আলোচিত

ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরাই আবরারকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে

বার্তাবাহক ডেস্ক : বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ময়না তদন্তকারী চিকিৎসক জানিয়েছেন, তাঁর শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। যারা হত্যা করেছে তারা ছাত্রলীগের বলে স্বীকার করেছেন বুয়েট ছাত্রলীগের সভাপতি।

এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে এরইমধ্যে বুয়েট ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদকসহ ছয় জনকে আটক করেছে পুলিশ। সন্দেহ করা হচ্ছে একটি ফেসবুক পোস্টের জেরে তাকে হত্যা করা হয়।

রোববার দিবাগত রাত তিনটার দিকে আবরারের লাশ উদ্ধার করা হয় বুয়েটের শের-ই-বাংলা হলের দ্বিতীয় তলা থেকে। এই হলের ১০১১ নাম্বার কক্ষে থাকত আবরার। তিনি ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন।

রাত আটটার পর তাঁকে মোবাইল ফোনে ডেকে নেয়া হয়। তারপর থেকেই তিনি নিখোঁজ ছিলেন। বুয়েট ছাত্রলীগের সভাপতি জামিউস সানি বলেন, ‘‘আমি খবর পেয়ে রাত তিনটার দিকে যখন হলে যাই ততক্ষণে সে মারা গেছে। গিয়ে দেখি লাশ পড়ে আছে। তখন হলের প্রভোস্ট, ছাত্র কল্যাণ কর্মকর্তা ও চিকিৎসকসহ আরো অনেকেই ছিলেন।”

তিনি বলেন, ‘‘তাঁকে ২০১১ নাম্বার কক্ষে নিয়ে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে তারা বুয়েট ছাত্রলীগের বিভিন্ন পদে আছেন। পুলিশের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগও ঘটনা তদন্ত করছে। যারা জড়িত তারা সবাই আইনের আওতায় আসবে।”

তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন,‘‘ছাত্রলীগতো হত্যা করেনা। হত্যা করতে বলেও না। এটা ব্যক্তির দায়। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ এবং হত্যাকাণ্ডের সব আলমাত পাওয়া গেছে। যারা দায়ী তাদের চিহ্নিত করা যাচ্ছে।”

নিহত আবরারের মামাতো ভাই আবু তালহা বলেন, ‘‘আমরা নিশ্চিত হয়েছি ছাত্রলীগের লোকজনই তাকে হত্যা করেছে। আমাদের পরিবারের একজনকে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখানো হয়েছে। তাতে কমপক্ষে ৮-১০ জন তালহা হত্যায় জড়িত। এর মধ্যে ছয়জন আবরারকে ২০১১ নাম্বার কক্ষে নিয়ে যায়। দুই জন পরে আবার আবরারের জামা কাপড় নিতে আসে ১০১১ নাম্বার কক্ষে। কিন্তু রুমের ভেতরে সিসি ক্যামেরা নাই। তাই ২০১১ নাম্বার কক্ষে কতজন ছিলো তা এখনো নিশ্চিত নয়।”

তিনি জানান,‘‘অত্যন্ত মেধাবী আবরার ধর্মপরায়ণ ছিলেন। আর সর্বশেষ ৫ অক্টোবর তিনি ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। তাতে ভারতের সঙ্গে পানিবন্টন ও চুক্তি নিয়ে ঐতিহাসিক কিছু ঘটনা উল্লেখ করে তিনি একটি লেখা লেখেন।”

তিনি আরো জানান, ‘‘ওই পোস্ট দেয়ার জেরে তাকে নিয়ে গিয়ে তার মোবাইল ফোন ও ল্যাপাটপ তারা নিয়ে নেয়। এরপর নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। ভোর রাত পাঁচটার দিকে আমরা ফোনে খবর পাই।”

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় এক প্রেস ব্রিফিং-এ জানিয়েছেন এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এরইমধ্যে ছয় জনকে আটক করা হয়েছে। যাদের আটক করা হয়েছে তাদের মধ্যে আছেন বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল, সহ-সভাপতি মুস্তাকিম ফুয়াদ, ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাউল ইসলাম জিওন এবং তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার। কৃষ্ণপদ রায় জানান, ‘‘আবরারকে যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি। আমাদের কাছে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ আছে।”

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, আবাররকে প্রথমে ২০১১ এবং পরে ২০০৫ নাম্বার কক্ষে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। ওই দু’টি কক্ষে ছাত্রলীগ নেতারা থাকেন। নির্যাতনের পর শেরে বাংলা হলের দ্বিতীয় তলার সিড়ির পাশে তাঁকে ফেলে রাখা হয়।

সোমবার দুপুরের পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ময়না তদন্ত শেষে আবরারের লাশ তাঁর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

ময়না তদন্তকারী চিকিৎসক ডা. সোহেল মাহমুদ জানান, ‘‘তাঁর শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন আছে। মাথা ছাড়া তারা হাত, পা, বুক, পিঠ, পেট সবখানেই গভীর আঘাতের চিহ্ন আছে। এটাকে আমরা বলি ভোঁতা অস্ত্রের আঘাত। এটা রড, লাঠি, ক্রিকেট ব্যাট, ক্রিকেট স্ট্যাম্প, হকি স্টিক, শক্ত কাঠ বা শক্ত অন্য কিছুর আঘাত হতে পারে। এই আঘাতের কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। আঘাতের সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘অনেক, তাই সুনির্দিষ্ট করে সংখ্যা বলতে পরছিনা।”

আবরারের গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার পিটিআই সড়কে। তাঁর বাবা বরকতউল্লাহ একটি এনজিওতে চাকরি করেন। মামা রোকেয়া খাতুন একটি কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক। দুই ভাইয়ের মধ্যে আবরার বড়। তাঁর গ্রামের বাড়িতে এখন বিলাপ আর আহাজারি। মা রোকেয়া খাতুন এর মধ্যেই জানান,‘‘রোববারই আমার ছেলে ঢাকা যায়। ১০ দিন আমার কাছে ছিলো। এভাবে যে আমার বুক খালি হয়ে যাবে বুঝতে পারিনি। যারা তাঁকে হত্যা করেছে তাদের ফাঁসি চাই। মায়ের বুক খালি হওয়ার কষ্ট তারাও বুঝুক।”

এদিকে এই ঘটনার পর বুয়েট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র বিক্ষোভ হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থী এবং আবরারের সহপাঠীরা হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবীতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেছেন।

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close