাকায়।

গফরগাঁও উপজেলার সাধারণ তথ্যসম্বলিত পরিসংখ্যান, উইকিপিডিয়াসহ বিভিন্ন জায়গায় অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ওই চারটি নদী কম-বেশি প্রবাহিত হয়েছে।

কিন্তু গফরগাঁয়ের ওপর দিয়ে এর কোনো অস্বিত্ব নেই, অর্থাৎ প্রবাহিত হয়নি। বাংলাদেশে প্রায় ৪০৫টি নদী রয়েছে। রংপুর বিভাগে ঘাঘট নদী, জামালপুরে জিনাই নদী প্রবাহিত। আর গফরগাঁওয়ের উল্লেখযোগ্য নদী হচ্ছে পুরাতন ব্রক্ষপুত্র নদ।

এ ছাড়া বানার, দইলা, পাগারিয়া, সুতিয়া নদী প্রবাহিত হয়েছে।

এ ব্যাপারে ময়মনসিংহের শাখাওয়াত বলেন, গফরগাঁও উপজেলায় সাতটি নদী থাকলেও ওই চারটি নদী নেই কোথাও। তারপরও ৩২টি নদীর মধ্যে গফরগাঁওকে তালিকাভূক্ত করা হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে। প্রতিটি উপজেলায় গড়ে প্রায় দেড়শ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।

একাধিক সূত্র জানায়, ঝিনাই, ঘাঘট, বংশী ও নাগদা নদীর নাব্য ফেরাতে চার হাজার ৭৮৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্প প্রস্তাব করেছে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়। এখানে ঝিনাই ও বংশী নদীর জন্য খনন ব্যয় দুই হাজার ৩৪২ কোটি আট লাখ ৫৩ হাজার টাকা, ঘাঘট নদীর জন্য এক হাজার ৩৩০ কোটি এক লাখ ৫৯ হাজার টাকা ও নাগদা নদীর জন্য এক হাজার ১১৪ কোটি ১৫ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। এসব যাচাই করতে ১৯ আগস্ট পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিভিন ব্যাপারে অসঙ্গতি তুলে ধরা হয়।

পরিকল্পনা কমিশন আপত্তি জানিয়ে বলেছে, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে চলমান ৪৮টি প্রকল্প রয়েছে। যা বাস্তবায়নে তিন হাজার ১৩১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া বেশ কিছু নতুন প্রকল্প ইতোমধ্যে পিইসি থেকে সুপারিশ করা হয়েছে। ফলে আরএডিপিতে চাহিদা আরো বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।

এ অবস্থায় চারটি নদীপথ খননের মতো বিরাট অর্থ ব্যয়ের প্রকল্প যৌক্তিক নয়। বড় ব্যয়ে ৫৩টি নৌপথে ক্যাপিটাল ড্রেজিংসহ নদী খনন নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। এরপরও এত বড় অঙ্কের জিওবি টাকায় নদী খনন প্রকল্প গ্রহণ করা ঠিক হবে না। এটা বৈদেশিক সহায়তায় ছোট ছোট প্রকল্প করা যেতে পারে।

এ ছাড়া যেখানে চলমান ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ে প্রতি ঘনমিটারে সরকারি ড্রেজার দিয়ে খননে ব্যয় হবে ১২০ টাকা। বেসরকারি ড্রেজার দিয়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫০ টাকা। অথচ প্রস্তাবিত প্রকল্পে এই ব্যয় ১৯০ টাকা ধরা হয়েছে। যা ৭০ টাকা বেশি। অন্যদিকে মাটির ডাই নির্মাণব্যয় প্রতি ঘনমিটারে ১০০ থেকে ১৪০ টাকা ধরা হয়েছে। কিন্তু চলমান দুটি প্রকল্পে এই ব্যয় ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ে ৪২ টাকা এবং গোপালগঞ্জের নৌপথ খনন প্রকল্পে ৪৫ টাকা।

এ ছাড়া বিআইডব্লিউটিএ ড্রেজিং কাজ বাস্তবায়নের জন্য সরকারি অনুদানে বেশ কয়েকটি প্রকল্প ইতোমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— চার হাজার ৩৭১ কোটি টাকা ব্যয়ে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তুলাই এবং পুনর্ভবা নদীর নাব্য উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প।

৮৪৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীর রক্ষা ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ প্রকল্পও চলমান। তারপরও ৬ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার নদীর তীর রক্ষা কাজে ৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। যা অনেক বেশি হওয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে রেট সিডিউল নিতে বলা হয়েছে।

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close