আলোচিত

গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে যে ১০ খাতে দুর্নীতি হয়

বার্তাবাহক ডেস্ক : গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ১০ খাতের দুর্নীতি চিহ্নিত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের চিহ্নিত করা এসব দুর্নীতির খাত নিয়ে তৈরি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন বুধবার (৯ অক্টোবর) সচিবালয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। দুদক কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান মন্ত্রীর কাছে এই প্রতিবেদন জমা দেন।

মন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়া প্রতিবেদনের ১০ খাতের দুর্নীতি:

১. গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি হয়। এ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরের দুর্নীতির ব্যাখ্যায় দুদক জানায়–

ক. গণপূর্ত অধিদফতরের বড় পরিসরের কাজ ছাড়াও মেরামত, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ রয়েছে। এ বরাদ্দের বিপরীতে কাজগুলো ছোট ছোট লটে ভাগ করা হয়। গোপন টেন্ডারের মাধ্যমে এসব কাজ পছন্দের ঠিকাদারদের দেওয়া হয়। এসব ঠিকাদারদের মধ্যে গণপূর্ত অধিদফতরের অনেক কর্মকর্তার আত্মীয়-স্বজন বা তাদের নামে-বেনামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

খ. অনেক ক্ষেত্রে ঠুনকো কারণে অপছন্দের ঠিকাদারকে নন-রেসপনসিভ করা হয় এবং কৌশলগত হিসাবের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারকে রেসপনসিভ করা হয়। দরপত্র দাখিলের আগেই গোপন সমঝোতার মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারকে রেট জানিয়ে দেওয়া হয়। পছন্দের ঠিকাদারের যেসব অভিজ্ঞতা রয়েছে সেসব অভিজ্ঞতার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়, যাতে অন্য কোনও ঠিকাদার এই দরপত্রে অংশ নিতে না পারেন।

গ. সরকারি বাজেটের একটি অংশ ঠিকাদারের যোগসাজশে আত্মসাতের উদ্দেশ্যে বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে সিডিউল রেটের বাইরে গিয়েও প্রাক্কলন তৈরি করা হয়।

ঘ. বড় বড় প্রকল্প বিশেষ করে ৩০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বের প্রকল্প প্রণয়নের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। অনেক সময় অসৎ উদ্দেশ্যে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের দায় এড়ানোর জন্য ছোট ছোট প্যাকেজ করে প্রাক্কলন প্রণয়ন, অনুমোদন ও ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়। যেমন– ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ’ প্রকল্পের আওতায় ডেলিগেটেড ওয়ার্ক হিসেবে গণপূর্ত অধিদফতর কর্তৃক নির্মাণাধীন ছয়টি ভবনে আসবাবপত্রসহ আনুষঙ্গিক কাজের জন্য দাপ্তরিক প্রাক্কলন প্রণয়ন করে ছয়টি প্যাকেজে ই-জিপিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়। প্রতিটি প্যাকেজের ক্রয়মূল্য ৩০ কোটি টাকার নিচে প্রাক্কলন করে গণপূর্ত অধিদফতর অনুমোদন ও ঠিকাদার নিয়োগ করে। এক্ষেত্রে দাপ্তরিক প্রাক্কলন প্রণয়ন, অনুমোদন ও ঠিকাদার নিয়োগে মন্ত্রণালয়ের কোনও সংশ্লিষ্টতা ছিল না।

ঙ. বর্তমানে গণপূর্ত অধিদফতরের অধিকাংশ ক্ষেত্রে ই-জিপি টেন্ডারিং প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলেও টেন্ডারের শর্তানুসারে দেওয়া বিবরণী অনুযায়ী কখনও কখনও কাজ বাস্তবায়ন করা হয় না। এ ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ঠিকাদারের চাপে অথবা একশ্রেণির প্রকৌশলী ও কর্মকর্তার যোগসাজশে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়ে থাকে। ঠিকাদার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট পদ্ধতি দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত প্রথায় পরিণত হয়েছে। কাজ পাওয়ার জন্য অনেক সময় বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি, পরামর্শক সংস্থা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উৎকোচ প্রদান করতে হয়।

২. গণপূর্ত অধিদফতরের মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প বা নির্মাণকাজে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার হয়। অনেক ক্ষেত্রে যে অনুপাতে সিমেন্ট-বালি মেশানোর কথা তা না করে বালির পরিমাণ বেশি মেশানো হয়। এছাড়া, শর্ত অনুযায়ী যে রড দেওয়ার কথা তা না দিয়ে কম আয়তনের রড দেওয়া হয়। এর সঙ্গে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদার জড়িত থাকেন।

৩. সরকারের ভবন নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পরিধি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সে তুলনায় গণপূর্ত অধিদফতরের জনবলের আকার বাড়েনি। জনবল আনুপাতিক হারে কম থাকায় প্রকল্প প্রণয়ন, তদারকি, বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কাজে ধীরগতি লক্ষ করা যাচ্ছে।

৪. গণপূর্ত অধিদফতরের আওতাভুক্ত ভবনের মেরামত, সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশও বরাদ্দ পাওয়া যায় না। যথাসময়ে বরাদ্দ ছাড়ের অভাবে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ বিঘ্নিত হয়। এজন্য রক্ষণাবেক্ষণ কাজ চাহিদামাফিক করা সম্ভব হয় না।

৫. প্রকল্প ছক সংশোধন করে অনাবশ্যক প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়। মূলত আর্থিক মুনাফার প্রত্যাশায় প্রয়োজন না থাকলেও ঠিকাদার ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ব্যয় বাড়ানো হয়।

৬. পর্যাপ্ত লোকবলের অভাবে স্থাপত্য অধিদফতর প্রায়ই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নকশা সরবরাহ করতে পারে না। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হয়।

৭. গণপূর্ত অধিদফতরের কর্মকর্তাদের অবহেলা, সদিচ্ছা ও মনিটরিংয়ের অভাবে প্রাক্কলন তৈরি থেকে শুরু করে দরপত্র আহ্বান, কার্যাদেশ প্রদান ও কাজ সমাপ্তি প্রত্যাশী সংস্থার চাহিদামতো জরুরি ভিত্তিতে সম্পাদন করা হয় না।

৮. গণপূর্ত অধিদফতরের আওতাধীন বিভিন্ন সরকারি দফতর, অধিদফতর বা সরকারি কোয়ার্টারের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণসহ সেবা প্রদানের বিভিন্ন স্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। ফলে সেবাপ্রত্যাশীরা সময়মতো প্রত্যাশিত সেবা থেকে বঞ্চিত হন।

৯. অনেক সময় কাজ শেষ হওয়ার পর ঠিকাদার বিল দাখিল করলেও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও নির্বাহী প্রকৌশলীরা নানা অজুহাত দেখিয়ে বিল আটকে রাখেন। এ ক্ষেত্রে যেসব ঠিকাদারের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতা হয় সেসব ঠিকাদারের বিল আগে পরিশোধ করা হয়।

১০. অনেক ক্ষেত্রে বরাদ্দ থাকার পরেও ঠিকাদারদের আংশিক বিল পরিশোধ করা হয়। এ ক্ষেত্রেও যেসব ঠিকাদারের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতা হয় শুধু তাদের পুরো বিল পরিশোধ করা হয়।

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এটাও পড়ুন

Close
Close